মশিউরের খেরোখাতা

গল্প: পুলজার

স্যাটেলের বাইরে এসে সত্যিই অবাক হয়ে গেল ধ্রুব। আকাশ যে এই রকম রঙ ধারণ করতে পারে তা সে বুঝতেই পারেনি। গোলাপি রঙে আকাশটা ছেয়ে আছে। আর তার মাঝে নীল রঙের একটা হালকা ছোঁয়া। স্টোনকে প্রশ্ন করল,

: স্টোন দেখেছ আকাশটার কেমন রঙ? : স্টোন বলল এমন রঙের বৈচিত্র্যের গ্রহ আমার জীবনে শুধু এই গ্রহটাতেই দেখলাম। ধ্রুব তার উত্তর শুনে হাসি পেল। স্টোনের জীবন বলতে অনেক দীর্ঘ। আধুনিক রোবটগুলিকে ঠিক মানুষদের মত করে কথা বলতে শেখানো হয়েছে।

স্টোনকে ধ্রুব ছোটবেলা থেকেই পাশে রেখেছে তার সঙ্গী হিসাবে। যদিও তৃতীয় পর্যায়ের এই রোবটকে কেউ দেখলে হয়তো হাসবে। কিন্তু ধ্রুবর জন্য এটাই ভালো লাগে। এই তৃতীয় পর্যায়ের রোবটদের উৎপাদন এখন বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারে এখন সপ্তম পর্যায়ের রোবট এসেছে। সিলিকেট প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এই রোবটগুলিকে মানুষ বলে যে কারো বিভ্রম হতে পারে। দীর্ঘদিন পাশে থেকেও যে তা রোবট তাই বোঝা যায় না। এমনই ভুল হয়েছিল ধ্রুবের গতবার একটা স্যাটেলের কোর্সে তার এক সঙ্গীকে এক বছরের শেষের দিকে জানতে পেরেছিল যে তা সপ্তম পর্যায়ের রোবট। ব্যাপারটা ধ্রুবকে খুব বিষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। মানব সভ্যতা যে কোন দিকে যাচ্ছে তা ধ্রুবও ঠিকমত বুঝে উঠতে পারছে না। সেই দিন আর খুব বেশি দিন দূরে না যেদিন এই রোবটরাই মানুষের অস্তিত্বের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াবে। আর তা নিয়েই ধ্রুবের ভয় হয়।

বাইরে তেজস্ক্রিয়তা বেশি বলে বেশিক্ষণ বাইরে থাকাটা ঠিক হবে না। যদিও হাতে পড়ে থাকা তেজস্ক্রিয় মিটারের কাঁটাটি এখনও নিরাপদ মাত্রায় আছে।

ধ্রুব ঘরে ফিরে এল। কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে তাকিয়ে রইল। ঠিক কোন কাজটি করবে তাই হয়তো মাথায় গুছিয়ে নিচ্ছে। এইবারের মিশনটা আহামরি তেমন একটা গুরুত্ব না। ধীরে সুস্তে কাজ করলেও কোন অসুবিধা নেই। কোন তাড়া নেই। তবে এই পালজার নামের এই গ্রহটা সত্যিই তাকে অন্যরকম ভাবে একটা অনুভূতি দিচ্ছে যা নিয়ে ধ্রুবর বেশ মজা লাগছে। এই গোলাপি রঙের আকাশের গ্রহটাকে তার বেশ ভালো লেগে গেছে। যদিও তার এই মিশনের কাজ হল গ্রহটির সম্পর্কে একটা বিস্তারিত রিপোর্ট দেওয়া। তা হয়তো কোন কোম্পানি দেখবে এবং ভবিষ্যতে এইখানে কোন কাজ করতে পারে। অনেক গ্রহকে পরিবর্তিত করে ট্যুরিস্ট স্পটের মত করে গড়ে তোলা হয়েছে। কোথাও লাস ভেগাসের মত শহর গড়ে তোলা হয়েছে। মানুষেরা সেখানে আনন্দ করতে যায়। এমনি ভাবে এই গ্রহটি নিয়ে হয়তো চিন্তা করা হবে। কিংবা খনিজ কিছু পাওয়া গেলে তা হয়তো খনিজের ভান্ডার হিসাবে কাজে লাগবে।

হাইপার ড্রাইভ দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার কারণে ক্লান্তিতে শরীরটা ভরে আছে। আপাতত রুমে যেয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবল।


অনেক ক্ষণ পরে ঘুম ভাঙলে উঠে দেখলো চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। রুমের লাইটটি জ্বালিয়ে নিয়ে চুপ করে বসে থাকলো। বসে বসে ধ্রুব তার ফেলে আসা কথাগুলি ভাবতে থাকলো। খুব ছেলেবেলা থেকে পৃথিবী দেখার সখ। কেমন ছিল সেখানে মানুষজন। প্রকৃতির নিরালায় বসে তারা কেমন জীবন যাপন করতো। ছেলেবেলা থেকেই ধ্রুব দেখেছে মানুষেরা দূর স্যাটেলে, টার্মিনালে কিংবা অন্য কোন গ্রহে বসবাস করছে কিন্তু ধ্রুবর কেন যেন মনে হয় মানুষেরা নিজেকে যাযাবর মনে করে। পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার জন্য সবার মন আনচান করে। এইভাবে মানুষ আর কত দিন যাযাবর হয়ে থাকবে। ধ্রুব অবশ্য কোন নেতা নয় সে একজন সাধারণ মানুষ। তবুও তার মধ্যে এই ধরনের চিন্তাগুলি উকি ঝুকি মারে। কিছুক্ষণ পরে চুক চুক করে পানি খেল। বেশ পিপাসা পেয়েছিল। কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে যেয়ে একটু বসল এইবার এত ক্ষণ পরে নিজেকে তার একাকিত্ব ঘিরে ধরল। না কোন কিছুর ভয় নয় কেমন জানি নিঃসঙ্গ একাকিত্ব। নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে ধ্রুব তার পৌঁছানোর সংবাদ জানিয়ে দিল। অবশ্য ধ্রুব যে পরিভ্রমণে বের হয়েছে তা আহামরি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। তা নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা করবে না তাই স্বাভাবিক। কন্ট্রোল প্যানেলের যোগাযোগ মডিউলে দেখা গেল একটা ভিডিও মেইল এসেছে। প্রেরকের নাম দেখে ধ্রুবর শরীরে শিহরণ বয়ে গেল, নিশা মেইলটি পাঠিয়েছে।

কন্ট্রোল প্যানেলের বিশাল পর্দায় নিশার মুখটি দেখা গেল।

: আচ্ছা কি ব্যাপার এত বড় বিশাল প্রজেক্টে যে তুমি যাচ্ছ তা আমাকে জানালে না কেন? একটু সেলিব্রেট করা যেত। আমিও একটা স্যাটেলে অংশ নিতে যাচ্ছি তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইস.. এত ঝামেলা... তোমাকে অনলাইনে পেলাম না বলে মেইল দিচ্ছি.... মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে আছ? কি... স্বপ্নে কোন রাজরানীকে দেখছো। পরে কথা হবে.. বাবা ডাকছে.. নিচে কফি নিয়ে বসে আছে...।

ধ্রুবর হাসি পেল তার কথা শুনে। সব সময় তাড়াহুড়ো করে কথা বলে। তার মায়াবী চোখ দেখলে ধ্রুবর হৃদয়টা হিম হয়ে যায়। এত ভালো লাগে কেন.. তা সে জানে না....। অবশ্য তা কখনও নিশাকে বলা হয়নি। ধ্রুবর ইচ্ছা করে নিশার সাথে কথা বলতে কিন্তু কেন জানি না কথা বলা হয়ে ওঠে না। যাকে নিয়ে এত ভাবা হয়.. তার সাথে কথা বলা হয় না। নিশার ব্যবহারে অবশ্য কিছুই বোঝা যায় না। নির্ভেজাল বন্ধুত্ব নাকি অন্য কিছু। সে যাক.. ধ্রুব সেসব নিয়ে নিশার সাথে কখনই আলোচনা করেনি। অবশ্য কখনও আলোচনাও হবে না। ধ্রুব ভালোমত জানে সে এই ভিডিও মেইলের কোন উত্তর দেবে না।

এই গ্রহটির দিন ৩২ ঘণ্টায়। পৃথিবীর তুলনায় দিনরাত একটু দীর্ঘ। অন্যান্য অনেক কিছু দেখে ধ্রুবর মনে হচ্ছে যে এই গ্রহটিতে হয়তো মানুষ বসবাস করতে পারে। অবশ্য এখন মহাকাশে বেশ অনেকগুলি গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে যেগুলি মানুষের বসবাস যোগ্য কিংবা অনেকগুলিকে বসবাসের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হচ্ছে। শুধুমাত্র ধ্রুব এই গ্রহটিতে বায়ুর অস্তিত্ব পায়নি। কাল ধ্রুব গ্রহটিকে পুরোটুকু ঘুরে দেখবে বলে ঠিক করল। অনেক রাত হয়েছে.. যদিও ধ্রুব দীর্ঘ একটা ঘুম দিয়েছে কিন্তু তারপরেও তার বেশ ঘুম পাচ্ছে। খাবার খেয়ে ঘুমাবে বলে ঠিক করলো। তার আগে কিছু রুটিন চেকআপ আছে.. স্যাটেলের নিরাপত্তাগুলি ঠিকমত কাজ করছে কিনা তা চেক করে দেখা দরকার। কিন্তু তার আগে দেখা দরকার স্টোন কোথায়। স্টোনের খোঁজ করতে ধ্রুব কন্ট্রোল প্যানেল থেকে বের হয়ে অন্য রুমগুলিতে উকি মেরে দেখল। অবশ্য তার এই স্যাটেলটি আহামরি খুব বড় নয়। কয়েক মিনিটেই পুরো স্যাটেলটি ঘুরে দেখা সম্ভব।

রান্নাঘরে স্টোন কি সব করছো।

: স্টোন কি ব্যাপার? কি করছো? : তোমার ঘুম ভাঙ্গল। আমি রাতের খাবার তৈরি করছি।

: আজ কি মেনু? : আজ গরুর মাংসের স্টেক।

: আচ্ছা আমাদের খাবার স্টক কতটুকু আছে। : তোমার আছে মাসখানেকের আর আমার আছে কয়েক বছরের।

: হা হা... ধ্রুব ঠাট্টা করে বললো।

: তোমার খাবারে কি আমি ভাগ বসাতে পারি না?

স্টোন ঠাট্টাটা বুঝতে পারল না। কিছু চিন্তা করতে লাগলো। স্টোন যখন চিন্তা করে তখন তার চোখটা কেমন জানি হয়ে যায় যেটা শুধু ধ্রুবই বুঝতে পারে।

খাবার খেতে খেতে ধ্রুব হালকা একটা সঙ্গীত দিল। বিছানায় শুতে না শুতেই ঘুম চলে এল।


মাঝরাতে হঠাৎ খুব হৈ চৈয়ে ধ্রুবর ঘুম ভেঙে গেল। কি যে হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছে না। চারিদিক অন্ধকার। হাত বাড়িয়ে সুইচ অন করলো তারপরেও লাইট জ্বলছে না। কোথায় যেন খুব ভাঙচুরের শব্দ হচ্ছে। কন্ট্রোল প্যানেলের দিকেই বোধ হয়। কি যে করবে ধ্রুব তা বুঝে উঠতে পারল না। ধ্রুব নিজে নিজেকে বলল.. শান্ত হও ধ্রুব শান্ত হও .. ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর।

কি হতে পারে.. চিন্তা করতে বসলো। কেউ কি আক্রমণ করে বসলো। কে? অন্য কেউ তো এই গ্রহে নেই। অন্য কেউ তো আসতে পারে না। নাকি অন্য কোন গ্রহের জীব। সাধারণত বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে এইসব দেখেছে কিন্তু সত্যি তো তার কোন অস্তিত্ব নেই। তবে কে? প্রথমে ধ্রুব তার জরুরি ব্রিফকেসটা নিল। অনেকদিন পরে সে ব্রিফকেসটা হাতে নিল। অন্ধকারে ধ্রুব কিছুই বুঝতে পারছিল না। প্রথমে ধ্রুব বুঝার চেষ্টা করল। অনেক ক্ষণ মনযোগ দিয়ে শব্দ শুনে বুঝতে পারল যে কারা জানি কন্ট্রোল রুমে কিছু ভাঙচুর করছে। তারা চিৎকার করছে আর কেউ যেন কমান্ড করছে। ধ্রুব সাবধানে তার রুমের দরজা খুললো করিডোরের একবারের শেষ প্রান্তে Emergency Exit এর দরজার আলোটা হালকা ভাবে জ্বলছে। সেই আলোতে দেখা গেল করিডোরের রাস্তায় কে যেন পড়ে রয়েছে। কিছুদূর যাওয়ার পরে আরো একজনকে দেখা গেল করিডোরে পড়ে রয়েছে। কারা এরা।

অন্য রুমগুলি খুব ভাঙচুর করে ফেলেছে। মনে হচ্ছে অনেকজন মিলে রুমগুলিকে তছনছ করে ফেলেছে। কন্ট্রোল রুমের পাশ থেকে খুব ভাঙচুরের শব্দ আসছে। সাবধানে কন্ট্রোল রুমের সামনে উকি দিতে গেল। ঠিক তখনই কে যেন বাইরে হল.. তাড়াতাড়ি সাবধানে ধ্রুব করিডোরের পাশে লুকিয়ে গেল। দেখতে মানুষের মতই মনে হচ্ছে তবে যে পোশাক পরে রয়েছে তা একটু অদ্ভুত। ধ্রুব কখনই এই ধরনের পোশাক দেখেনি।

কন্ট্রোল রুমের সামনে আসতেই ধ্রুবর শরীরে শীতল রক্তের স্রোত বয়ে গেল। কন্ট্রোল রুমে তাদের বেশ কয়েকজন আছে তারা পুরো রুমে কি যেন খুঁজছে। তারা অদ্ভুত ভাষায় কথা বলছে। কিছুক্ষণ পরে তারা কন্ট্রোল রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিল তাড়াতাড়ি ধ্রুব লুকিয়ে গেল। ধ্রুব অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দেখলো তারা বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় পথের সব কিছুকে ভাঙচুর করে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে রেগে আছে। ধ্রুব কি করবে বুঝে উঠতে পারল না। আপাতত লুকিয়ে থেকে তাদের পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিল। একটু পরেই তারা চলে গেল। একটা মহাকাশ যানে তারা চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে যখন ধ্রুব বুঝতে পারল যে তারা আসলেই চলে গেছে তখন ধ্রুব সব কিছু দেখলো। পুরো কন্ট্রোল রুমের সব কিছু ভেঙে চুরমার করে ফেলেছে। স্টোনকে ধ্বংস করে ফেলেছে। এমনকি কন্ট্রোল রুমের সব মনিটর ও প্যানেল নষ্ট করে ফেলায় বিদ্যুৎ চালান যাচ্ছে না। একটা ব্যাকআপ সিস্টেম থাকে তা চালু করতে সক্ষম হল। এমনকি যোগাযোগ মডিউলটাও নষ্ট। কোনভাবেই মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে পারল না।

ক্লান্তিতে ধ্রুব কখন সেই কন্ট্রোল রুমেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল তা টের পায় নি।


সকালে চারিদিক আলোকিত হয়ে গেলে ধ্রুবর ঘুম ভাঙ্গল। ধ্রুবর বিধ্বস্ত রাতের কথা মনে পড়ল। এই নির্জন গ্রহে ধ্রুব একা কি করবে? ধ্রুব খুব সমস্যার মধ্যে পড়ল। সে আসার আগে এই গ্রহ সম্পর্কে ভালোমত খবর নিয়েছিল। এই গ্রহে মানুষ থাকে না। তা সে জানে তবে রাতের আক্রমণকারী কারা? তার উত্তর ধ্রুবর জানা নেই। পরের দিন স্টোনকে ঠিক করার জন্য ধ্রুব উঠে পড়ে লাগলো। কেননা কিভাবে খাবার তৈরি করা সম্ভব তা স্টোন জানে। ধ্রুবর খুব ক্ষুধা পেয়েছে। অথচ স্টোনকে ঠিক না করে খাবার তৈরি হবে না। ডিপ ফ্রিজে যেয়ে ধ্রুব রুটির মত কিছু পেল। আপাতত তা দিয়েই ক্ষুধা মিটাল।

স্টোনের অবস্থা খুবই খারাপ। একটা খুব ভারি অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার ফলে স্টোনের মূল সিপিইউ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে স্টোনের মূল মেমোরির সার্কিটটিকে বাইরে করে নিয়ে আসতে পারল। তারপর তা সে তার নিজস্ব কম্পিউটারে সংযোগ করতে সমর্থ হল। এই রকম একটা নির্জন জায়গায় স্টোন না থাকায় ধ্রুবর খুব একা একা লাগছিল। একটা যন্ত্রের সাথে যে মানুষের বন্ধুত্ব হয় তা ধ্রুব ও স্টোনকে দেখলে বোঝা যায়।

: আমি স্টোন। আমি reboot হচ্ছি।

যাক স্টোনের কথা ভেসে আসলো। ধ্রুবর খুব ভালো লাগলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে স্টোন পুরোপুরি সচল হলে তার কাছে জানতে চাইলো ঘটনা সম্পর্কে। কিন্তু স্টোনের কাছ থেকে তেমন কোন তথ্য পেল না। স্টোনের শুধু স্মরণ শক্তি ও তার চিন্তা শক্তি আছে। কিন্তু তার শরীর না থাকায় সে কোন কাজ করতে পারবে না। স্টোনের কাছ থেকে শিখে নিল কিভাবে খাবার তৈরি করা যায়।

: আচ্ছা স্টোন কোনভাবে কি মূল কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করা যায়? : না তা সম্ভব না। : কেন?

: মূল যোগাযোগ করার জন্য সবকিছুই কন্ট্রোল রুমে আছে। : কন্ট্রোল রুমে তো অনেক চেষ্টা করে দেখলাম কিছুই হচ্ছে না। পুরো কন্ট্রোল রুমে মনে হচ্ছে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। ধ্রুবর খুব রাগ লাগতে লাগলো। এই নির্জন একটা গ্রহে কত কাল বসে থাকবে। কন্ট্রোল রুম ধ্বংস হয়ে গেলে এইভাবে যে সব অকেজো হয়ে যাবে সেই ব্যাপারে আরেকটু সাবধান হওয়া দরকার। ব্যাকআপ সিস্টেম চলছে নিউক্লিয়ার শক্তিতে। আরো কিছুদিন ধ্রুব কন্ট্রোল রুমে চেষ্টা করে দেখল কিছু করা যায় না কি। কিন্তু কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না।

এইভাবে আরো কিছুদিন গেল। ধ্রুব কিছু করতে না পেরে মানসিকভাবে বেশ ভেঙে গেল।

কিছুদিন পরে কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগ মডিউলটি চালু হল এবং তাতে ভিডিও মেসেজ আসল। মূল কেন্দ্র থেকে কোন সমস্যা হল নাকি? তা জানার জন্য। কিন্তু মূল কেন্দ্র থেকে শুধুমাত্র মেসেজ আসছে ধ্রুব নিজ থেকে মূল কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। হঠাৎ করে একদিন নিশার মেসেজ আসলো। নিশার মেসেজটি নিম্নরূপ:

আমি নিশা। ধ্রুব আমি জানি না তুমি এই মেসেজটি শুনতে পাচ্ছ কিনা। কিন্তু তোমাকে একটা কথা জানাতে চাচ্ছি যে তোমার কাছ থেকে কোন উত্তর না আসায় একটি শাটলশিপ তোমার গ্রহে রওনা দিচ্ছে। আর সেই শিপে আমিও আছি।

খুব সংক্ষিপ্ত একটা বার্তা হলেও ধ্রুবর জন্য তা বড় পাওয়া। এই গ্রহ আর কত দিন বন্দি হয়ে থাকতে হয় তা নিয়ে খুব টেনশন হচ্ছিল। আপাতত সেই টেনশন থেকে মুক্তি। কিন্তু আসার সময় যদি ওই আক্রমণকারীদের হাতে তারা পড়ে তবে আরো সমস্যা হবে। তাদের কাছে অস্ত্র আছে। নিশারা কি কোন অস্ত্র নিয়ে আসছে? ধ্রুবর অপেক্ষার পালা শুরু হল।

একদিন গভীর রাতে প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ধ্রুবর ঘর অন্ধকার ছিল। তাই বুঝা গেল যে একটা শাটেল উড়ে গেল। ধ্রুব তার জানালা দিয়ে উকি মেরে দেখলো একটা বিশাল আকারের শাটেল। একটু বিশাল সাইজের।


কিছুদিন পরে আকাশে নিশাদের শিপটিকে দেখা গেল। এই মুহূর্তটির জন্য ধ্রুব অনেক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ধ্রুবর এই গ্রহে খুব বিষণ একা একা লাগছিল। ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। সে প্রথম যখন এই গ্রহে এসেছিল তখন কেমন জানি একা রোমাঞ্চ ছিল। অথচ সেই একই গ্রহ সেই ঘটনার পরে আর কারো সাথে যোগাযোগ না করতে পেরে তার খুব একাকিত্ব লাগছিল। এই কয়েকটি দিন কারো সাথেই কথা হয়নি সেজন্যই কি একাকিত্ব।

নিশা এসেই হৈ চৈ শুরু করে দিল। মনে হচ্ছে যে আমি তার ছেলেবেলার পুরান বন্ধু। আমার সাথে হুকুমের স্বরে কথা বলছে। অথচ নিশার সাথে কথা হয়েছে মাত্র কয়েকবার। সেরকম অন্তরঙ্গ গড়ে ওঠেনি। অবশ্য নিশা হয়তো সেরকমই সবার সাথে খুব সহজে আপন হয়ে যেতে পারে।

: কেমন আছ তোমাকে তো দেখে খুব দুর্বিষহ লাগছে। কি হয়েছে? নিশা দৌড়ে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করলো।

নিশার সাথে আরো দুজন লোক এসেছে। এবং সাথে এসেছে আরো দুটি যোদ্ধা রোবট। লোক দুটিকে দেখে মনে হল পুলিশের মত শক্ত পেশীর লোক। মনে হয় নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এই টিমটি গঠন করা হয়েছে। ধ্রুব তাদের খুলে বলল কি কি হয়েছে। তাদেরকে কন্ট্রোল রুমে নিয়ে গেল।

প্রথমেই আমরা সব ধ্বংসের ছবি তুলে তা নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে পাঠিয়ে দিলাম। তারপরে আমার স্যাটেল মেরামত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তেমন একটা সুবিধা না হওয়ায় স্যাটেলটি পরিত্যাগ করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি নিশাদের স্যাটেলে অবস্থান গ্রহণ করলাম। আমার স্যাটেল থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নতুন জায়গায় এলাম। অন্য দুই সহায়ক আমাদের সাহায্য করলো। নিশা আমাকে নতুন রুম দেখিয়ে দিল। এই রুমটি আগের থেকে একটু বড়। আর অনেক কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। নিশা বলল যে তাদের ওই রোবট দুটি খুবই দুর্ধর্ষ। এর পরে কয়েকবার মিটিং করল। ধ্রুবই নেতৃত্ব দিচ্ছিল। প্রথমেই কথা হল পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে। কারা আক্রমণ করেছে তা জানা দরকার। আর নতুন কিছু আবিষ্কার হলে বা জানা গেলে নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে জানিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

: আচ্ছা ধ্রুব তুমি কি তাদের দেখেছ। কেমন দেখতে তারা। : আসলে আমি স্পষ্ট করে দেখতে পারিনি। আবছা আলোয় দেখতে পারছিলাম। তবে আকার আকৃতি মানুষের মতই। তবে আমি সঠিক বলতে পারব না। : পরে যে স্যাটেল দেখেছ তা কেমন? : অনেক বড় এবং আলো জ্বলছিল। এত বেশি আলো জ্বলছিল যে ঠিকমত বোঝা যাচ্ছিল না।

ধ্রুব একটা কাগজে ছবি একে দিল তা দেখতে কেমন ছিল।

নিশা বলল আমি ডাটাবেসে সার্চ করে দেখছি এইরকম কোন স্যাটেল আছে নাকি। সবাই মিলে কন্ট্রোল রুমে গেল এবং নিশা তা স্ক্যান করে কম্পিউটারে ঢুকিয়ে সার্চ করল।

: আমি পেয়েছি দেখতে অনেকটা এই স্যাটেলের সাথে মিল আছে। তাই না। : হুম। আচ্ছা আলোগুলি জ্বালাও তো তবে দেখতে কেমন হয়? : এই রকম : আমি ঠিক এইরকমই স্যাটেল দেখেছিলাম। : কিন্তু এই স্যাটেলটি অনেক পুরান। আজ হতে ৫০ বছর আগে এক মহাকাশ যাত্রায় ব্ল্যাক হোলে পড়ে যেয়ে হারিয়ে যায়। : কিন্তু আমি ঠিক এইরকমই দেখেছিলাম।

পরে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে পুরো পালজার গ্রহটি একবার ঘুরে আসবে। যদি কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পরের দিন সকালে যাত্রা শুরু হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

ধ্রুব তার নতুন ঘরে বসে তার কম্পিউটারে কিটের সাথে কথা বলছিল। নিশা একাই আপনমনে কথা বলছিল। মানুষ যেভাবে একজন বন্ধুর সাথে কথা বলে। এমন সময় ধ্রুবর ঘরে নক হল। ধ্রুব দরজা খুলে নিশাকে আপ্যায়ন করল। নিশা খুব হালকা একটা গাউন পরে পড়েছে ধ্রুবর রুমের হালকা আলোতে নিশার শরীরের ভাজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কি উদ্দেশ্যে নিশা এসেছে?

: এই গ্রহের আকাশটা বেশ অদ্ভুত। : হুম : আমার অবশ্য এই পিঙ্কা আকাশটা খুব ভালো লেগেছে। : হুম : আচ্ছা তুমি কি হুম ছাড়া কোন উত্তর দিতে জান না নাকি? : হুম : আবার হুম। তুমি কিন্তু আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছ : হুম : আবার ... এইবার কিন্তু সত্যি সত্যিই আমি রেগে যাব। : ঠিক আছে.. আর হুম বলব না। কি কারণে এসেছ তা আগে বল। : কেন গল্প করতে। একজন বন্ধু কি আরেকজন বন্ধুর সাথে গল্প করতে পারে না। : তা পারে.. তবে আমরা কি তেমন বন্ধু : কেন? : দেখ নিশা তোমার সাথে আমার পরিচয় মাত্র তিন দিনের। এর মধ্যেই বন্ধুত্ব হয়ে গেল। : দেখ.. ধ্রুব.. নিশা মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি রেগে গেছে। : ঠিক আছে বুঝলাম আমি তোমার বন্ধু কিন্তু কি নিয়ে গল্প করবে? : যা ইচ্ছে তাই.. : তাই : আচ্ছা একজন রূপবতী কন্যা তোমার ঘরে এল। অথচ তুমি তার সাথে কেমন ব্যবহার করছ? : আচ্ছা ঠিক আছে। এইবার বল তুমি কি কিছু খাবে। আমার একটা সত্যিকারের কফির ব্যবস্থা আছে। সুইচ টিপ দিলে আসে না। সবটুকু নিজ হাতে করতে হয়। : ঠিক আছে .. কফি মন্দ না।

ধ্রুব কফি বানাল। কফি তৈরিতে তৈরি করে কফি বানাল। বেশ অভ্যস্ত হাতে কাজ করল।

: তুমি তো দেখি মারাত্মক ভালো কফি বানানোর জন্য। এখনও এইভাবে যে কেউ কফি বানাতে পারে তা আমার ধারণাই ছিল না। : আমার সিনথেটিক কফি ভালো লাগে না। তোমাদের কাছে হয়তো লাগতে পারে। তবে আমি নিজ হাতে এইভাবেই আদিম স্টাইলেই কফি বানিয়ে খেতে ভালোবাসি। আমার অবসরটা এইভাবেই কাটে। : তুমি কি অদ্ভুত। কিভাবেই না নিজ জগতে ডুব দিয়ে থাক। : আমি এইরকমই। কেন এইরকম কি নতুন দেখছো? তুমি নাকি আমার বন্ধু।

ধ্রুব একটু রাগিয়ে দিল। নিশা বলল কাল আমাদের যাত্রা শুরু হবে। কেমন লাগছে?

এবার ধ্রুব বুঝল আসলে নিশার আসার কারণটা। মনে হয় তার টেনশন হচ্ছে।

: তা একটু টেনশন হচ্ছে। তবে রহস্যটা সমাধান হওয়ার দরকার। সেটাই বেশি আগ্রহ হচ্ছে। তোমার কেমন লাগছে। : আমার ও তোমার মত। তবে আমার পঞ্চম ইন্দ্রিয় বলছে কিছু একটা ঘটবে। : তুমি তাহলে পঞ্চম ইন্দ্রিয় বিশ্বাস কর নাকি? : অবশ্যই : তুমি তো একজন বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি হোল্ডার। তোমার মত একজন বৈজ্ঞানিকের মুখে এই কথা শুনলে যে কেউ অবাক হবে। : দেখ নিশা। আমি যুক্তি দিয়ে চলি। কিন্তু তারপরেও প্রকৃতিতে অনেক কিছুই আছে যা আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি না। আমাদের এই জানা জ্ঞান দিয়েও তা অসম্ভব। : আমি তোমার মতে একমত নই - নিশা বেশ জোর দিয়ে কথাটি বলল। : ঠিক আছে আজ আমার কথা তুমি বিশ্বাস করছো না। একদিন হয়তো আমার সাথে একমত হবে।

আরো কিছুক্ষণ পরে গল্প করে নিশা তার রুমে ফিরে গেল। রাত নামলে ধ্রুব ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখল। পালজার গ্রহে আসার পর থেকেই রাতে তার তারা দৃশ্যগুলি দেখতে ধ্রুবর বেশ ভালো লাগে। কি সুন্দর তারায় ভরা আকাশ। প্রাচীন কালে এই আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত মানুষ কি একা। মানুষ আজো তার প্রশ্নের উত্তর পায় নি। আজ পর্যন্ত কল্পকাহিনির সেই ভিনগ্রহের মানুষের মিল আজো পায় নি। মানুষ আজ কত দূর থেকে দূরে যেতে পারছে। হাইপার ড্রাইভ ব্যবহার করে পাড়ি দিতে পারছে আলোর মত দ্রুতগতিতে।


সকালবেলায় হৈ চৈ পড়ে গেল। আজ তারা এই জায়গাটি ছেড়ে চলে যাবে। আপাতত এইখানে আর ফিরে আসার পরিকল্পনা নেই। তাই যা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছিল তা সবই স্যাটেলে উঠানো হচ্ছে। বেশ ভালো লাগছে। তবে সবাই চুপচাপ সবার মধ্যে একধরনের টেনশন কাজ করছে অবশ্য কেউ তা অন্যকে বুঝাতে চাচ্ছে না। সবাই কি অভিনয় করছে? কার সাথে নিজের সাথে। ব্যাপারটা অদ্ভুত বেশ। ধ্রুব আপনমনে ভেবে চলছে।

সকাল বেলায় ধ্রুব তার নিজের স্যাটেলে অবস্থানকালে যে স্যুট পরেছিল তাই পরেছিল। কিন্তু সকালেই ধ্রুবর ঘরে রবিন এসে হাজির। তার হাতে এই স্যাটেলের একটা স্যুট। তা ধ্রুবর হাতে দিয়ে বলল এটা পড়ুন। আজ থেকে আর আমাদের স্যাটেলের অতিথি আপনি নন। আজ এই অভিযানের আপনিও একজন সঙ্গী।

একটু পরেই তাদের স্যাটেল চলা যাত্রা শুরু করলে। মূল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছে রবিন। পিছনে রোবট দুটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আপাতত তাদেরকে কোন কাজে লাগানো হয়নি। তবে পরবর্তিতে কাজে লাগবে বলেই নিয়ে আনা হয়েছে। প্রতিটি রোবটই প্রতিরক্ষার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তাদের কাছে বেশ ভালোই অগ্নেয়াস্ত্র আছে।

রবিন বলল যে পালজার গ্রহটিকে পুরো একবার প্রদক্ষিণ করে আসতে তাদের ৩ দিনের মত সময় লাগবে। পৃথিবীর হিসাবে তিন দিন। মানুষ পৃথিবী ছেড়ে অনেক দিকে ছড়িয়ে গেছে কিন্তু মানুষ এখনও সেই পৃথিবীর হিসাবেই দিন গণনা করে। রোবট দুটিকে চালু করে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সাধারণ আলো ছাড়াও ইনফ্রারেড আলো দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখবে তাতে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ে কিনা। আর তারা তিনজন। নিশা রবিনের পাশে বসেছে। আর ধ্রুব পিছনের একটা সিটে বসে রয়েছে। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্যাটেলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর। এই স্যাটেলের ব্যাপারটা তার স্যাটেলের সাথে মিল আছে বলে ধ্রুবর অসুবিধা হয়নি। এই স্যাটেলেও ফুয়েল সেল দিয়ে মূল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এই প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছিল একবিংশ শতাব্দির দিকে। প্রকৃতির গ্যাস দিয়েই বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়। তবে এই স্যাটেলের চাহিদা পূরণের দ্বিগুণ ক্ষমতার বিদ্যুৎ তৈরি করা হচ্ছে ও তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে সুপার কন্ডাক্টর চার্জারে। পরে প্রয়োজনীয় সময়ে তা ব্যবহার করা হবে। ধ্রুবর তেমন অসুবিধা হল না।

একটু পরেই তারা প্রথম বায়ুস্তর অতিক্রম করে দ্বিতীয় বায়ুস্তরে প্রবেশ করল। এইখান থেকে পাহাড়গুলিকে বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তবে পৃথিবী কিংবা অন্য কোন গ্রহ হলে তা সবুজ হয়ে থাকত। কিন্তু এখানকার লালচে মাটির কারণে তা লাল লাল লাগছে। বেশ সুন্দর লাগছে। ধ্রুব বেশ অবাক হয়ে থাকল।

ধ্রুব বেশ ভালো মত তার সামনের মনিটরগুলি দিয়ে দেখছে। অবশ্য পাশাপাশি একটা কম্পিউটার দিয়েও স্ক্যান করা হচ্ছে যদি তাতে কোন কিছু চোখে পড়ে।

: কিছুই তো চোখে পড়ছে না শুধু ধুধু মরুভূমি। নিশা আক্ষেপের সুরে বলে উঠলো। : অবশ্যই কিছু থাকবে।

তারা আবার ব্যস্ত হয়ে গেল। রবিন বেশ দক্ষ চালক। কথা বলে জানা গেল যে এই পর্যন্ত সে বেশ কয়েকবারই সে স্যাটেল নিয়ে ভ্রমণে বের হয়েছিল। রবিনের বাবা একটা শহরের মেয়র। সে হিসাবে তারা বেশ বড়লোক। কেননা তার বাবা শুধুমাত্র মেয়রই নয় বেশ বিখ্যাত ব্যবসায়ী। অথচ রবিন তার বাবাকে পছন্দ করে না। ছোটবেলা থেকেই রবিন তার বাবাকে কাছে পায় নি। তাই এই আক্ষেপ। গল্প করতে করতে জানতে পারল যে রবিনের নিজস্ব একটা স্যাটেল আছে। ব্যাপারটা ধ্রুবর জন্য বেশ বড়সড় ব্যাপার। যদিও ধ্রুবও তার বাবাকে কখনও কাছে পায় নি। বাবা একজন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সে তুলনায় ধ্রুব আহামরি কিছু নয়। যদিও ধ্রুব তার সমকালিনদের থেকে অনেক ভালো ক্রেডিট পেয়েছে। তার কিছু কিছু ডিজাইন বিজ্ঞান সমিতি গ্রহণ করেছে তবুও ধ্রুবর মনে হয় সে তার বাবাকে অতিক্রম করে যেতে পারেনি। ধ্রুব সব সময় চেষ্টা করে তার বাবাকে অতিক্রম করে যেতে। তার বাবাকে হারিয়ে দিতে। আর মা তো ছেলেবেলায়ই মারা গেছে। ধ্রুব জন্মের পরপরেই মা মারা যায়। মা মারা যাওয়ার পরে বাবা আর বিয়ে করেনি। আসলে বাবার গবেষণায় পুরোপুরি নিজেকে নিবেদন করেছিল। ল্যাবে বসেই তার সময় পুরোটা কাটে। অবশ্য বাবা এই শতাব্দির সবথেকে বড় বৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞান সমিতির প্রধান বাবা। কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের প্রধান। ধ্রুব তার বাবাকে নিয়ে খুব গর্ব করে অবশ্য ধ্রুব জানে যে তার থেকেও মানুষরা তার বাবাকে নিয়ে বেশ গর্ব করে।

ধ্রুবর তার বাবার প্রতি রাগ লাগছে। এইযে এতবড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। অথচ বাবা এটা কি জানে? একবারও যোগাযোগ করল না। সত্যিই রাগ হচ্ছে বাবার প্রতি। অবশ্য একজন কিশোরের কাছে এই রাগটা অস্বাভাবিক কি? কাকে জিজ্ঞাসা করবে ধ্রুব? নিশাকে? সে কে? বন্ধু? নাকি অন্য কিছু। মাঝে মাঝে ধ্রুব নিশার দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটার চোখগুলি বেশ সুন্দর। এমন সুন্দর চোখ ধ্রুব কখনও দেখেনি। আর সবসময় দুষ্টমি অবশ্য ধ্রুব নিশার দুষ্টমি উপভোগ করে। হঠাৎ নিশার চোখে চোখ পড়ল। নিশা পিছনে তাকিয়েছিল। মেয়েদের কি আলাদা চোখ আছে নাকি? কিভাবে বুঝতে পারে যে আরেকজন তার দিকে তাকিয়ে আছে। ধ্রুব একটা হাসি দিল নিশাও মুচকি হাসি দিয়ে সেই হাসির উত্তর দিল। ঠিক সেই সময় রবিন বলল : দেখ দেখ...

তারা সামনে বিশাল লেক দেখতে পেল। পরিষ্কার পানি। অনেক উচু থেকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। ধ্রুব বললো আপাতত নিচে নেমে দেখি কিছু আছে কিনা?

রবিন বলল ঠিক আছে। একটু নেমে দেখি।

নিশা বলল আমরা তাহলে আরো একটি গ্রহ আবিষ্কার করলাম যেখানে পৃথিবীর মতই পরিবেশ আছে।

: অবশ্যই এটা একটা বড় আবিষ্কার।

তাদের শাটলটি নিচে নামল। আর নিচে নামতে নামতে তারা আবিষ্কার করল যে নিচে কিছু বড়ির মত দেখা যাচ্ছে। যদিও তা প্রাচীনকালের বাড়ির মত। তবুও তারা সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আশেপাশের মাটি দিয়েই সে বাড়ি গুলি তৈরি করা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে বেশ অপটু হাতে তৈরি করা হয়েছে। তাদের শাটল নিচে নামল। তখন আরো স্পষ্ট হয়ে সব বোঝা গেল। আর এই প্রথম বারের মত তারা গাছ দেখতে পারল। সবুজ মাঠে যব জাতীয় কিছু বোনা হয়েছে। ঠিক হল শুধুমাত্র ধ্রুব ও রবিন বাইরে যাবে। তারা যেয়ে পর্যবেক্ষণ করে আসবে। তারা সাথে একটা রক্ষী রোবটকে নিল।

তারা যোগাযোগ মডিউল দিয়ে নিজেদের যোগাযোগ ব্যবস্থা চেক করে নিল। রবিন ধ্রুবের হাতে একটা অস্ত্র দিল। অবশ্য এই অস্ত্রটার ব্যবহার ধ্রুব জানে। তারা সাবধানে লেকটার দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা লেকে পৌঁছল। লেকটার পানি খুব সুন্দর। ধ্রুব মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। অবশ্য সবসময় সতর্কদৃষ্টিতে তারা এগুচ্ছিল এবং চারিদিকে দেখছিল। লেকের এক কোণায় একটা নৌকার মত কিছু পড়ান রয়েছে। তারা সেদিকে এগুল। কিন্তু শুধুমাত্র নৌকাটিকে দেখতে পেল।

: রবিন চল ওই বাড়িগুলির দিকে যাই। এই দিকে তো কিছুই নেই। : হুম কিন্তু মনে হচ্ছে কেউ না কেউ আছে। : রবিন একটা কথা বলব। : বল : আমার কেন জানি মনে হচ্ছে যে এরা পৃথিবীর মানুষ। : কিভাবে বুঝলে? : দেখনা এই নৌকাটার ডিজাইন। দেখতে একদম আমাদের মতই। : কিন্তু বাড়িগুলি দেখতে তো অন্যরকম : সেটা হয়তো এখানকার উপকরণের কারণে হতে পারে।

তারা বাড়িগুলির দিকে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিল। বাড়িগুলি একটু অদ্ভুত রকমের। আশেপাশের মাটিগুলি দিয়ে তা তৈরি করা হয়েছে। পাশের লাল মাটিগুলির কারণে বাড়িগুলি একটু লালচে রঙ ধারণ করেছে। কিন্তু বাড়িগুলি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে। আর যাই হোক তারা নিশ্চিত হল যে এই বাড়িগুলিতে কেউ থাকে না। প্রায় পনেরটির মত বাড়ি তারা পেল। সব বাড়িতে উকি মেরে দেখলো কোথাও কোন কিছুর অস্তিত্ব পেল না। যারা থাকত তারা কেউ নেই। অনেক আগেই তারা ছেড়ে চলে গেছে। কোথাও কারো চিহ্নই নেই। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত।

: কোথাও তো কেউ নেই। - রবিন বলল। : হুম। চল একটু ওদিকে পাহাড়ের ওই ধারটা দেখি।

তারা পাশের একটা পাহাড়ের পাশে গেল। পিছন পিছন রোবটটিও চলল। তার হাতে অগ্নেয়াস্ত্র।

: জায়গাটা সুন্দর। কিন্তু যারা এখানে থাকত তারা গেল কোথায়? : এই যে এইখানে জমিতে যে ফসলগুলি আছে তা তো কেউ না কেউ লাগিয়েছে। : তাই : তাহলে তো কারো না কারো থাকার কথা : আসলেই অদ্ভুত

তারা একটু দূরে তাকিয়ে দেখল কয়েকজন কিশোর দূর মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফসলের ক্ষেতে কি জানি করছে। ধ্রুব ও রবিনকে দেখেই তারা সতর্ক হয়ে গেল। তারা উঠে দাঁড়ালে ধ্রুব বুঝতে পারল যে তারা মোট তিনজন। এর মধ্যে একজন পিঠ থেকে তার অস্ত্রটি বের করে ধ্রুবদের দিকে তাক করল। তারা বুঝতে পারল যে বিপদজনক। হঠাৎ করে সেই ছেলেটি গুলি মারলো। তা ধ্রুবদের রোবটির গায়ে লাগলো। ধ্রুবরা তাড়াতাড়ি আড়ালে চলে গেল। অন্য ছেলেদের হাতে অস্ত্র ছিল না। কিছুক্ষণ গুলি মারার পরে ধ্রুবদের রোবট সেই অস্ত্রটির দিকে লেজার মেরে সেই অস্ত্রটিকে কাবু করে দিল।

রবিন বলল আমাদের এই রোবটটি সবথেকে আধুনিক। তা বিশেষ ধরনের লেজার বিম দিয়ে অপর অস্ত্রকে নষ্ট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ধ্রুব বলল সত্যিই অদ্ভুত। বিনা রক্তপাতে সমস্যার সমাধান হল।

একটু পরে তারা দেখল ছেলেগুলি উল্টো দৌড় দিল। ধ্রুব রবিনরাও দৌড় দিল। ছেলেরা দূরের পাহাড়ের দিকে গেল। ওই দিকে একটা ছোট বার্গি মত যান দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেরা সেটায় বসল তখন ধ্রুবরা প্রায় তাদের কাছে পৌঁছে গেল। ধ্রুবরা সবসময় নিশার সাথে যোগাযোগ মডিউলে যোগাযোগ করছিল এবং তাকে সব জানিয়ে রাখছিল। তার কিছুক্ষণ পরেই ধ্রুব একটা ছেলেকে ধরতে পারল। রোবটটি অন্য দুজনকে ধরে ফেলল। আর ছেলেরা যেতে পারল না।

আমাদের ছেড়ে দাও সবথেকে বড় ছেলেটা চিৎকার করতে লাগল। তাদের ভাষায়ই কথা বলছিল। ধ্রুব বেশ অবাক হয়ে গেল। ধ্রুবরা তাদেরকে তাদের স্যাটেলে নিয়ে এল। তাদের কাছ থেকে ধ্রুবরা অনেক কিছু জানতে পারল।

আজ হতে ৫০ বছর আগে তাদের শাটলে করে তারা এই গ্রহে এসে হারিয়ে যায়। এই ছেলেরা তৃতীয় প্রজন্মের। তাদের আগের আগের প্রজন্মরা সেই শাটলে মোট পঞ্চাশজন ছিল। শাটলটি একটি ব্ল্যাকহোলের মাঝে যেয়ে হারিয়ে যায়। তারপরে তারা এই গ্রহে এসে পৌঁছে। কিন্তু তখন এই গ্রহে কোন পানি ছিল না। তারা কৃত্রিম ভাবে পানি তৈরি করতে সক্ষম হয়। এর পর তারা কিছু ফসল করতে সক্ষম হয়। সেই ফসল দিয়েই তারা জীবন যাপন করে। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই অনেকগুলি দলে ভাগ হয়ে যায়। একদল অপরদলকে আক্রমণ করে সব কিছু দখল করে নেয়। তাদের মধ্যে এই শত্রুতার প্রধান কারণ হল খাবার। কেননা তাদের মূলত উৎপাদন করা শষ্যের উপরই জীবন যাপন করতে হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই মারা গেছে শুধুমাত্র অন্ত:গৃহ কোন্দলের কারণে। বলা যায় মোটামুটি এখনও তারা যাযাবর জীবন যাপন করছে। ছেলেগুলির নাম জানা গেল সিক নওরি ও ইয়াম। এর মধ্যে ইয়ামই সব কথা বলছিল। ইয়াম বলল আমাদের নেতা মিলিও। মিলিও বেশ বৃদ্ধ ও বুদ্ধিমান একজন লোক। তিনি যুদ্ধ পছন্দ করেন না। কিন্তু শত্রুপক্ষ ইয়ান্তার কারণে প্রায়শ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। এই মিলিও ও ইয়ান্তা হল মূল দুটি দল তারা অনিজেদের অঞ্চল ভাগ করে নিলেও। ইয়ান্তার লোকজন ফসল তৈরিতে তেমন পটু নয়। বরং তারা মিলিও গ্রুপের কাছ থেকে খাবার কেড়ে নেওয়াতেই উৎসাহ বেশি। তবে মিলিওরা যুদ্ধে না জড়াতে চাইলেও তারা যুদ্ধে বেশ দক্ষ।

ধ্রুব তাদের কথাও বলল। কিন্তু ধ্রুব যখন সেই বিশাল শাটলের কথা বলল তখন ইয়াম বলল যে সেটা ইয়ান্তার শাটল। কিন্তু সেই শাটলটি কিছুদিন আগে বিস্ফোরণ হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। আর তাই ইয়ান্তার দল আরও পড়িমড়ি হয়ে সবাইকে আক্রমণ করে বসছে। কেননা ইয়ান্তা ও মিলিও গ্রুপ দটি ভাগ হওয়ার সময় এই শাটল নিয়ে প্রচুর যুদ্ধ হয়। কেননা শাটলটা তাদের ফিরে যাওয়ার প্রধান যানবাহন। কিন্তু সেটা শেষে ইয়ান্তার দল নিয়ে নেয়। আর মিলিও নেয় সবথেকে উর্বর মাটির এলাকা। কেননা বুদ্ধিমান মিলিও জানতো যে ফিরে যাওয়ার চেয়ে তাদের এখানে খেয়ে জীবন ধারণ করাটা হবে জরুরি। কিছুদিন আগে সেই শাটলটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ইয়ান্তার দলবল বেশ ক্ষেপে আছে। তারা এখন ফসল দখল করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কেননা ইয়ান্তার খাবার ভান্ডার প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

ধ্রুব ইয়ামের কথা শুনে কন্ট্রোল প্যানেলের জানালার দিকে দাঁড়িয়ে পালজারের চারিদিকের দৃশ্যটি দেখছিল। হঠাৎ পিছন থেকে নিশাও চলে এসে ধ্রুবর পিছনে দাঁড়াল।

নিশা বলল কি অদ্ভুত তাই না। : ইয়ামের কথা যদি সত্যিই হয় তবে একটু অদ্ভুত। যে মাদারশিপটা হারিয়ে গিয়েছিল তা যে আজো টিকে আছে তাই তারা জানত না। : অতিথিদের কি দিয়ে আপ্যায়ন করব? : আমার তো মনে হয় যা দিবে তাই তাদের কাছে ভালো লাগবে। : তারপরেও। : আচ্ছা নিশা ওরা মিথ্যা বলছে না তো। : আমার মনে হয় সত্যি বলছে। কেননা কিশোর বয়েসের ছেলেরা নেহাৎ মিথ্যা কথা বলে না।

নিশা তাদের কিছু খাবার দিল তারা বেশ তৃপ্তি সহকারে খেল। এমন খাবার তারা এই জীবনে নাকি খায়নি।

ইয়াম বলল আমার বাবা সবসময় বলতেন যে কেউ না কেউ আসবে আমাদের কাছে।

নিশা : তোমার বাবা কি বেঁচে নেই। ইয়াম : আমার বাবা-মা ইয়ান্তার হাতে মারা গেছে। আমি ইয়ান্তাকে কখনই ক্ষমা করব না। বলতে বলতে সে তার হাত মুষ্ট করল। বোঝাই যাচ্ছে ইয়ামের মনে ইয়ান্তার জন্য বেশ ক্ষোভ রয়েছে।

ধ্রুব বলল আমরা তো এসেছি। তবে তোমাদের সব খবর মানুষ জাতিদের জানান দরকার।

রবিন বলল আমি সব তথ্য কেন্দ্রকে জানাচ্ছি।

ইয়াম : কিন্তু আজই মিলিও ও ইয়ান্তা দলের মধ্যে খুব বড়সড় যুদ্ধ হবে।

রবিন : সেই জায়গাটা কত দূরে? ইয়াম বলল এখান থেকে অনেক দূরে। তবে আমি জায়গাটা চিনি।

সবাই একে অপরের দিকে চাইল। আর বলে দিতে হল না কি করতে হবে। একটু পরেই স্যাটেল আবার আকাশে উড়াল দিল। ইয়াম বলল যে এটাই তাদের প্রথম স্যাটেল যাত্রা। তবে ইয়ান্তা গ্রুপের সবাই স্যাটেলে করে পরিভ্রমণ করে। ইয়ামকে সত্যিই খুব উল্লসিত বলে মনে হল। সত্যি সত্যি তারা তাদের আশার অপেক্ষায় ছিল।

একটু দূরে ধ্রুব ও নিশা গল্প করছিল। : ধ্রুব তোমার কেমন মনে হচ্ছে? : অবশ্যই আমি খুবই উল্লসিত। : তা তো হবেই তোমার একটা ভুলের কারণে আজ তাদের যাযাবর জীবনের অবসান হতে যাচ্ছে। সব ক্রেডিট তোমাকে দিতে হয়। : আর এতদূর থেকে যারা চলে এসে আমার জীবনটা বাঁচাল তাদের বুঝি কোন ক্রেডিট নেই।

তারা আবার নতুন তিন অতিথির কাছে এল। নিশা সব কিছুই সেন্ট্রাল ইউনিটকে জানাতে লাগল।

: ধ্রুব সাবধানে থাক। - হঠাৎ এক অপরিচিতের শব্দ ভেসে আসল।

ধ্রুব উঠে মনিটরের কাছে এল।

: বাবা ! : হ্যা ধ্রুব। একটু ব্যস্ত থাকায় তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমি সব কিছুই পরিচালকের কাছ থেকে জানতে পেরেছি। : আমি ভালো আছি। তুমি ভালো আছ? : হ্যা ভালো। তবে ধ্রুব তোমাদের একটা কথা বলার আছে। : বল। : তোমরা যে যুদ্ধের কাছে যাচ্ছ। তা কিন্তু খুবই বিপদজনক। : কিন্তু তাদের যুদ্ধ না থামালে তো আরো অনেক মানুষ মারা যাবে। : ঠিক আছে তোমরা স্বাধীন। তোমরা তোমাদের অবস্থান বিচার করে যে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তোমাদের আছে। কিন্তু এই ইয়ান্তা খুব দুর্ধর্ষ এবং খুব কৌশলি। তার ডিএনএ গঠন বলছে যে খুব ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করতে পারে। : বুঝলাম। তথ্যটা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। তবে আপনাকে বলছি যে আমরা তাদের যুদ্ধ থামাতে যাব। : ঠিক আছে বেস্ট অফ লাক.. মাই সান।

ধ্রুব ও তারা বাবার কথোপকথন শেষ হল। ধ্রুব খুব রাগ করে আছে তার বাবার প্রতি। এইযে এতবড় একটা ঘটনা ঘটছে। তা বাবা জেনেও তার সাথে যোগাযোগ করেনি। কি এমন ব্যস্ততা। সারাটা জীবনই এমন ব্যস্ততা দেখিয়েছল।

তাদের পোশাক বেশ জীর্ণ হয়ে ছিল। তবে সেই দিকে নজর দেওয়ার সময় পেল না। কেননা তাদের মনিটরের স্ক্রিনে ইয়ান্তাদের মাদারশিপটা দেখা গেল। মাদারশিপটা দেখে ধ্রুব নিশ্চিত হল যে এটাই সে রাতে দেখেছে। তবে মাদারশিপটি অবতরণ করে আছে। আর তার একটু দূরেই একদল লোক দাঁড়িয়ে আছে। আর অপরদিকে আরো কিছু লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের অবস্থান দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ইয়ান্তা ও মুসার দল কোনটি।

রবিন বলল আমি স্যাটেলটা প্রথমে অবতরণ না করে উপর থেকেই তাদের আমাদের কথা বলি।

তাদের স্যাটেলটি যত নিচে নামতে লাগল ততোই নিচের সব কিছু স্পষ্ট হতে লাগল। দুদলের হাতেই অগ্নেয়াস্ত্র আছে। ধ্রুব সব অস্ত্রগুলি তাদের রোবটকে দিয়ে স্ক্যান করিয়ে নিয়ে দেখল যে তাদের রোবট সেই অস্ত্রগুলি অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তারা উপর থেকেই মাইকে সবাইকে বলল যে তারা পৃথিবী থেকে এসেছে। আপনারা যুদ্ধ বন্ধ করুন। পৃথিবী থেকে আরেকটা স্পেসশিপ আসছে সবাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নিশা মাইকটি ইয়ামকে দিল কেননা ইয়ামকে ওরা চেনে।

ইয়ামও একই কথা বলল।

সামনে একজন এগিয়ে কথা বলল। ইয়াম বলল যে সে মুসা। তাদের দলপতি।

মুসা বলল স্বাগতম আমাদের গ্রহে।

কিন্তু ইয়ান্তা তাদের কথা শুনতে চাইল না। ইয়ান্তা বলল এটা একটা ষড়যন্ত্র। তোমরা পৃথিবী থেকে আস না। পৃথিবী এখান থেকে অনেক অনেক দূরে। এতদূর থেকে আসা সম্ভব না। ইতিমধ্যেই তাদের শাটলটি মাটিতে নেমেছে। ধ্রুবই প্রথমে নেমে সামনে এগিয়ে গেল। ওই দিক দিয়ে ইয়ান্তা ও মুসা ধ্রুবর দিকে এগিয়ে এল।

ধ্রুব বলল আমরা নতুন হাইপার ড্রাইভ প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছি। ফলে আমরা আলোর মত গতিতে যেতে পারি।

মুসা বলল কিন্তু আমরাও অনেকটা সেই রকমই হারিয়ে এসেছি এই পালজার গ্রহে।

ধ্রুব বলল আসলে আপনারা যেমন করে ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে গেছেন। হাইপার ড্রাইভ ব্যাপরটাও সেরকম। হাইপার ড্রাইভ প্রযুক্তিতে সেরকমই এক বিশাল আকর্ষণ ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করা হয়। তারপর সেই কেন্দ্র দিয়ে স্যাটেলটিকে চালিয়ে বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করা হয়। হাইপার ড্রাইভের ফলে আলোর গতিতে স্যাটেলটি চলে তাই মুহূর্তের মধ্যে বিশাল দূরত্ব পার হওয়া সম্ভব।

ইয়ান্তা বলল কিন্তু আমরা কি সেই পৃথিবীতেই হাইপারড্রাইভের অপর প্রান্ত তৈরি করে সেখানে সরাসরি চলে যেতে পারি না।

: না তা সম্ভব হবে না। কেননা হাইপার ড্রাইভ তৈরি করতে বিশাল ইলেকট্রো- ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করতে হয়। কোন জায়গায় তা তৈরি করা সম্ভব না। শুধুমাত্র মহাকাশে তৈরি করা সম্ভব।

ধ্রুবদের পিছন থেকে একটি রোবট নেমে এল। আর ঠিক তখনই ইয়ান্তার দল রোবটের দিকে গুলি করা শুরু করল। ধ্রুবরা দ্রুত আড়াল এ চলে এল। রোবটের গায়ে গুলি ও লেজার বিম লাগতে লাগল। রোবট পড়ে গেল। ধ্রুব বুঝল না এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। তাদের রোবট বেশ শক্তিশালি। স্যাটেলের দরজা খোলাই ছিল। সেই দরজা দিয়ে ইয়ান্তার দল তাদের স্যাটেলে ঢুকে গেল। ভিতরে নিশা ও একটি রোবট আছে। হঠাৎ ইয়ান্তার দলবল তাদের দিকে গুলি মারতে লাগল। মরিয়া হয়ে ধ্রুবরাও শেষ পর্যন্ত অস্ত্র হাতে নিল। কিছু গোলাগুলিতে ইয়ান্তার কিছু লোক আহত হয়ে পড়ে গেল। রোবটটি উঠতে সক্ষম হল। সেও গোলাগুলি শুরু করল। তাতেও ইয়ান্তার কিছু লোক মারা গেল। ঘটনাগুলি এত দ্রুত ঘটতে লাগল যে ধ্রুবর ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। ধ্রুব সামনের দিকে মুসার পাশে ছিল। ইয়ান্তার বাকি লোকেরা স্যাটেলের ভিতরে ঢুকে যেতে সমর্থ হল। গোলাগুলি বন্ধ হলে ধ্রুব পাশ ফিরে যে দৃশ্য দেখলো তার জন্য প্রস্তুত ছিল না। রবিনের গায়ে লেজার বিম লেগে তার বুককে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। দ্রুত ধ্রুব রবিনকে তার হাতে নিল। রবিন অনেক কষ্টে কথা বলল ধ্রুব তোমার উপর দায়িত্ব দিয়ে গেলাম....

কথাগুলি বলার সাথে রবিনের হাত নিথর হয়ে গেল। কষ্টে ধ্রুবর কান্না পেল। রবিন ও সে একসাথেই ট্রেনিং নিয়েছিল। রবিনের দেহ ধ্রুবর হাতে অনেক ক্ষণ থাকল। সবাই নিস্তব্ধ হয়েছিল। কিছু করার আগেই এমন একটা ঘটনা ইয়ান্তার দল করে ফেলবে তা তারা কল্পনাও করেনি। ইয়ান্তার গোলাগুলিতে মুসাও মারা গেছে। আরো অনেকেই মারা গেছে। লোকজনের কম ক্ষয়ক্ষতি হোক এই ভেবেই ধ্রুবরা ছুটে এসেছিল। অথচ অনেকজন মারা গেল। ধ্রুব রবিনকে হারাল। সে খুব ভালো স্যাটেল পাইলট ছিল। মুসার মৃত্যুতে মুসার লোকজন বেশ ভেঙে গেল। তারা হাহাকার করতে লাগল। এর মধ্যে অনেকেই মুসাকে খুব ভালোবাসত। তারা বেশ কান্নায় ভেঙে গেল। সবাই ধ্রুবকে ঘিরে ধরল। আর ঠিক তার একটু পরেই ধ্রুবদের স্যাটেলটি আকাশে উড়াল দিল।

তারিখ: ২৫ আগষ্ট ২০০২