০৫: একটি প্রশ্নই পারে আপনার জীবনকে বদলে দিতে (৪ অক্টোবর ২০১৯)
তারিখ: ৪ অক্টোবর ২০১৯
পেশাগত জীবনে আমাদের অনেক সময়ই প্রশ্ন বা মতামত দেবার প্রয়োজন হয়। অনেক সময়ই মিটিং এর শেষে কমেন্ট চাওয়ার মতন ব্যাপার থাকে। এই সমস্ত প্রশ্ন বা মতামত দেবার ক্ষেত্রে একটু সুযোগ হল নিজে যে হোমাওয়ার্ক করছি, তা প্রকাশ করা এবং নিজের ব্যান্ডিংটি বাড়ান। এমন একটি ভালো সুযোগ হল লিংকডইন এ মতামত দেবার ক্ষেত্রে।
একটি ভালো কমেন্টই কিন্তু আপনার জীবনকে বদলে দিতে পারে। এমন দুটি ঘটনা আমার জীবনের গল্প থেকে বলি।
প্রথম ঘটনাটি হল, অনার্সের প্রথম ক্লাসে। তয়োহাসি ইউনিভার্সিটি অফ টেকনলজি তে আমার প্রথম ক্লাস, শুরু হল সেমিকন্ডাকটর নিয়ে। সেই সপ্হাহেই আমি নেচার পত্রিকাতে সেমিকন্ডাকটর এর ৫০ বছর পূর্তি এর প্রবন্ধটি পড়ছিলাম। ক্লাসের শুরুতেই সেই শিক্ষকের কাছে যেয়ে বললাম যে সারা বিশ্ব এই দিনটি পালন করছে। উনি আমার মন্তব্যটি খুব পছন্দ করেছিলেন। পরবর্তিতে তার ল্যাবেই আমি অনার্স ও মাস্টার্স করি। পরবর্তিতে উনি বলেছিলেন যে, আসরে এই মন্তব্যটি এর মাধ্যমে উনি বুঝেছিলেন যে গবেষনার পত্রিকাগুলি আমি পড়ি, যা বৈজ্ঞানিক হবার জন্য খুব জরুরী।
দ্বিতীয় গল্পটি সিঙ্গাপুরে।
সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল বিভাগে তখন আমি বৈজ্ঞানিক হিসাবে কর্মরত। একদিন ডিপার্টমেন্টের করিডোরে লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একটু পরে লিফট আসলে আমরা সবাই লিফটে ঢুকলাম। একটু পরে পরের তলাতে কিছু লোক বের হল, এরপরে আরো একটি তলাতে যেয়ে আরো কিছু লোক বের হয়ে গেল। লিফটটা আরো উপরের দিকে উঠতে লাগলো, তখন দেখি আমি এবং আরো দুজন লোক রয়েছে। আরো একটু পরে অপর একজন বেরিয়ে গেল। এরপরে লিফটে থাকলো আমি আর আরেকজন ভদ্রলোক।
আমি হটাৎ নিচের দিকে তাকিয়েই বললাম, “কি মজা দেখুন, আমরা মানুষেরাও ফিজিক্সের নিয়ম মেনে চলি”।
ভদ্রলোক বললেন, “মানে?”
আমি ভদ্রলোককে চিনি না।আমি তখন আমার পর্যবেক্ষন এবং ফিজিক্সের নিয়মটি বললাম।
লিফট থেকে বেরিয়ে যাবার সময় উনি আগামি সপ্তাহে দেখা করতে বললেন। উনি যে রুমে ঢুকলেন তা দেখে আমার আক্কেল গুরুম হয়ে গেল। সেই লিফটে আমি ডিনের সাথে কথা বলছিলাম।
পরের সপ্তাহে উনার সাথে দেখা করতে যেয়ে আরো অবাক হলাম যে, উনি আমাকে তার ল্যাবে যোগ দেবার নিমন্ত্রণ দিলেন। পরে জানালেন আমার সেই কমেন্ট টা তাকে খুব প্রভাবিত করেছিল। যদিও শেষে তার ল্যাবে আর যোগ দেয়া হয়নি, কেননা ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দেবার জন্য বদ্ধপরিপক ছিলাম।
এইভাবে সুন্দর একটি কমেন্ট কিন্তু অনেক কাজে লাগতে পারে। তেমনিভাবে ভালো প্রশ্ন করাটিও একটি আর্ট। তবে খেয়াল রাখতে হবে আমি জানি, এমন কিছু জাহির না করাই ভালো। কিছু ভ্যালু এড করতে চাই, এই মানসিকতা টি প্রয়োজন। অনেক সময়ই দেখবেন আনেকেই ভালো প্রশ্ন করতে পারছে। তাদের সেই কৌশলগুলি একটু পর্যবেক্ষন করুন। এছাড়া যে বিষযটির উপর মন্তব্য দিতে হবে সেই বিষয়টি ভালো মতন বোঝা খুব দরকার। বোকার মতন প্রশ্ন করলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই যদি না জানেন তবে প্রশ্ন না করাই ভালোই।
ধান্দাবাজি এর নেটওয়ার্ক:
অনেকেই খুব লোভ এর বশবর্তি হয়ে, চাকুরি পাবার আশায় কিংবা ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করার আশায় নেটওয়ার্ক করেন। যদিও মানুষের সাথে পরিচয় এবং সেখান থেকে সেই পরিচয়কে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার মাধ্যমে নেওয়ার্ক এর প্রকৃত অর্থ নিহিত। এই পরিচয়ের মাধ্যমে যে তৎক্ষনাত আমাদের চাকুরি হবে এমনটি আশা করা ভুল। অনেক ক্ষেত্রে তেমন হতেও পারে। তবে শুধু মাত্র কিছু পাবার লোভের বশবর্তি না করাই ভালো। এইখানে কি ভ্যালু vlaue দিতে পারলাম তাই গুরুত্বপূর্ণ।
লিংকডইনে কারো সাথে আপনার পরিচয় হল। সেখানে সব সময় তার কাছে কি না চেয়ে, বরং তার উপকারে লাগবে তেমন কিছু তথ্য দিয়েও আপনাদের এই পরিচয়ের সম্পর্ক তে কিছু ভ্যালু সংযুক্ত করেতে পারেন।
আমি চাকুরি খুঁজছিনা তাই আমার নেটওয়ার্ক না করলেও চলবে:
শুধু মাত্র চাকুরি খোঁজার সময়েই যে নেটওয়ার্ক করতে হবে আর অন্য সময়ে করতে হবেনা - এমনটি একেবারেই ভুল ধারণা। আসলে নেটওয়ার্ক করাটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যপার। খুব দ্রুত এর থেকে ফল পাওয়াটি সম্ভব হয়না। তবে সৌভাগ্যবসত আমার ক্ষেত্রে আমি ইন্ডাস্ট্রিতে যতগুলি চাকুরি পেয়েছি তা সবই লিংকডইন এর মাধ্যমে পাওয়া। নিজের প্রোফেশনাল ব্যান্ডিং এর ইমেজ অল্প কিছুদিনেই তৈরী করতে পারবেন না। এর জন্য অনেক দিন সময় এর প্রয়োজন হয়। তাই শুধু চাকুরী খোঁজার সময়েই নয়, সব সময়ই এই ব্যান্ডিং করার জন্য কাজটি করে যেতে হবে।
আমন্ত্রণপত্রে নিজের কথা লিখুন:
লিংকডইন সহ অন্যান্য নেটওয়ার্ক এর প্লাটফর্মে অন্যকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে আমন্ত্রনের অংশে শুধু মাত্র যা আছে তাই নয়। কেন তার সাথে পরিচয় বা নেটওয়ার্ক এ সংযুক্ত হতে চান তা উল্লেখ করুন। একটি পরিসংখ্যান দেখা গেছে যদি আপনি এইভাবে কাস্টোমাইজ বা পরিবর্তন না করলে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননা।
আমি লাজুক তাই নেটওয়ার্ক করতে পারবোনা:
অনেকেই একটু লাজুক চরিত্রের অধিকারি হন। সে ক্ষেত্রে অনেকেই নেটওয়ার্ক করতে দ্বিধান্বিত থাকেন। কিন্তু এই লাজুকতার দেয়ালটি যত দ্রুত আপনি ভাঙতে পারবেন ততই আপনাদের ভালো। পেশাগত জীবনের আগে ছাত্রজীবনের অনেক সময়ই ছেলেমেয়েরা এই ধরনের লাজুকতার হিনমন্যতায় ভুগে। বেশী স্মার্ট হবার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তারপরেও নিজেকে অন্যের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ও নেটওয়ার্ক করার ক্ষেত্রে কোন লাজুকতা নেই। আমি যখন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা করাতাম তখন ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ইভেন্টে নিয়ে যেতাম। আমাকেও অনেক ইভেন্টে বক্তৃতা দেবার জন্য আয়োজকরা আমন্ত্রণ দিত। সেই সময়ে ছাত্রছাত্রীদের কাজ দিতাম কে কত বেশি বিজনেস কার্ড কালেকশন করতে পারে। তাদের লাজুকতা ভাঙ্গবার জন্য এই কাজটি করতাম। তবে লিংকডইন কিংবা অন্য প্রোফেশনার নেটওয়ার্ক প্লাটফর্মে যেহেত লিখিত আকারে যোগাযোগটি শুরু হয়, তাই এইক্ষেত্রে লাজুকতা ভেঙ্গে ফেলাটি তুলনামূলকভাবে সহজ।
- Posted at Facebook on 4 Oct 2019