মশিউরের খেরোখাতা

১৯ পর্ব: টিমকে টাস্ক নয়, লক্ষ‍্য কিংবা সমস‍্যা দিন (১২ ফেব্রুয়ারী ২০২১)

আজকের এই পর্বটি মূলত ম‍্যানেজারদের জন‍্য, যিনি কোন টিম বা কাউকে ম‍্যানেজ করেন। টিমকে লিড করতে যেয়ে সাধারণত বেশীরভাগ ম্যানেজার একটা লক্ষ‍্য ঠিক করে দিয়ে তার টিমের লোকজন কে বলেন যে তুমি এটি করবে, ওটি করবে। তার নেতৃত্ব দিয়ে টিমকে সামনে নিয়ে যাবার কথা থাকলেও, নেতৃত্ব এর পরিবর্তে টিমের টাস্ক ম্যানেজার এর দায়িত্বটি তিনি পালন করেন। এর ফলে টিমের লোকজনের তার উপর একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে যায়। এটা কর ওটা কর, এইধরনের হুকুমদাতার স্থানটি সে করে নেয়। যখনই মানুষকে খুব কাছাকাছি থেকে এটা কর, সেটা কর বলা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটা তিক্ততা তৈরী হয়। মানুষ কারো কাছে কমান্ড নিতে অভ‍্যাস্ত নয়, সে স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছেয় কাজ করতে পাছন্দ করে।

এমনই একটি ভুল আমি আমার জীবন থেকে শেয়ার করছি। জাপানে ছাত্রাবস্থায় আমি বাংলাদেশের উপর প্রায়শই অনুষ্ঠান এর আয়োজন করতাম। বেশীরভাগ সময়ই সেগুলো ছিল বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি বিদেশীদের কাছে তুলে ধরা। কোন একটি বছরে একটি অনুষ্ঠানের পুরো প্লানটি আমি নিজেই আয়োজকদের সাথে আলোচনা করে পরিকল্পনা করেছিলাম। এরপরে শিল্পী ও সদস‍্যদের মিটিংয়ে ডেকে বললাম- আপনি এটি করবেন, ঐটি করবেন। মিটিং করার সময় আমার কাজ ছিল সবাইকে টাস্কগুলো বিতরন করা। পরে মূল অনুষ্ঠানে দেখলাম কারো মধ‍্যেই কোন আগ্রহ নেই। আমি জোর করে সবাইকে দিয়ে অনুষ্ঠানটি করলাম। বলা যায় অনুষ্ঠানটি একেবারেই হযবরল হল। সবাই ইচ্ছার বিরূদ্ধে অনেকটা জোর করে প্রোজেক্টটি শেষ করলাম।

এটা নিয়ে পরে এটা নিয়ে এক ভাইয়ের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম, তারা মোটামুটি আমার উপর বিরক্ত। পরে কিছুদিন দেখি কোন দাওয়াতে আমাকে আর ডাকা হচ্ছেনা। বুঝলাম আমার প্রতি একটি তিক্ততা তৈরী হয়েছে এবং যার জন‍্য আমি নিজেই দায়ি। মনটা প্রচন্ড খারাপ, সমুদ্রের পাশে বসে বসে হা হুতাস করছি। পরে এক ভাই আমাকে বললেন, তুমি আমাদের কাজগুলো না দিয়ে, “লক্ষ‍্যটা কি?” সেটা আমাদের দাও তাহলে দেখবে সবাই স্বেচ্ছায় অংশ নিবে।

এর পরের বছর আমি আর সেই ভুলটি করলাম না। এইবার ঠিক করলাম, এইবার টাস্ক দিবনা। সবাইকে দাওয়াত দিয়ে কথাচ্ছলে বললাম,

  • “জানেন এই শহরের মেয়র বলছিল বাংলাদেশের কোন আনুষ্ঠান এইখানে করা যায় নাকি? গতবার তো কিছু শিল্পী ছিলেন, এইবছর তো করা কঠিন হবে” এমনই ভাবে কৌশলে একটি সমস‍্যা বা “লক্ষ‍্য” কে তাদের কাছে তুলে ধরলাম। ”আমি করবো” - এমন সিদ্ধান্ত না দিয়ে, “কি করা যায় বলেন তো? আমরা কি পারবো?”

  • এমন প্রশ্নই তুলে দিলাম তাদের কাছে। “আমি” ব‍্যবহার না করে, বারবার “আমরা” শব্দটি ব‍্যবহার করছিলাম। এইবার দেখি অদ্ভুত কাজ হল।

সবাই আমাকে বকা দিয়ে বললেন, “কেন পারবোনা! তুমি আয়োজকদের “হ‍্যা” বলে ফেল। এমন সুযোগ হাতছাড়া করা যাবেনা। “ এক ভাই বললো, আমি এটা করতে পারবো। অন‍্য আপা বললেন আমি এটা করতে পরবো। কেউ জাপানীদের শাড়ি পড়ানোর দায়িত্ব নিল, কেউ বাংলাদেশী রান্না এর দায়িত্ব নিল। এইবার সবাই নিজ থেকে স্বতস্ফূর্ত ভাবে অংশ নিল।

সেবার কোন কিছু করার জন‍্য কাউকে আমার কিছুই বলতে হয়নি। কাউকে কোন টাস্ক দিতে হয়নি।

এক অদ্ভুত ধরনের শিক্ষা হল আমার। এই শিক্ষাটা পরবর্তিতে আমি সব সময়ই আমার টিমে প্রয়োগ করে এসেছি।

সিঙ্গাপুরের একটি পলিটেকনিক কলেজের কিছু কিছু ইন্টার্নকে আমার কাছে দেয়া হল, তাদেরকে দিয়ে কিছু প্রোজেক্ট দেবার জন‍্য, যেন তাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের অভিজ্ঞতা হয়। সেবারও আমি আমার পুরান ম‍্যানেজমেন্টের কৌশল ব‍্যবহার করলাম। তাদেরকে কোন টাস্ক একেবারেই দিলাম না। কখন আসতে হবে, কখন যেতে হবে- তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের দিলাম। কিন্তু তাদেরকে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং সমস‍্যা দিলাম। এর পরে দেখি তার দিন-রাত সেই সমস‍্যাটি নিয়ে কাজ করছে। মাঝে মধ‍্যে তাদের টেবিলের পাশে বসে সমস‍্যাটি নিয়ে কাজ করলাম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমাধানগুলো আমার জানা থাকলেও ভাব করতাম, কি কি অপশন আমাদের আছে - বলো তো? তারপরে সেখান থেকে তাদেরকে দিয়েই সমাধান গুলো বের করিয়ে নিয়ে আনতাম। পরবর্তিতে দেখেছি, এই কৌশলটি বেশ কাজ করে। আমি যদি হুট করে সমাধানটা যদি বলে দিই, তবে তারা কাজে কোন মজাই পেতনা।

যখন একজন ছাত্র সমাধানটি বের করে নিয়ে এল, আমি তখন সবার সামনেই তার খুব প্রশংসা করে বললাম, “দেখলে কেমন স্মার্ট ছেলেটি। আমি এত্তদিন ধরে এটা বের করতে পারিনি, কিন্তু সে এটা নিজে নিজেই এটা বের করে ফেলেছে। সাব্বাস!”

পরে আমার সহকর্মির সাথে কফিশপে দেখা হলে বলেছিল, আমি তো জানি যে তুমি এটার সমাধান গত বছরেই করেছিল। আমি চোখ টিপ মেরে বললাম, “কিছু সময় বোকা এর ভান করতে হয়।”

এমন একটি ঘটনাতে ছেলেটির কনফিডেন্স খুব বেড়ে গিয়েছিল। সেই বছর তার কলেজের প্রতিযোগিতায় সেই প্রোজেক্টটি পুরস্কৃত হয়। এখন সে একটি বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।

একজন লিডার এর উচিত সব সময় টিমের অন‍্যকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে সেই দিকে মনোনিবেশ করা। জাপানিজে Seicho (成長, সেইচো), বলে একটি শব্দ লিডারশিপে খুব ব‍্যবহৃত হয়। তার মানে হল টিমের অন‍্যদেরকে কিভাবে বর্ধিত বা উন্নতি করা যায় সেই দিকে মনোনিবেশ করান।

আমরা লিডার কিংবা ম‍্যানেজররা প্রায়সই নিজেকে বেশী গুরুত্ব দিতে যেয়ে টিমের অন‍্যদের Seicho এর দিকে মন দিই না কিংবা সম্পূর্ণ ভাবে অবহেলা করি। যদি সবাই কে টাস্ক বিতরণ করা শুরু করি তবে তাদের বৃদ্ধি বা উন্নতি হবে না, সেটা হবে আরোপিত। এবং হিতে সবারই তিক্ততা বাড়বে। হয়তোবা সামনে কিছু বলবে না, তা হয়তো সম্মান করে, হয়তোবা পদের কারনে, কিন্তু এটার ফলে নিজের ব‍্যান্ডিংটি মারাত্মক রকমের খারাপ হবে। তাই নিজের ব্রান্ডিং ভালো করতে হলে, টিমের কাছ থেকে সম্মান আদায় করে নিতে হলে- টাস্ক নয়, টিমকে একটি লক্ষ‍্য বা সমস‍্যা দিন। কিভাবে সমাধান করতে হবে বা সেই লক্ষ‍্যে পৌছতে হবে তা নিজেই আরোপিত না করে, টিমকেই দিন। তাদেরকেই দিন তা নির্ধারণ করতে। সেই ক্ষেত্রে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং টিমের মধ‍্যে সবার একটা সুন্দর টিমওয়ার্ক হবে।