মশিউরের খেরোখাতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের ভয় কেন? - ২য় পর্ব (২০২৪)

তারিখ: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

(গত পর্বে আলোচনা করেছিলাম টেকনোফোবিয়া নিয়ে। আজকে আলোচনা করবো এই ভয়ের কারণগুলি নিয়ে)

ছবিটি মাইক্রোসফটএর কোপাইলট দিয়ে তৈরী।

ছবিটি মাইক্রোসফটএর কোপাইলট দিয়ে তৈরী।

কেন আমরা নতুন কোনো প্রযুক্তি নিয়ে ভয় পাই? বিজ্ঞানীরা বলছেন যে এই কারণগুলির হল,

(১) জানার অভাব: নতুন এই প্রযুক্তিগুলি কীভাবে কাজ করে তা বেশিরভাগ সময়ই আমরা জানি না। এর একটি কারণ হল এই প্রযুক্তিগুলি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য বেশ গাণিতিক, কারিগরি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞানের প্রয়োজন যা অনেকসময় আমজনতার জন্য বোঝা কঠিন।

(২) চাকুরি হারাবার ভয়: নতুন প্রযুক্তিগুলি আমাদের চাকুরি খাবে, আমরা চাকুরি হারাব এবং কর্মসংস্থানের অভাব হতে পারে, এই ধরনের ভয় কাজ করে। যদিও চাকুরি হারাবার মূল কারণ হল সেই প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক সমস্যা কিংবা নতুন স্কিলসেট গ্রহণ করবার অনাগ্রহ, তবুও আমরা খুব সহজে একটি প্রতিপক্ষ তৈরি করার জন্য এই নতুন প্রযুক্তিগুলিকে দায়ী করে দিই। যেমন অনেক বেকার-রা পরিশ্রম না করে, চাকুরির বাজারের মন্দা অবস্থাকে দায়ী করে, কেননা সেই রকম একটি কারণ তার জন্য দায়ী করা আমাদের জন্য সহজ। আমরা নিজের দোষের থেকে, অন্য কারো উপর দোষ চাপাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

(৩) নিয়ন্ত্রণ হারাবার ভয়: নতুন এই প্রযুক্তিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না, এবং সেটি এক সময় মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে তেমন একটি ভয় আমাদের মধ্যে কাজ করে। টারমিনেটর সিনেমাতে আমরা দেখি যে রোবটরা মানুষ জাতির উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে, এবং তারা মানুষ জাতি কে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানুষের এই নিয়ন্ত্রণ হারাবার ভয়টি কাজ করে, যেটি প্রকৃতিতে তার আধিপত্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। বিজ্ঞানী জেফরি হিনটন (Geoffrey Hinton) সতর্ক করেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে নিজেই নিজেকে আপডেট করতে পারবে এবং পরবর্তীতে মানবজাতির জন্য হুমকি হবে।

(৪) নৈতিক উদ্বেগ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের মতন নৈতিক বুদ্ধি নেই। সে ভালো ও মন্দ যাচাই করতে পারেনা। তাই বিভিন্ন অনৈতিক কাজ সে করতে পারে, সেরকম ভয় আমাদের মধ্যে কাজ করে। যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কি রকম আউটপুট দিচ্ছে, তা কোন নৈতিক নিয়মকে ভঙ্গ করছে কিনা তা মনিটার করা হয় এবং তার জন্য নতুন নতুন অ্যালগরিদম এর লজিক উন্নয়ন হচ্ছে, তারপরেও এটির নৈতিকতা নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

(৫) অজানা জিনিসের ভয়: মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে মানুষ যা বোঝে না - সেটি নিয়ে আমাদের এক 'অজানা ভয়' কাজ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি জটিল এবং দ্রুত বিকশিত হওয়ার কারণে, অনেক সময়েই এটি কীভাবে কাজ করছে, কোন এলগরিদমগুলি কখন ব্যবহার হচ্ছে তা অনেক সময়ই সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞানী কিংবা প্রযুক্তিবিদরা যারা এটি তৈরি করেছে তাদের পক্ষেও সম্পূর্ণ জানা সম্ভব হয়না। সেই কারণে এটিকে নিয়ে আমাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় এবং সন্দেহ কাজ করে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে কোন উত্তরটি দিচ্ছে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রচুর গবেষণা করছেন এবং এটি আউটপুট দেবার পদ্ধতিগুলি সম্বন্ধে আরো ভালো ভাবে জানা সম্ভব হবে - তখন এই ভয় কেটে উঠতে পারে।

আমাদের মস্তিষ্কের এমিগডালা নামে একটি অংশ রয়েছে যা মূলত কোন অজানা জিনিসের প্রতি ভয় তৈরি করে। মস্তিষ্কের এই অংশটি প্রাচীন কাল থেকেই আমাদের শরীরে রয়েছে। প্রাচীনকালে গুহাতে অন্ধকার কোন জায়গার সাথে ভয় কে সংযুক্ত করতো। কেননা সেই অন্ধকার জায়গাতে বাঘ সহ মানুষখেকো কোনো প্রাণী লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা ছিল। সময়ের সাথে সাথে আমাদের সেই ভয়টি কেটে গেলেও এখনও এমিগডালা প্রাচীন কালের মতনই কাজ করে। মস্তিষ্কের এই এমিগডালা এর কারণেই যে কোনো “অজানা” কিছু দেখলেই আমরা ভয় পাই। এটি এমন ভাবে আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে যে এই ভয় কাটাতে আরো সময় লাগবে, কিংবা কখনও আমরা ভয় কাটাতে পারবো না।

টেকনোফোবিয়া-এর ভয় যে শুধু মাত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে হয়, তা নয়। যে কোন অজানা প্রযুক্তি এমনকি মাইক্রোওভেন কিংবা নতুন ঔষধ নিয়েও আমাদের ভয় হয়।

(চলবে)