মশিউরের খেরোখাতা

বিয়ে সমাচার: আমেরিকার দ্বিতীয় প্রজন্ম (২০০৭)

তারিখ: ২৩ অক্টোবর ২০০৭

মাহমুদ ভাইয়ের ড্রইংরুমে বসে আড্ডা মারছি। মাহমুদ ভাই এত বছর প্রবাসে থেকেও কিভাবে এইরকম আড্ডাবাজ ও রসিক থেকে গেছেন তা বুঝা মুশকিল। খুব সাধারণ পানি খাওয়ার ঘটনাকেও মাহমুদ ভাই এত সুন্দর করে গল্প করে বলেন যে মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয় এবং তখন মনে হয় পানি খাওয়ার মত এমন ঘটনা খুবই বিরল। যাই হোক, আর দশ দিনের মতই মাহমুদ ভাই জাম্পেস করে গল্প করছেন আর তাঁকে ঘিরে আমরা গল্প শুনছি। এমন সময়ই কথা উঠল দ্বিতীয় প্রজন্মের বিয়ে-সাদী নিয়ে। সেই আড্ডার কথাগুলিকে চুরি করেই এই লেখাটি লিখছি। লেখাটির কপিরাইট কে পাবেন তা নিয়ে গবেষকরা দ্বন্দ করতে পারেন তবে মূল কথাতে আসা যাক।

জীবিকার তাগিদে প্রথম প্রজন্মরা আমেরিকাতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। সময়ের স্রোতে তাঁদের সন্তানেরা (আমরা যাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম বলি) আমেরিকাতেই বড় হয়েছেন। কারো কারো বিয়ে দেবার সময় এসেছে। তবে এখানেও ছেলে মেয়ের বিয়ে দেয়া নিয়ে বাংলাদেশের আর দশটা বাবা-মা'র মত সমস্যার শেষ নেই।

প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে যে দ্বিতীয় প্রজন্মরা আমেরিকাতেই মানুষ হয়েছেন। কালে ভাদ্রে তাঁরা বাংলাদেশে বেড়াতে যান। তাঁরা নিজেদের ঘরে বাবা-মা'র সাথে বাংলায় কথা বললেও, নিজেরা ভাই-বোনেরা কথা বলেন ইংরেজীতে। বাংলার সংস্কৃতিকে তাঁরা নিয়েছেন তাঁদের বাবা-মা'র সংস্কৃতি, নিজের সংস্কৃতি নয়। এরা কেউ বাংলাদেশী নয়, তাঁরা আমেরিকান। জাতিগত স্বত্তায় আমরা তাঁদের বাঙালী বলতে পারি। আমেরিকার সংস্কৃতিই তাদের মূল সংস্কৃতি। তবে দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকেই যে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি হিসাবে নিচ্ছেননা তা নয়, তবে তার সংখ্যা খুবই নগন্য।

সুতরাং বিয়ের ক্ষেত্রেও এই চিন্তা ভাবনাগুলির প্রকাশ ঘটে বৈকি। সাধারণ আমেরিকানরা যেভাবে তাঁদের নিজনিজ জীবনসাথী বেছে নেয়, তাঁদের মত করেই আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মরা নিজের জীবনসাথী নিজেই বেছে নিতে চায়, আর সেটাই স্বাভাবিক। তবে বাবা-মা'র দুঃশ্চিন্তা এ নিয়ে কম নয়।

বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রজন্মের সাথে দ্বিতীয় প্রজন্মেরর মনের মিলটাই বেশী হয়, কেননা তাঁদের সংস্কৃতিক পটভূমি একই। তাই সাধারণত বিয়ের ক্ষেত্রে তেমনই পাত্র-পাত্রী দেখা হয়। আমেরিকাতে যে দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলেমেয়ের অভাব নেই তা নয়, কিন্তু সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই বিশাল দেশে। বাংলাদেশীরা ঠিক কত সংখ্যায় ও তাদের পরিচয় সমন্ধে আমাদের দূতাবাসও ঠিকমত বলতে পারবেননা। এর মধ্যে সবাই যে সমাজে ভাল অবস্থায় আছেন তা নয়। আসলে দূরে কোথাও বিয়ে দেবার অনেক "রিস্ক"। পাত্র/পাত্রী কেমন? তাঁর স্বভাব চরিত্র কেমন? - সেসব জানা মুশকিল। কিন্তু স্থানীয় পাত্র-পাত্রী হলে অন্তত কিছুটা জানার সুযোগ থাকে। কিন্তু এইখানে একটি সমস্যা হল, স্থানীয় ভাবে যারা এক সাথেই ছেলেবেলা থেকে বড় হয়েছেন তাঁরা একে অপরকে ভাই-বোনের মতই জেনেছেন ও দেখেছেন। এতদিন পরে তাদেরকে জীবন সাথী হিসাবে নিতে তাঁরা নারাজ। বড়জোর তাঁরা বন্ধু হতে পারে, কিন্তু জীবনসাথী নয়। আর আমেরিকাতে ছেলে মেয়ের বন্ধুটা খুবই স্বাভাবিক।

মজার ব্যাপার হল আমেরিকাতেও রয়েছে বাংলাদেশের মত ঘটক। কেন জানিনা কাকতলীয়ভাবে বেশীর ভাগ ঘটকই মহিলা। খালাম্মা বা নানীরা এই দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলেমেয়ের বিয়ের ব্যাপারে খুব তৎপর। তবে বেশীর ভাগই নেহাতই শৌখিন ঘটক। মজার ব্যাপার হল কায়দা করে এইখানেও ঘটা করে পাত্র ও পাত্রী দেখা হয়। অবশ্যই বাংলাদেশের মত কোন দোকানে পাত্রী দেখার "নাটক" এইখানে চলেনা।

অনেকসময় দ্বিতীয় প্রজন্মের সাথে বাংলাদেশ থেকে নবাগত ছেলে/মেয়ের বিয়ে হয়। আবার অনেকে বাংলাদেশে যেয়ে পাত্র/পাত্রী পছন্দ করে বিয়ে করে ফিরছেন। বেশ কিছু বিয়ে ভাল মত হলেও সমস্যা যে হচ্ছেনা তা নয়। সমস্যাটি খুবই স্পষ্ট। এইখানে যারা বড় হয়েছেন তাঁরা আমেরিকার মূল ধারার মানসিকতায় বড় হয়েছেন। বাহিরে তাদের বাঙালী দেখালেও ভিতরে তাঁরা আর দশটা আমেরিকানদের মতনই। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যিনি এসেছেন তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বড় হয়েছে। তার ফলে দুজনার মধ্য সংস্কৃতির ফাঁকটি থেকেই যায়।

একই গল্প শুনেছিলাম নিউইয়র্কের এক বাঙালীর কাছে। মেয়েটি এইখানে বড় হয়েছে, আধাভাঙ্গা বাংলা তিনি বলতে পারেন এবং মাঝে মধ্যে বাংলাদেশী খাবার খেতে পছন্দ করেন। আর পাত্র বাংলাদেশের এক ইঞ্চিনিয়ার। বাংলাদেশে পড়াশুনা করে এইখানে কাজ নিয়ে এসেছেন। প্রথমদিন মেয়ের মুখে ছোটখাট কিছু বাংলা সম্মোধন শুনে ছেলেটি ভাবলেন মেয়েটি তো ভালই বাংলা বলে। আর মেয়ের মায়ের হাতের রান্না খেয়ে ভাবলেন, মেয়েটি তো ভালই রান্না করে। বিদেশে নতুন এসেছেন, প্রথম দর্শনেই এই বাঙালী বিদেশীনিকে তাঁর পছন্দ হয়ে গেল। বাসর রাতেই ছেলেটি টের পেল মেয়ের বাংলার দৌড় কতটুকু! এর পরে মাস খানেক পরেও দেখা গেল তাদের কোন বনিবনা হচ্ছেনা। ছেলেটি ভেবেছিলেন মেয়েটি আর দশটা বাঙালী মেয়ের মতনই হবে, পরে তিনি আবিষ্কার করলেন তিনি নেহাতই বাঙালী দেখতে এক আমেরিকানকে বিয়ে করেছেন। মেয়ের বাবা-মা জামাইকে বুঝিয়ে বললেন, একটু এডজাস্ট করে নিতে সময় লাগবে। আর বাংলাটা চাপে পড়লে শিখে নিবে। এইদিকে জামাইয়ের একটাই কথা, মেয়ে কোন বাংলা পারে না। কার দোষ বলা মুশকিল কিন্তু বিয়েটি আরো মাসখানেক পরে টিকলনা।

তাই আমেরিকার দ্বিতীয় প্রজন্মের বিবাহ নিয়ে বাবা-মা'র চিন্তার শেষ নেই। এখন ঘটা করে পাত্র-পাত্রী নিয়ে আমাদের স্থানীয় বাংলাদেশীরা মহাব্যস্ত।

লেখক পরিচিতি: ড. মশিউর রহমান পেশায় বৈজ্ঞানিক এবং বর্তমানে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। কর্মজীবনের পাশাপাশি লেখালেখি ও ছবি তুলে সময় কাটান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ের পোর্টাল বিজ্ঞানী.org http://biggani.org এর সম্পাদক। লেখকের ইমেইল ঠিকানা mashiur@ymail.com


হান্টিংটন, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া