ক্যারিয়ার লাইফের গল্প: কাজকে ভালো লাগা
ক্যারিয়ার লাইফের গল্প: কাজকে ভালো লাগা
প্রথম পর্ব
সন্ধ্যায় মাগরিব নামাজের পরে দেখলাম ফোনে অনেকগুলি কল এসেছে। বৌকে চা করতে বলে সোফাতে হেলান দিয়ে কলব্যাক করতে বসলাম। আকাশে রক্তীম আভা এখনোও শেষ হয়নি। সিঙ্গাপুর মেট্রোপলিটন শহর হলেও ঠিক সন্ধ্যায় এত্ত পাখি হৈ চৈ করে যে, মনটা কেন যেন ব্যাকুল হয়ে পড়ে - ওদের ডাক শুনে। পাখিরা নাকি তার সঙ্গীকে ডাকবার জন্য গান করে অমন শব্দ করে। কিন্তু সন্ধ্যায় ওদের হৈচৈ এর শব্দ শুনে মনে হয়, তারা যেন তাদের প্রিয়জনদের তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফেরার জন্য ডাকছে। আর ছেলেমেয়েরা মনে হয় চিৎকার করে উত্তরে বলছে, “আমি আসছি মা, একটু অপেক্ষা কর”। ইস্ , এমন করে যদি আমিও মায়ের কাছে চলে যেতে পারতাম!
ফোনে কলব্যাক করতেই প্রাইম ব্যাংকের সামি ভাইয়ের সুমিস্ট গলায় ভয়েস রেকর্ড বাজছে। আজকের ব্যাংক রেট কত তা জানার জন্য। আগে যেখানে ডিঙ্গাপুরের ডলার রেট ছিল ৬০-৬১ এর কাছাকাছি এখন তা ৭০-৭১ এ পৌছে গেছে।করোনা আর সেই সাথে পুটিন এর পাগলামি পৃথিবীর অর্থনীতিটাকে একটু নাড়াচাড়া করে দিয়েছে।টাকার মান কমে যাওয়াতে সবাই এখন বাংলাদেশে টাকা পাঠাচ্ছে। এই সময়ে নিশ্চয় রেমিটেন্স অফিসগুলির ব্যস্ত থাকার কথা। এত ব্যস্ততার মধ্যেও ফোন করেছে যখন, নিশ্চয় তখন গুরুত্বপূর্ন কিছু্। সেই ব্যাংকের রবিন ভাই জানালেন যে, আমার কিছু সাক্ষর লাগবে।
পরের দিন অফিসের কাজের মাঝে সেরাঙ্গন ডেসকার রোডে প্রাইম ব্যাংকে হাজির হলাম। ব্যাংকের এক কোনায় ছোট একটি রুম নিয়ে এই ব্যাংকের ম্যানেজার সামি ভাই হাসি মুখে অভ্যার্থনা জানাল। তার একটু আগে সিঙ্গাপুরের আরেকটি বিদেশি ব্যাংকে কাজ করে এলাম। কাঠখোট্টা কাজ করে এসে, এই দেশি ভাইয়ের উষ্ণ অভ্যার্থনাতে সত্যিই মনটা ভরে গেল। প্রবাসে দেশী ভাইদের এই আলাদা ভালোবাসা আমি সবসময়ই উপভোগ করি। সামি ভাইয়ের সমন্ধে বলতে গেলে বলতে হয় পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর হাসি দিতে পারেন। পুরুষ মানুষের হাসি এমন সুন্দর হয়! বিশ্বাস না হলে একবার উনাকে দেখে আসতে পারেন। দিব্যি দিয়ে বলছি আপনারা আশাহত হবেন না।
উইকডে বা সাধারণ কাজের দিনগুলিতে এই ডেসকার রোডে এসে একটু হচকিত হলাম। শনি-রবিবার এইখানে বাংলাদেশীদের ভীড়ে পা ফেলা যায়না। প্রচুর বাংলাদেশীদের আনাগোনার কারণে, এই জায়গাটার নামই বদলে হয়ে গেছে- “বাংলা পাড়া”। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এর মতন করে সিঙ্গাপুরে এই জায়গাটিতে আসলে, মনে হবে যেন বাংলাদেশের কোন ব্যাস্ত পাড়াতে আপনি পা দিয়েছেন। কোনায় পানের দোকানের বিক্রেতা থেকে শুরু করে, বাংলাদেশী তরিতরকারি কেনার দোকান - সবই পাবেন এইখানে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিটাকে জব্বর শক্ত করে ধরে রেখেছে প্রবাসীদের রেমিটেন্স। সেটা না থাকলে আমাদের অবস্থাও শ্রীলংকার মতন হয় যেতে পারতো। কিংবা তা শীঘ্রই হতেও পারে বলে - জোর তর্ক শুনছি সোলাম মিডিয়াতে। তবে বেশি রেমিটেন্স পাঠানোর দেশগুলির মধ্যে- “সিঙ্গাপুর” প্রথম সারিতে। খুব ব্যাস্ত থাকার কথা হলেও দুপুর বেলায় যেয়ে দেখি, ভীড় নেই। এইখানে শ্রমিকরাই বেশি রেমিটেন্স পাঠায়। তারা সাধারণত সন্ধ্যার পরে আসে।
কেউ না থাকাতে, দ্রুত কাজগুলি সরে ফেললাম। এর পরে সামি ভাই তার সাথে দুপুরের খাবার খেতে অনুরোধ করলেন। এমনিতে আমি সহজে “না” বলতে পারিনা। আর সেখানে এই দেশি ভাইয়ের সাথে গল্প করার সুযোগটা আর কে হাতছাড়া করে? উনি সফলতার সাথে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের উচ্চপদে কাজ করছেন। তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার নেহাতই কম না। এই সুযোগে আমার “ক্যারিয়ার লাইভের গল্প” সিরিজের জন্য উনার কাছ থেকে কিছু টুকটাক টপিক পেয়ে যেতে পারি বলে - লোভা সামাল দিতে পারলাম না।
“ক্যারিয়ার লাইভের গল্প” টাইটেলে আমি মাঝে মধ্যে দেশ বিদেশের সফল মানুষগুলির সাক্ষাতকার ও তাদের কাছে শেখা টিপসগুলি নিয়ে গল্প লিখি। কবিতা লেখার পাশাপাশি এই গল্পগুলি লিখতে আমার বেশ লাগে। চলতে ফিরতে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়। আর সেই মানুষগুলির সাথে আড্ডাতে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়। সেগুলিই একটু গল্পচ্ছলে পাঠকদের সাথে শেয়ার করার জন্য এই “পদ্মাপাড়ের কবি মশিউর” এর একটা ব্যাক্তিগত প্রচেষ্টা।
খাবার খেতে খেতে উনার কাছে জানতে চাইলাম, ক্যারিয়ার জীবনে সফলতার জন্য কি প্রয়োজন? উনি মাত্র দুটি গুনের কথা বললেন। সেটা জানতে হলে আমার পরের পোস্টের অপেক্ষায় থাকুন।
——
দ্বিতীয় পর্ব
গত পোস্টে আমি গল্প করছিলাম প্রাইম ব্যাংকের ম্যানেজার সামি ভাইয়ের ক্যারিয়ার নিয়ে গল্প। দুপুরে উনার সাথে খাবার দোকানের কথা বলছিলাম আপনাদের।
সামি ভাই জিজ্ঞাস করলেন, “কি খাওয়া যায়?”। ইলিশ মাছ খেতে ইচ্ছে করছে বলতেই- উনি বললেন, “চলেন ঢাকা রেস্টুরেন্ট এ যাই”। এই বাংলা পাড়াতে অনেকগুলি খাবার দোকান রয়েছে, যেখানে আপনি একেবারেই বাংলাদেশি স্বাদের খাবার খেতে পারবেন। ঢাকা রেস্টুরেন্টে ঢুকেই বুঝলাম উনি এইখানে প্রায় খান এবং তাদের সাথে উনার একটা মাসিক খাবারে বন্দোবস্ত করা আছে। ইলিশ মাছ ও কিছু ভর্তা সহ খাবার নিয়ে আমরা খেতে বসলাম। খেতে খেতেই উনাকে জিজ্ঞাস করলাম ক্যারিয়ার জীবনে সফলতার জন্য কি বেশী গুরুত্বপূর্ণ?
কোন সময় না নিয়েই উনি বললেন, (১) “শখ” আর “পেশা” যদি এক করা যায় তবে আর কিছু লাগেনা। আর যদি এক না করা যায় তাহলেই সমস্যা।
শখ কে উনি passion বলছিলেন। বাংলাতে “শখ” বললে তার একটু পার্থক্য রয়েছে। Passion এর পুরো অর্থ হল, “strong and barely controllable emotion” বা “প্রবল ইচ্ছা বা অনুরাগ; উৎসাহ; প্রচন্ড আবেগ”। আমি সংক্ষেপে “শখ” হিসাবেই অনুবাদ করলেও শুধু শখ না, সেই সাথে কোন কিছু সম্পন্ন করার প্রবল ইচ্ছাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কবিরা প্রেমকে এইভাবে প্যাশন বললেও, পেশাগত জীবনে কর্মীদের ক্ষেত্রে কোন কাজ সম্পাদন করাও একই ভাবে “প্যাশন”। এইখানে শখ বলতে সেই প্যাশনকেই উনি বোঝাচ্ছেন।
উনি এবার উনার গল্প বললেন। উনি ছোট বেলা থেকেই মানুষকে ভালোবাসা ও তাদেরকে সাহায্য করতে চান। এছাড়া ব্যাংকার হবারও ইচ্ছে ছিল। এইখানে তার শখ ও পেশা একত্রিত হয়ে গেছে বলে আর এই কাজটিকে কাজ বলে মনে হয়না। পরে ভাবলাম - আসলেই যদি কাজটাকে আমরা নিজের শখ বলে উপভোগ করতে না পারি, তবে কাজ করতে কষ্ট হবে। তা একটা আলাদা স্ট্রেস তৈরী করবে - যা আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার অন্তরায়। এই ক্ষেত্রে আমাদের অনেক সময়ই সমস্যা হয় - “আমার শখটি কি”? এবং “কি কাজ করতে আমি আনন্দ পাই?” তা আমরা অনেক সময়ই খুঁজে পাইনা। আমার মনে হয়, এটি খুঁজে পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো লাগলো, সামি ভাই তার এই শখটিকে- উনি নিজের কাজের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন।
(২) ক্যারিয়ার জীবনের সফলতার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণের কথা উনি বললেন - পজিটিভ এটিচিউট বা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এটি থাকলে, পেশাগত জীবনে সামনে এগিয়ে যাওয়াটা সহজ হয়। যারা ইতিবাচক কথা বলে- তারা টিমে থাকলে কাজের পরিবেশটা ভালো হয়, এবং সামগ্রিক কাজের ভালো আউটপুট আসে।
টুকটাক আরো কিছু গল্প করতে করতে ইলিশ মাছের সুগন্ধে ভরা খাবার কখন শেষ হয়ে গেছে খেয়াল করিনি। বাংলায় যাকে বলে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া - তেমনই একই ভরপেটের খাবার খেলাম আজকে।
প্রথমে যে রেমিটেন্স এর কথা বলছিলাম। সামি ভাইয়ের কাছে জানলাম যে গত অর্থ বছর সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে গেছে এবং এর মধ্যে প্রাইম এক্সচেঞ্জই ২০% পাঠিয়েছে। এই শ্রমিক ভাইয়েরা আমাদের অর্থনীতিতে সত্যিকার ভাবেই ধরে রেখেছে। এই উপার্জনের পিছনে আমাদের দেশের ইনভেস্ট বলতে গেলে একেবারেই নেই। অথচ কি অবলিলায় এই শ্রমিকেরা তাদের কষ্টের টাকা তুলে দিচ্ছে আমাদের হাতে। সত্যিই এদের কথা আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, বৈ কি।
আমি সামি ভাইয়ের কাছে বিদায় নিয়ে, “(১) শখকে পেশা হিসাবে নেওয়া এবং (২) ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি” - কথা দুটি নিয়ে ফিরে এলাম। সামি ভাইয়ের ক্যারিয়ার জীবনের নির্যাস - এই দুটি কথাতে ব্যাপক গভীরতা লুকিয়ে আছে। তাই যেন বারবার উপলব্ধি করছিলাম। এইভাবে জীবনের গল্প চলতে থাকে। চলতে থাকুক আমারও গল্প।
(সমাপ্ত)
রেফারেন্স: https://www.bb.org.bd/en/index.php/econdata/wagermidtl
সিঙ্গাপুর, ৩০ জুলাই