মশিউরের খেরোখাতা

ডিজিটাল বাংলাদেশে ও শিক্ষা

ড. মশিউর রহমান*(সহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়)*

বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ পড়ে গিয়েছে। যদিও ব্যাপারটাকে রাজনীতিবিদরা তাদের একটি কৌশল হিসাবেই নিচ্ছে কিন্তু তারপরও একজন তথ্য প্রযুক্তিবিদ হিসাবে বরং খুশিই হয়েছি। পূর্বে তথ্য প্রযুক্তির এই সম্ভাবনার কথা রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারকদের বোঝাতে আমাদের বেশ বেগই পেতে হয়েছে। আজ এই ভেবে খুশি হচ্ছি যে সবাই একটু হলেও সচেতন হয়েছে। পূর্বে এর জন্য আমরা প্রযুক্তিবিদরা অনেক সেমিনার, ওয়ার্কশপের আয়োজন করেছি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারকরা এই সমস্ত অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র অতিথির চেয়ারটিকেই অলংকৃত করেছেন, তাদের মধ্যে এই নিয়ে সচেতনতা অনেক কমই আমরা দেখেছি। কিন্তু এইবার একটু ভিন্ন মাত্রা দেখলাম। বিশেষ করে খুব ভাল লাগল যেখানে স্পিকার স্বয়ং সংসদ সদস্যদের কম্পিউটার ও ইমেইল ব্যবহারের দিকে জোর দিচ্ছেন।

ই-লার্নিং: ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল শিক্ষা। এই কথা বলার কোন অবকাশ রাখে না যে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম অনেকাংশে উন্নত করতে পারি। শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারকে আমরা ই-লার্নিং (e-learning) বলি। ই-লার্নিং ব্যবহারের সুবিধাসমূহ:

  • কম খরচ: ডিজিটাল কনটেন্ট হবার কারণে শিক্ষা উপকরণ বারবার ব্যবহার করা যায়।

  • কম সময়: একটি গবেষণায় দেখা গেছে সাধারণ শিক্ষার পদ্ধতির থেকে ই-লার্নিং এ শিক্ষার্থীদের জন্য ৪০% থেকে ৬০% কম সময় প্রয়োজন। (Web-based Training Cookbook, 1997, p. 108) শিক্ষার্থী তার সুবিধামত সময় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।

ই-লার্নিং এ যেহেতু অনেক সময় ও মেধা কাজে লাগিয়ে শিক্ষার উপকরণগুলি তৈরি হয় তাই গতানুগতিক শিক্ষার থেকে ই-লার্নিং এ শিক্ষার মান বেশি।

দূরদৃশিক্ষণ: প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে শহরের কিংবা অন্য কোন দেশের শিক্ষকের ক্লাশ নেয়া। হাতিয়া দ্বীপের কোন শিক্ষার্থীর পক্ষেও সম্ভব হবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন প্রোফেসরের ক্লাশ গ্রহণ করা।

অনেকে এটিকে ডিজিটাল শিক্ষা, ইলেকট্রনিক্স শিক্ষা ইত্যাদি নামে অভিহিত করেন। নাম যাই হোক না কেন তথ্য প্রযুক্তি মূলত দুটি দুভাবে শিক্ষা কার্যক্রমকে উন্নত করতে পারে। প্রথমটি হল ব্যবস্থাপনা ও দ্বিতীয়টি হল শিক্ষা গ্রহণ।

ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থাপনা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বর্তমান ব্যবস্থাপনার কাজটি এনালগ বা কাগজ-কলমে করে। একটি প্রতিষ্ঠানে কত জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে, কোন ছাত্র কি রকম রেজাল্ট করছে, কোন কোন বিষয়গুলি পড়ানো হচ্ছে, এই রকম সব কিছুই আমরা কাগজে কলমে করছি। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ব্যবস্থাপনার কাজটি আরো উন্নত করতে পারি। কোন ছাত্র কি রকম রেজাল্ট করছে তা এই ধরনের সিস্টেমের মাধ্যমে খুব সহজেই শিক্ষক ও অভিভাবক জানতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে আমেরিকার Northshore Junior High স্কুলের উদাহরণ দিই। অনলাইনের মাধ্যমে অভিভাবকরা জানতে পারবে তার ছাত্র/ছাত্রীরা স্কুলে নিয়মিত যাচ্ছে কিনা। এছাড়া জাপানে অনেক কিন্ডারগার্ডেন স্কুলগুলিতে অভিভাবকদের জন্য অনলাইনে শ্রেণীকক্ষের ভিডিও দেখার ব্যবস্থা রেখেছে। rediker.com, mygradebook.com, onlinegrades.org অনলাইনে শিক্ষার্থিদের ব্যবস্থাপনার কাজটি সহজে করে দেবার জন্য কিছু সলিউশন দিচ্ছে। এছাড়া Moodle নামের অপেনসোর্সের একটি সলিউশন দিয়ে স্কুল ব্যবস্থাপনার কাজটি খুব সহজে করা যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার সলিউশনগুলিকে School Management System বলে।

আমাদের দেশে সরকারী স্কুল-কলেজগুলি এখনও কোন ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ব্যবহার না করলেও ইংরেজী মিডিয়ামের অনেক স্কুল-কলেজগুলি তাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাটি করছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় সহ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত ডিজিটাল পদ্ধতিই ব্যবহার হচ্ছে। স্কুল-কলেজের থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এর ব্যবস্থাপনা অনেক জটিল বলে ডিজিটাল পদ্ধতি এই ক্ষেত্রে অনেক উপকার দেয়। আমাদের নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র/ছাত্রীরা অনলাইনেই লগইন করে ঠিক করে নেয় তারা এই সেমিস্টারে কোন কোর্সগুলি নিবে।

ডিজিটাল মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান: উপরে যেগুলি উল্লেখ করলাম তা হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার কাজে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার। এছাড়া শিক্ষা প্রদান করার পদ্ধতি এর ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি ভূমিকা পালন করতে পারে, যেটি হল মূলত ই-লার্নিং। অনেকেই ই-লার্নিং বলতেই দূরদৃশিক্ষন কিংবা অনলাইন কোর্স এর কথা বোঝেন। মূলত ই-লার্নিং শুধুমাত্র দূরদৃশিক্ষন নয়, শিক্ষা প্রদান করার ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স বা ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারকেই ই-লার্ণিং বলে। ই-লার্নিংকে flexible learning environment বলা হয়ে থাকে, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ঠিক করে নিতে পারে সে কোন মাধ্যমে তার শিক্ষা গ্রহণ করবে। মনে করা যাক, একজন ছাত্র কোন জরুরি কোন কারণে একটি ক্লাশে উপস্থিত থাকতে পারলনা। তখন সে সেই ক্লাশটির রেকর্ড করা ভিডিও এর মাধ্যমে ক্লাশটি গ্রহণ করতে পারে। আমেরিকার মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কিছু কোর্সে এই সুযোগটি দেয়া হয়।

বাংলাদেশে কিভাবে শুরু হতে পারে? এখন আসা যাক বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার কিভাবে শুরু করা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে আমরা যেহেতু বিশ্বের অন্যান্য দেশের থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ে রয়েছি এবং একদম কোন কিছুই করা নেই তাই আমাদের সাবধানে পদক্ষেপ ফেলতে হবে। এই ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের সাফল্য ও ব্যার্থতা আমাদের অনেক সাহায্য করবে। আমার মনে হয় বাংলাদেশে প্রথমে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রটিতে তথ্য প্রযুক্তি ধীরে ধীরে ব্যবহার করা শুরু করতে পারি। এরপরে যখন আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করার সুযোগ সুবিধা গড়ে উঠবে তখন পরের স্তর, ই-লার্নিং ব্যবহার করতে পারি। আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই স্কুল ব্যবস্থাপনার সলিউশন তৈরী করছে তাই এটি প্রয়োগ করা আমাদের জন্য খুব একটি কঠিন হবে না। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হবে ই-লার্নিং প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে। শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে শিক্ষার উপকরন (Content) গুলি ডিজিটাল আকারে রাখার প্রয়োজন। আমরা যেহেতু সেই অবস্থান থেকে অনেক দূরে দূরে আছি তাই আমাদের content ডিজিটালে রূপান্তর করা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি "ডিজিটাল বাংলাদেশ" বিষয়ে একটি বিশাল সেমিনারের আয়োজন করেছিল। তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক অন্যান্য সেমিনারের মত এটিতে শুধু তথ্য প্রযুক্তিবিদগণই ছিলেন না, সেখানে রাজনীতিবিদ, আমলা থেকে শুরু করে সরকারের অনেক উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। সেই সেমিনারের অন্যতম বিষয় ছিল ই-লার্নিং। সরকার যদি এই ব্যাপারে proactive ভূমিকা পালন করে তবে আমরা অনেক এগিয়ে যেতে পারব।

ডিজিটাল মাধ্যম: ডিজিটাল মাধ্যমগুলি শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে অনেক ভূমিকা রাখতে পারে। সমস্যা হল আমরা অনেক সময়ই এই ক্ষেত্রে কম্পিউটার ভিত্তিক পড়াশুনার কথা ভাবি। কম্পিউটার একটি ডিজিটাল মাধ্যম, কিন্তু কম্পিউটার ছাড়াও আরো অনেক মাধ্যম ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণ হিসাবে মাল্টিমিডিয়া, সিডি/ডিভিডি কিংবা মোবাইল এর কথা বলা যেতে পারে। এইক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা থেকে বেশিই বলে মনে করা হয় (পরিসংখ্যানে নেই)। সেহেতু ডিজিটাল মাধ্যম হিসাবে মোবাইল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশে রেডিও/টিভির জরিপ নেবার ক্ষেত্রে মোবাইলের ক্ষুদে বার্তা (SMS) প্রচুর ব্যবহার হচ্ছে। যদিও শিক্ষার উপকরন মাল্টিমিডিয়া জাতীয় content গুলির জন্য ভালো মোবাইল সেটের প্রয়োজন হয়, যা হয়তো সব শিক্ষার্থীদের হাতে পৌছাতে পারবে না। বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে কম্পিউটার স্থাপন ও ইন্টারনেট সংযোগ দেবার জন্য বিভিন্ন প্রোজেক্ট করছে এবং করছে। ধারণা করা হয় এই পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজারের মত কম্পিউটার বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুল কলেজগুলিতে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। যদিও এই কম্পউটারগুলি মূল কম্পিউটারের ব্যবহারের থেকে অফিসিয়াল বিভিন্ন চিঠিপত্রের টাইপের কাজে ব্যবহার করা হয়, তবুও ভবিষ্যতে এই কম্পিউটারগুলি স্কুল ব্যবস্থাপনা ও ই-লার্নিং এ ভূমিকা রাখতে পারবে।