কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ দেখে এখনো টাস্কি লাগে
তারিখ: ২০ এপ্রিল ২০২৬
পরশুদিন ক্লড — অ্যান্থ্রপিকের সেই বিখ্যাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যে কিনা আমার চেয়ে অনেক বেশি পড়াশোনা করেছে এবং তবুও কোনো অহংকার নেই, কারণ অহংকার করার মতো অহং তার নেই — সে বাজারে একটি নতুন জিনিস নিয়ে এল। নাম তার "ক্লড ডিজাইন"।
এখন ডিজাইন তৈরির সফটওয়্যার জগতে নতুন কিছু নয়, যেমন মাছের বাজারে মাছের গন্ধ নতুন নয়। টেমপ্লেট ছিল, AI-চালিত ডিজাইন টুল ছিল, ফিগমা ছিল, অ্যাডোবি ছিল — সবই ছিল। কিন্তু ক্লডের নতুনত্ব হলো সেই জায়গায়, যেখানে অন্যরা হাত গুটিয়ে বলে, "ডিজাইন তো হলো, এবার বাকিটা তোমার কাজ, ভাই।"
ক্লড বলে, "না না, বাকিটাও আমিই করব।"
অর্থাৎ ডিজাইন করো, তারপর ক্লড কোড দিয়ে সেটি বানিয়েও দেবে। পুরো ব্যাপারটা যেন সেই দর্জির মতো, যে শুধু কাপড় মেপে দেয় না — সেলাইও করে, ইস্ত্রিও করে, বাড়ি পৌঁছেও দেয়। এবং বখশিশ চায় না।
এই সংবাদ পেয়ে সকালবেলা চায়ের কাপ হাতে বসে ভাবলাম — আমার যদি একটি অনলাইন দোকান থাকত! ডিজিটাল পণ্য বেচব, টাকা আসবে, আমি ঘুমাব। এই স্বপ্নটি অবশ্য অনেকদিনের। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে যে বিস্তর কোড লেখার খাদ ছিল, সেটি পার হওয়ার উপায় ছিল না।
এবার সেই খাদের উপর ক্লড একটি সেতু বানিয়ে দিল।
বললাম, "দোকান বানাও।" সে বানাতে বসল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগল। এখন আপনি যদি মনে করেন এক ঘণ্টা অনেক সময়, তাহলে বলি — আমি একবার ঢাকায় একটি সরকারি দপ্তরে একটি ফর্ম জমা দিতে গিয়েছিলাম। ফর্মটি জমা নিতে তারা তিন সপ্তাহ নিয়েছিল এবং তখনও ফর্মটি "প্রক্রিয়াধীন" ছিল। সেই তুলনায় এক ঘণ্টা কার্যত চোখের পলক।
এই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সে লাইব্রেরি ইন্সটল করেছে, বাগ বের করেছে, নিজেই সমাধান করেছে, আবার নতুন সমস্যায় পড়েছে, আবার সমাধান করেছে। পুরো ব্যাপারটা দেখতে ছিলাম আর মনে হচ্ছিল — এ যেন এক নিপুণ রাঁধুনি যে রান্নাঘরে ঢুকেছে, বাজারও করেছে, রান্নাও করেছে, থালাও মেজেছে, এবং আমাকে শুধু বলেছে, "বসুন, খাবার রেডি।"
এরপর মাথায় এলো আরেক দুষ্টুবুদ্ধি।
AWS-এ ডিপ্লয় করব। তাও আবার "সার্ভারলেস" পদ্ধতিতে।
সার্ভারলেস জিনিসটা একটু বুঝিয়ে বলি। আগেকার দিনে সার্ভার মানে ছিল একটি বিশাল যন্ত্র, যেটি সারাদিন চলত, বিদ্যুৎ খেত, ঠান্ডা করতে হত, পাহারা দিতে হত — অনেকটা সেই বড় বাড়ির বুড়ো দারোয়ানের মতো, যে রাত-দিন দরজায় বসে থাকে কিন্তু কাজ আসে সপ্তাহে দু'বার। সার্ভারলেস মানে সেই দারোয়ানকে সরিয়ে ইন্টারকম বসানো — দরকার হলে বাজবে, না হলে চুপ।
খরচ কম, ঝামেলা কম, নিরাপত্তা বেশি।
ক্লডকে বললাম। সে পাঁচটি স্তম্ভের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো দাঁড় করিয়ে দিল — ডেটাবেজ, অথেন্টিকেশন, এপিআই, ফ্রন্টেন্ড, নিরাপত্তা। এবং তারপর একটি নতুন AWS অ্যাকাউন্টে সেটি ডিপ্লয় করতে কয়েক মিনিট মাত্র লাগল।
কয়েক মিনিট।
আমি আমার জীবনে এর চেয়ে দ্রুত কেবল একটিই জিনিস হতে দেখেছি — সিঙ্গাপুরে চায়ের দোকানে পয়সা শেষ হওয়া।
এই অভিজ্ঞতার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগল — তাহলে কি সফটওয়্যার ডেভেলপাররা এবার বেকার হবেন?
প্রশ্নটি নতুন নয়। যন্ত্র আসার পর থেকে মানুষ এই প্রশ্নটি করে আসছে। তাঁত আসলে তাঁতি গেল কিনা, গাড়ি আসলে ঘোড়াওয়ালা গেল কিনা, ক্যালকুলেটর আসলে গণিতবিদ গেলেন কিনা।
আমার বিবেচনায় উত্তরটি হলো — যারা শুধু হাত ছিলেন, তারা কিছুটা কষ্টে পড়বেন। আর যারা মাথা ছিলেন, তারা এখন দশটা হাত পেলেন।
অর্থাৎ যে ডেভেলপার জানেন সিস্টেম আর্কিটেকচার কী, ডেটাবেজ কীভাবে কাজ করে, সিকিউরিটির কোথায় ফাঁক থাকে — তিনি এখন ক্লডকে সঙ্গে নিয়ে আগের দশজনের কাজ একা করতে পারবেন। উৎপাদনশীলতা বাড়বে, যেমন বাষ্পইঞ্জিন আসার পর বেড়েছিল।
কিন্তু যে শুধু অন্যের দেখানো পথে কোড টাইপ করতেন, তার জন্য পরিস্থিতি কঠিন হবে — যেমন হয়েছিল সেই লিপিকারদের, যারা শুধু নকল করতেন, কিন্তু লিখতে জানতেন না।
প্রযুক্তি জগতে বহু বছর কাটিয়েছি। জাপানে পড়েছি, আমেরিকা ও সিঙ্গাপুরে কাজ করছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি, বাংলায় বিজ্ঞান লিখছি — এই কাজগুলি একসাথে করতে গিয়ে মাথাটা অনেকটা সেই মিক্সারের মতো হয়ে গেছে, যাতে একসাথে আম, কাঁঠাল আর হর্লিক্স দেওয়া আছে।
তবুও মাঝেমাঝে এমন কিছু দেখি যে চমকে উঠি। এবার চমকালাম।
কারণ ডিজাইন করো, কোড হোক, ডিপ্লয় হোক — এই পুরো চক্রটা এত দ্রুত এত সহজে হয়ে গেল যে মনে হলো, হয়তো আমার অলসতাটা আর দোষ নয়। বরং এটি একটি দূরদর্শিতা ছিল। আমি জানতাম একদিন যন্ত্র এসে কাজটা করে দেবে।
অপেক্ষাটাই ছিল কৌশল।
অন্তত এটুকু ভেবে স্বস্তি পাচ্ছি।