মশিউরের খেরোখাতা

নতুন ধরনের সফটস্কিল: অন্তর্দৃষ্টি (৩০ এপ্রিল ২০২৩)

তারিখ: ৩০ এপ্রিল ২০২৩

আমরা প্রযুক্তিবিদ সহ বিভিন্ন পেশাদার রা আমাদের কর্মক্ষেত্রের সংশ্লিষ্ট স্কিল, যেমন কারিগরি জ্ঞান, প্রযুক্তি জ্ঞান, গাণিতিক সমস্যা, কোডিং, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট সহ অন্যান্য হার্ডস্কিলগুলিকে যতটা গুরুত্ব দিই, সেই তুলনায় সফটস্কিল বা হিউম্যান-স্কিল কে ততটা গুরুত্ব দিই না। সফটস্কিল সিরিজে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে সিরিজে লিখছি এবং এই সংশ্লিষ্ট দুটি বই প্রকাশিত করেছি (সফল ক্যারিয়ার গড়ার উপায়, পারসোনাল ব্র্যান্ডিং যা রকমারিতে রয়েছে)। সেই সিরিজে আজকে আপনাদের কাছে একটি অন্যরকম স্কিল এর সাথে পরিচয় করে দিচ্ছি যেটিকে অনেক সময়ই আমরা স্কিল হিসাবে গণ্য করি না। নতুন ধরনেই এই স্কিলটির নাম হল অন্তর্দৃষ্টি।

অন্তর্দৃষ্টি কি?

অন্তর্দৃষ্টি-কে সংজ্ঞায়িত করা  একটি বেশ কঠিন একটি কাজ। কেননা এটি সম্বন্ধে আমাদের স্পষ্ট কোন ধারণা নেই। অন্তর্দৃষ্টি বলতে সাধারণত বোঝায়, কোন যুক্তি বা লজিক ছাড়াই একটি ধারণা বা সমাধানকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা। কোন একটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার ফলশ্রুতিতে তিনি সেই বিষয়ের উপর একটি অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করেন। তাঁদের অভিজ্ঞতার কারণে সমস্যা গুলির মধ্যে একটি প্যাটার্ন খুঁজে পান এবং অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে তাঁরা খুব সহজে সমস্যাকে খুঁজে পেতে পারেন এবং সমাধান করতে পারেন।

কিভাবে অন্তর্দৃষ্টি কাজ করে?

বিজ্ঞানীরা বলেন যে আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তা-ভাবনার প্রোসেসগুলি দুই ভাগে বিভক্ত, একটি হলো সচেতন চিন্তাভাবনা এবং আরেকটি হলো অবচেতন বা অচৈতন্য চিন্তাভাবনা। সচেতন চিন্তাভাবনা বিভিন্ন লজিক এবং তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অপরদিকে অবচেতন চিন্তাভাবনা কোন লজিক ছাড়াই মস্তিষ্কের খুব গভীরে কাজ করে যার বিস্তারিত বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো অজানা। অনেকের ধারণা এটি মস্তিষ্কের খুব গভীর অংশে অন্য কাজ করার সময় এমনকি ঘুমানোর সময়েও আপনমনে কাজ করে। জার্মান মনস্তত্ত্ববিদ গার্ড গিগারেঞ্জার (Gerd Gigerenzer) অনেক তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেন যে কখনো কখনো কম তথ্য দিয়েও অন্তর্দৃষ্টি কৌশল ব্যবহার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। প্রাচীন আমলে অনেক সেনাপতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং নেতাঁরা এই অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। গার্ড (Gerd) মনে করেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলে অভিজ্ঞ মানুষেরা এক ধরনের প্রজ্ঞা অর্জন করেন, যা দিয়ে তাঁরা এই অন্তর্দৃষ্টি ক্ষমতা অর্জন করেন। মস্তিষ্কের গভীরের অবচেতন চিন্তা ভাবনাগুলিকেই তাঁরা অনুভব করতে পারেন।

পেশাদারদের জন্য অন্তর্দৃষ্টি কীভাবে সহায়তা করতে পারে?

**(১) সহজে সমস্যার সনাক্তকরণ: **অন্তর্দৃষ্টির কৌশল ব্যবহার করে পেশাদাররা দ্রুত সমস্যার মূল কারণটি শনাক্ত করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন সফটওয়্যার ডেভলপার কিংবা নকশাবিদ খুব সহজেই তাঁর ডিজাইনের মধ্যে কোন সমস্যা রয়েছে কিনা তা খুব দ্রুত চিহ্নিত করতে পারেন।

**(২) সিদ্ধান্ত গ্রহণ: **কোন সমস্যার সমাধানের কৌশল যখন সুস্পষ্ট নয় তখন অন্তর্দৃষ্টি স্কিল ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়। এমনকি সীমিত তথ্যের উপর ভিত্তি করেও অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়।

(৩) সৃজনশীল সমস্যা সমাধান: অন্তর্দৃষ্টি কৌশল ব্যবহার করে প্রযুক্তিবিদেরা জটিল সমস্যার সমাধানের জন্য উদ্ভাবনী কৌশল প্রয়োগ করতে পারেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং প্রজ্ঞার উপর নির্ভর করে তাঁরা অভিনব পন্থায় সমস্যাগুলি সমাধান করেন।

লেখকের ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা:

কিছুদিন আগে আমাদের সফটওয়্যার সিস্টেমে একটি ত্রুটি হচ্ছিল যার দুর্বলতার অংশটি সহজে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সফটওয়্যারটি ঠিক কোন জায়গায় ত্রুটিপূর্ণ তা আমার টিমের প্রযুক্তিবিদেরা বের করতে পারছিলেন না। আমি যখন কোডগুলি দেখছিলাম, তখন সেই কোডগুলির মধ্যে একটা প্যাটার্ন খুঁজে পাচ্ছিলাম। কিন্তু একটি জায়গায় আমার কাছে মনে হচ্ছিল সেই জায়গাটি প্যাটার্নের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। পরবর্তীতে কোডাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পান যে সেই জায়গাটিতেই সমস্যা হচ্ছিল। কোন লজিক ছাড়াই অন্তর্দৃষ্টি কৌশল ব্যবহার করে আমি জায়গাটি বের করতে পেরেছিলাম। কীভাবে সেই জায়গাটি আ্্মার চোখে পড়ল তা আমার কাছে অস্পষ্ট।

কীভাবে অন্তর্দৃষ্টি বিকোশিত করবেন?

একজন পেশাদার হিসাবে আপনি যদি অন্তর্দৃষ্টি গুণসম্পন্ন হন তবে তা আপনাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করবে। নিম্নে তেমনি কিছু টিপস দেওয়া হলো:

**(১) অভিজ্ঞতা অর্জন: **অনভিজ্ঞ মানুষদের থেকে অভিজ্ঞ মানুষেরাই বেশি অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করেন, তাই অভিজ্ঞতা অর্জন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য আপনারা যা করতে পারেন তা হল: বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করা, বিভিন্ন দলের সাথে কাজ করা, বিভিন্ন ক্ষেত্রের লোকজনের কাছে থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতা শেখা, নিজের বিষয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়া।

**(২) অতীতের সিদ্ধান্তগুলি পর্যবেক্ষণ: **আপনার অতীতের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা গুলোকে কিভাবে সমাধান করেছেন এবং তার ফলাফলগুলি কেমন হয়েছে সেগুলি পর্যালোচনা করে বিশ্লেষণ করুন। এই পর্যালোচনা করার অনুশীলন আপনাকে সমস্যাগুলির মধ্যে প্যাটার্নগুলি চিনতে এবং অন্তর্দৃষ্টি বিকাশ করতে সহায়তা করবে। আপনার সাফল্য ও ব্যর্থতার কারণগুলি পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে এই অন্তর্দৃষ্টি বিকশিত করা সম্ভব।

**(৩) মননশীলতা: **ধ্যান, ইবাদত, শান্ত হয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা ইত্যাদি নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আপনি মননশীল চিন্তা করার কৌশল অর্জন করতে পারেন, যা আপনার অন্তর্দৃষ্টি বিকশিত করতে সাহায্য করবেন।

**(৪) ব্যর্থতাকে গ্রহণ করুন: **বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মধ্যে ভুল ত্রুটি হবে সেটাই স্বাভাবিক, তবে সেই ভুলটিকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখতে হবে। অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ফলে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান এবং সেই ভূল সিদ্ধান্তটি তার মনে খুব দীর্ঘমেয়াদি নেগেটিভ প্রভাব ফেলে। সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও হবে সেটাই স্বাভাবিক, তবে সেটিকে সহজভাবে গ্রহণ করতে হবে।

**(৫) সক্রিয়ভাবে শোনার দক্ষতা: **কারো সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে তার কথা শুধুমাত্র শুনলেই চলবে না, তা সক্রিয়ভাবে মনোযোগ দিয়ে শুনে, বক্তার কথার সাথে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বক্তার সাথে একটি কমিউনিকেশন তৈরি করতে হবে। খোলামেলাভাবে বক্তাকে প্রশ্ন করুন, তার কথায় সহমর্মিতা প্রকাশ করুন। টিমের সদস্যদের মধ্যেও অনেকের অন্তর্দৃষ্টি থাকে, এবং মনোযোগ দিয়ে তার কথাকেও গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত।

(৬) আত্মবিশ্বাসী হন: অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে কোন কিছু আপনি যদি উপলব্ধি করতে পারেন বা অনুভব করতে পারেন তবে সেটিকে গুরুত্ব দিন, এবং আপনার অন্তর্দৃষ্টির উপর আত্মবিশ্বাসী হোন।

**(৭) কৌতূহলী থাকুন: **সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন নতুন ধারণা শেখা এবং অন্বেষণ করার জন্য একটি খোলা মনে কৌতূহলী হোন।

অন্তর্দৃষ্টি এর ভুল ব্যবহার:

অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যথেচ্ছভাবে, কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি থেকে ভিন্ন। নিজের খামখেয়ালিপনার উপর বেশি মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হলে তা ভালোর থেকে বরং খারাপ করে। তাই কোনটি খামখেয়ালির সিদ্ধান্ত এবং কোনটি অন্তর্দৃষ্টি তার মধ্যে পার্থক্য গুলি বের করার চেষ্টা করুন।

অন্তর্দৃষ্টিকে সফটস্কিল হিসাবে পরিগণিত করা যাবে কিনা - তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলে কিছু কিছু মানুষেরা এক ধরনের প্রজ্ঞা এবং অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করেন যা তাঁদেরকে সমস্যা সহজে খুঁজে পেতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে। এবং নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে এই অন্তর্দৃষ্টি স্কিলটি অর্জন করা সম্ভব।

পাদটীকা: এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য Gerd Gigerenzer এর Gut Feeling The Intelligence of the unconscious থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।