মশিউরের খেরোখাতা

বাংলা ভাষা, ইউনিকোড ও বিজ্ঞানী.অর্গ

বিজ্ঞানী.অর্গ এর যাত্রাটি শুরু হবার সাথে বাংলা ভাষায় ইউনিকোড প্রয়োগের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু প্রায় এক যুগ ধরে আমরা বিজ্ঞানী.অর্গে ইউনিকোডকে প্রয়োগ করে আসছি, এর পিছনের দর্শনটি আজকে একটু পাঠকদের কাছে তুলে ধরবো।

৯০ এর দশকে যখন সারা বিশ্বে ওয়েবসাইট যখন খুব জনপ্রিয় হতে লাগলো। সবাই তাদের প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট তৈরী করে তথ্য প্রদান করা শুরু করল। বিশেষ করে বিভিন্ন পণ্যের বিস্তারিত খুটিনাটি ওয়েবসাইটে দেবার মাধ্যমে কনজিউমার বা ভোক্তাদের কাছে খুব সহজেই তথ্য দেয়াটা বেশ সহজ ছিল। তাই প্রথম দিকে ওয়েবসাইটগুলো মূলত তথ্যভিত্তিক ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন ম্যাগাজিনগুলো তাদের প্রকাশনা অনলাইনে শুরু করল। সেই সময়ে দুটি জনপ্রিয় পত্রিকার তথ্য নিম্নে দেয়া হল। ইত্তেফাক তার অনলাইন ভার্সন নিয়ে এর ১৯৯৯ এর শেষের দিকে। (তথ্যসূত্র http://whois.domaintools.com/ittefaq.com ) প্রথম আলো তার অনলাইন সংস্করণ নিয়ে এল ২০০১ এর ফেব্রুয়ারীতে (তথ্যসূত্র http://whois.domaintools.com/prothom-alo.com ) এইভাবে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলি তার অনলাইন সংস্করণ নিয়ে এল।

কিন্তু বাংলাভাষা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তারা কেউই কোন স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড মেনে চলেনি। তখনকার সময়ে প্রচলিত বাংলা ফন্টগুলি দিয়ে তারা বাংলা ভাষাকে প্রদর্শন করতো। এই নন-স্ট্যান্ডার্ড বা কোন মানদন্ড না থাকার কারণে সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে তাদের লেখা খোঁজার কোন উপায় ছিলনা। কম্পিউটারে বাংলা প্রয়োগের জন্য যে সমস্ত বাঙালী প্রযুক্তিবিদরা সেই সময়ে কাজ করতেন, তাদেরকে আমি দুটি শ্রেণীতে ভাগ করতাম (এটা সম্পূর্ণ আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত)।

  • ১. প্রথম গ্রুপ হল যারা মানদন্ডকে গুরুত্ব দিতেন।

  • ২. দ্বিতীয় গ্রুপ হল যারা মানদন্ডকে গুরুত্ব দিতেন না।

প্রথম গ্রুপের প্রযুক্তিবিদরা দূরদর্শী ছিলেন এবং দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা ভাবনা করতেন। আর দ্বিতীয় গ্রুপের প্রযুক্তিবিদরা মোটামুটি সেই সময়ের সমস্যাটি সমাধান হলেই হল- এমন চিন্তা ভাবনার অধিকারি ছিল। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ওয়েবসাইট সেই সময়ে যাত্রা শুরু করলেও যেহেতু ম্যাগাজিন ও পত্রিকাগুলোতে বেশী টেক্সট বা কনটেন্ট ছিল, তাই তাদের ওয়েবসাইটই কমিউনিটির কাছে বেশী গুরুত্ব ছিল। সমস্যা হল এই পত্রিকার সাইটগুলি যারা চালাতেন, আমরা যাদের ওয়েবমাস্টার বলি, তারা মোটামুটি সবাই দ্বিতীয় গ্রুপের দলে ছিল। তারা ছবি, পিডিএফ, ও বাংলাফন্ট এমবেড করে মোটামুটি ভাবে বাংলা সাইট তৈরী করার প্রতি ঝোঁক ছিল বেশী।

একটি মানদন্ড যে মেনে চলা যে উচিত – সেটি নিয়ে তাদের কোন চিন্তা ছিলনা। আরেকটি কারণ হল সেই সময়ে পত্রিকাগুলি প্রিন্ট করার জন্য কম্পিউটারে নন-স্ট্যান্ডার্ড বা প্রোপাইটরি বাংলা টাইপিং ও ফন্ট ব্যবহৃত হত। সুতরাং সেই টেক্সট তারা যতটা কম ঝামেলা করে ওয়েবসাইটে দেখানো যায় তার প্রতি তারা আগ্রহী ছিল। সেই সময়ে ওয়েবসাইট খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলনা। কেননা সেটা থেকে আলাদা করে বিজ্ঞাপন বা অর্থ উপার্জন করা যেত না। তাই এই বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। প্রথম গ্রুপের প্রযুক্তিবিদরা মানদন্ড মেনে চলার প্রতি গুরুত্ব দিলেও, কোন মানদণ্ডটি তারা মেনে চলবে তা নিয়ে দ্বিধাই ছিল। বেশ কিছু গ্রুপ ইউনিক্সে সিস্টেমে কিভাবে বাংলা প্রয়োগ করা যায় তা নিয়ে কাজ করছিল। ইউনিক্স্ সিস্টেম ওপেনসিস্টেম ও মানদন্ড মেনে চলে বলে সেদিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছিলাম।

ইউনিকোড:

ঠিক সেই সময় ইউনিকোড ধীরে ধীরে বিদেশী ভাষাগুলি কম্পিউটারে প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হচ্ছিল। ( কোন ভাষা ইউনিকোড প্রথম গ্রহণ করল তার কোন তথ্য আমার কাছে নেই )। ইউনিকোড এর লোকজন বাংলাদেশ সরকারের সাথে যোগাযোগ করলেও সেই সময় সরকারের লোকজনও ঠিক এটির গুরুত্ব বুঝতে পারেনি। সেই সময় যে সমস্ত প্রযুক্তিবিদরা সরকারের সাথে কাজ করতেন, ও সরকারকে পরামর্শ দিতেন, তারা ভালো কোন নির্দেশনা দিতে পারেননি। আর প্রথম গ্রুপের প্রযুক্তিবিদরা সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না থাকার কারনে বাংলা ভাষায় ইউনিকোড প্রয়োগ বেশ অনেকখানি পিছিয়ে গেল। সেই সময় ভারতের একটি ভাষা বাংলা হিসাবেই ইউনিকোডে এটি সংযুক্ত হয়। (বিস্তারিত কেউ জানলে কমেন্ট করুন)। আমি পিএইচডি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আর এ নিয়ে কাজ করতে পারিনি।

২০০৫ এর সেপ্টেম্বরে আমার পিএইচডি সমাপ্ত হবার পরে, আবার বাংলা নিয়ে কাজ শুরু করলাম। সেই সময়ে বাংলা-কম্পিউটিং এ ইউনিকোড-কেই ভালো সমাধান বলে আমার মনে হল। আমি ব্যক্তিগত ভাবে প্রথম গ্রুপের প্রযুক্তিবিদের সাথে যোগাযোগ করলাম। পরিশেষে আমরা প্রথম গ্রুপের প্রযুক্তিবিদরা চিন্তা করলাম ইউনিকোডে বাংলা প্রদর্শনের জন্য কিছু সাইট অন্তত তৈরী করে ফলাফল দেখাতে হবে নতুবা কেউ এটি গ্রহন করবেনা। তারই একটি উদাহরণ হিসাবে আমি বিজ্ঞানী.অর্গ সাইটটি শুরু করলাম। পাশে পেলাম কানাডার বিজ্ঞানী ড. শফিউল ভাইকে, এবং সমমনা অনেক প্রযুক্তিবিদি ও ভলেন্টিয়ারদের।

এই ক্ষেত্রে সবথেকে অগ্রগামী ছিল একুশে.অর্গ। প্রথমদিকে বিজ্ঞানী.অর্গ একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক নিউজ পোর্টাল হিসাবেই যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অনেক টেক-নিউজ এর সাইট শুরু হবার কারণে আমরা সেই লক্ষ্যটি একটি পরিবর্তন করে বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের সাক্ষাত্কারে প্রকাশে মনোনিবেশ করি। ইমেইল, টেলিফোন ও ভিডিও সাক্ষাত্কার নিই এবং পরবর্তীতে তারা যে সমস্ত বিজ্ঞানীর সাথে পরিচয় করে দেন, তাদের সাক্ষাতকার নিই। এই ১৩ বছরে আমরা ৬৬ জন বিজ্ঞানীর সাক্ষাতাকার নিয়েছি এবং সেই যাত্রা এখনও অব্যাহত রেখেছি। এছাড়া বিজ্ঞান ও গবেষণা সংক্রান্ত প্রবন্ধও আমরা প্রকাশ করি। নিজস্ব মৌলিক একটি ধারা আমরা বজায় রাখতে আমরা সচেষ্ট।

ইউনিকোড গ্রহণ করতে হলে ইউনিকোডে বাংলা ইনপুট বা টাইপ করার সিস্টেম খুব জরুরী। সেই প্রয়োজনটি পুরোপুরি মিটিয়ে দিল অমিক্রন ল্যাব। ২০০২ থেকেই তারা বাংলা ইনপুট সিস্টেম তৈরী করে বিনামূল্যে সরবরাহ করছে। তাদের বাংলা ইনপুট ইউনিজয় বাংলা ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এতদিন পর্যন্ত যারা নন-স্ট্যান্ডার্ড বাংলা টাইপিং ও ফন্ট তৈরী করে ব্যবসা করে আসছিলেন তাদের শত্রু হয়ে দাড়ায়। সময়ের প্রয়োজনে যা মানদন্ড তাদের গ্রহণ করতে হবে, সেই কথাটি তারা মানতে চায়নি। অনেকটা নোকিয়ার মতনই তাদের দশা হয়। সময়ের প্রয়োজন না মেটানোর কারণে তারা হারিয়ে যায়।

  • কনটেস্ট ও ওয়েবসাইট তৈরীর ক্ষেত্রে বিজ্ঞানী.অর্গ এর পাশাপাশি অপেন সোর্স নেটওয়ার্ক, প্রজন্ম ফোরাম ছাড়াও আরো অনেকেই ইউনিকোড ভিত্তিক বিভিন্ন সাইট নিয়ে আসে।

  • Bangladesh Open Source Network: BdOSN যাত্রা শুরু করে ২৪ অক্টোবর ২০০৫ ekushey.org যাত্রা শুরু করে সেপ্টেম্বর ২০০১ এ (তথ্যসূত্র: http://whois.domaintools.com/ekushey.org )

  • বিজ্ঞানী.অর্গ যাত্রা শুরু করে মার্চ ২০০৬ (তথ্যসূত্র: http://whois.domaintools.com/biggani.com )

  • বাংলা ব্লগিং এর জনপ্রিয় সাইট সামহোয়্যার ইন ব্লগ ২০০৬ এর কোন এক সময়ে ঘোষনা করে যে তাদের সাইট সম্পূর্ণ ইউনিকোড ভিত্তিক বাংলায় চালাবে। (লেখকের স্মৃতি থেকে, সূত্র খুঁজে দেখতে হবে)

  • বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সাইট কালি ও কলম সম্পূর্ণ ইউনিকোডে চালু হয় ২০০৪ এর ফেব্রুয়ারীতে (তথ্যসূত্র: http://whois.domaintools.com/kaliokalam.com )

  • বাংলাদেশ সরকারের সাইটগুলির মধ্যে ইউনিকোডে প্রথম বের করে BTTB নভেম্বর ২০০৬ এ (তথ্যসূত্র https://www.ekushey.org/index.php/blog/show/First\_Bangladeshi\_Government\_site\_in\_Unicode.html ) - ইউনিকোডে বাংলা সাইট কিভাবে তৈরী করতে হবে তার উপর একটি টিউটোরিয়াল লিখি ডিসেম্বর ২০০৬ এ। লিংক: http://biggani.org/?p=17 । এই লেখাটি বিজ্ঞানী.অর্গ সাইটের সবথেকে জনপ্রিয় প্রবন্ধ হিসাবে আজো পাঠকরা পড়ে।

২০০৬ এর পরে মোটামুটি সমস্ত বাংলা পত্রিকা ইউনিকোডে প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। নন-স্ট্যান্ডার্ড জিনিস যে বেশী দূর পথ চলতে পারেনা, এবং একটি গ্রহণযোগ্য মানদন্ড ব্যবহার করার মাধ্যমেই যে সবার উপকার হয় - সেই কথাটিই আবারও প্রমাণিত হয় ইউনিকোডে বাংলাভাষা কম্পিউটারে প্রচলনের ক্ষেত্রে।

এখন ফেসবুক, ইমেইল, সহ সমস্ত সোসাল নেটওয়ার্ক সাইটে বাংলা ইউনিকোডই ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি সময়ে বাংলিশ (ইংরেজী টাইপে বাংলা লেখা) নিয়ে আমাদের যে ভয়টি ছিল তা মোটামুটি আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। মনের কথা মাতৃভাষা বাংলা-তেই প্রকাশ করতে চাই এবং এই ক্ষেত্রে বাঙালীরা কোন আপোস করেনি। আমি বাংলাতে যা লিখবো তা কম্পিউটার, মোবাইল সহ সকল ডিভাইসে প্রদর্শন করতে চাই, কোন ধরনের কারিগরি সমস্যা ছাড়াই – এই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য।

এই লেখাটি আমার ব্যাক্তিগত কথা ও বিজ্ঞানী.অর্গ এর দিকটাই শুধু তুলে ধরেছি। কিন্তু পাশাপাশি কাজ করেছে অনেক বাঙালী প্রযুক্তিবিদগণ। এই সফলতার জন্য বাংলা ইউনিকোড নিয়ে কাজ করা সমস্ত প্রযুক্তিবিদদের স্যালুট দিই। এরা নীরবে, নিভৃতে কাজ করে যায় সবার অগোচরে - ব্যাকস্টেজে। ৫২ এর আন্দোলনে আমরা কেউই জন্মগ্রহণ করেনি কিংবা দেখিনি, কিন্তু সেই চেতনা আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি এবং অন্তরে আমরা এই প্রযুক্তিবিদরা সবাই “ ভাষা সৈনিক ”।

_লেখাটি সম্পূর্ণ আমার স্মৃতির উপর ভিত্তি করে লেখা। কোন তথ্যগত ভুল থাকলে কিংবা আরো কিছু সংযুক্ত করতে চাইলে কমেন্টে লিখুন।_

তারিখ: ১৬ আগষ্ট ২০১৯, সিঙ্গাপুর