ক্যাডেট কলেজে ভর্তির স্মৃতিচারণ (২০২৪)
তারিখ: ১৭ এপ্রিল ২০২৪
ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবার ৩৮ বছর পরে
আজ ১৭ এপ্রিল ২০২৪, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে ইনটেকের দিন থেকে এর মধ্যেই ৩৮ বছর পার হয়ে গেছে। এত দ্রুত সময় পার হয়ে গেল- সেটা ভাবতেই কেমন জানি লাগছে। মনে হচ্ছে এই তো সেদিন।
দুরু দুরু বুকে ভয় নিয়ে রাজশাহী থেকে বানেশ্বর এ বাসে পৌঁছলাম। সেখানে দেখা হল আমার ব্যাচমেট পাশা ও হায়দারের সাথে। ওদেরকে আগে থেকেই চিনতাম। সম্ভবত সেই বাসে আরো কয়েকজন ছিল ঠিক নাম মনে করতে পারছিনা। কেন জানি মনে হচ্ছে মাহফুজকে দেখেছিলাম। এরপরে বাসে করে আমরা মুক্তারপুরে পৌঁছলাম। বিশাল রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ক্যাম্পাস দেখে মোহিত হলাম। এর আগে একবার মাত্র যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল ক্যাম্পাসে। গোলাম মোস্তফা স্যার আমার বাবার বন্ধু হয় সেই সম্পর্কে একবার ঘুরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ১৭ই এপ্রিল আরেকটু অন্যভাবে এই ক্যাম্পাস টাকে দেখলাম কেননা এখানেই আমাকে থাকতে হবে। নতুন জায়গায় নতুন অনুভূতি একটা অন্যরকম শিহরণ হচ্ছিল। সম্ভবত আরেকটা কারণ হল, পরিবার থেকে কখনোই দূরে থাকেনি। একাডেমিক বিল্ডিংয়ে ঢুকার পরপরেই ২৩ ব্যাচের কবির ভাই এবং আশরাফ ভাই, আমার ট্রাংকের দায়িত্ব নিয়ে নেন। তখনই প্রথম জানতে পারি যে কাশিম হাউজে আমার সিট পড়েছে।
ভর্তির সংক্রান্ত কাগজপত্র পূরণ করে আশরাফ ভাই ও কবির ভাই এর পিছন পিছন কাসিম হাউসের দিকে হাঁটছি। উনারা আমার ট্রাঙ্ক নিয়ে যাচ্ছেন। গত এক মাস ধরে এই ট্রাংকের বিভিন্ন জিনিসপত্র সংগৃহীত করছিলাম। কেনাকাটি করতে যেয়ে সব থেকে বেশি ঝামেলায় পড়েছিলাম রুমাল কিনতে যে। কোন কাপড়ের রুমাল নিব? কত সাইজ হবে? সে নিয়ে কত যে তর্কবিতর্ক করেছি বাবার সাথে- সে কথা ভাবলে খুব হাসি পায়। এরপর কাসিম হাউজে সম্ভবত ১১ নম্বর রুমে ঢুকলাম। ঢুকেই সেখানে পাশে পেলাম আরেক সতির্থ সাইফ কে। রাজশাহীতে লালপুর নামে একটা যে জায়গা রয়েছে- সেটা প্রথম সাইফের কাছেই জানতে পারলাম। আমার বাবার পরিচিত পাশা কে পেয়ে গেলাম। পাশা'র বাবা ইউনুস আঙ্কেল আমার পূর্ব পরিচিত বলে একটু সাহস পেলাম। আর কিছু না হোক পাশা তো রয়েছে।
আমার বেডের উল্টোদিকে পেলাম রানাকে। রানার বাবা কেমিক্যাল সোসাইটির সাথে যুক্ত বলে, আমার বাবাকে চিনতে পারলেন। আর তার পাশে হায়দার কে তো আগে থেকেই চিনি, একসাথে ক্যাডেট কলেজ কোচিং করার সুবাদে। পরিচিত হলাম আশিক, এহতেসাম বুলন, আসিফ এবং জাহাঙ্গির এর সাথে।
এরপর প্রিন্সিপালের ব্রিফিং শেষে আমরা হালকা নাস্তা করে রুমে ফিরে আসলাম। সেদিন রাতে সিনিয়রদের সাথে পরিচিত হলাম। সেই কবির ভাইকে পেলাম রুম লিডার হিসাবে। ভাগ্যের কি চমৎকার খেলা! সেই কবির ভাই ও আমি জাপানের মনবুশো স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি দিলাম জাপানে - সেইদিনের দেখা হবার প্রায়া সাত বছর পরে। একসাথে জাপানে কত জায়গা ঘুড়েছি- টোকিও এর অলিগলিতে হেঁটেছি। আর বিজ্ঞান নিয়ে কত তর্কবিতর্ক করেছি। আপেক্ষিক তত্ত্ব নামে যে একটি তত্ত্ব রয়েছে সেটিও উনার কাছ থেকে শেখা। এখনো উনার সাথে যোগাযোগ আছে। ক্যাডেট কলেজ থেকে সম্পর্কগুলো অন্যরকম ভাবে এখনো টিকে রয়েছে।
তবে এখনো মনে পড়ে ১৭ এপ্রিলে রাতে ঘুমানোর কথা। বাবা চলে যাবার পর,অস্টম শ্রেণীর সিনিয়রদের সাথে "পরিচিত" হলাম। এই "পরিচয় পর্ব" এর অর্থ শুধুমাত্র ক্যাডেটরাই বুঝতে পারবেন। রাতে ঘুমোতে গিয়েছি। জানালার পাশে বিশাল আকাশ, দূরে পদ্মা নদীর শব্দ হালকা শোনা যাচ্ছে, মিটমিট করে জ্বলছে তারা। পরিবারকে মিস করার কারণে চোখের জলে সেই তারাগুলো আবছা হয়ে যাচ্ছে।
তারপর দীর্ঘ ৬ বছর সেই ক্যাডেট কলেজে পার করে দিলাম। সেই ক্যাম্পাসে কত হাঁটলাম, গল্প করলাম, খেলাধুলো করলাম , মঞ্চে উঠলাম। আর সব থেকে বড় যে জিনিসটি পেলাম সেটা হল "সম্পর্ক"। এত মানুষের সাথে সম্পর্ক এবং নেটওয়ার্ক হলো যে সেটা সারা জীবন আমাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করল। এখনো যখন কোথাও সমস্যায় পড়ি প্রথমেই খোঁজ করি ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের কাছে। জীবনে বন্ধু পেয়েছি অনেক।। কিন্তু হৃদয়ে হৃদয় মিশে, আত্মার সাথে আত্মার যে সম্পর্ক, যে গভীরতা - তা শুধুমাত্র আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের কাছেই পাই। তাদের আনন্দে আমি আনন্দিত হই, তাদের কষ্টে আর কষ্ট পাই। (এই অংশটি লেখবার সময় লেখকের চোখে পানি চলে এল, যা সঠিকভাবে প্রকাশিত করতে লেখক ব্যার্থ)
ক্যাডেট কলেজ আমাকে কি দিয়েছে?- তা নিয়ে কখনও হিসাব করতে বসি না। তবে সব থেকে যে জিনিসটা আমি শিখেছি, তা হলো - "কনফিডেন্স"। নিজের ভিতর দিয়ে যদি সত্যিকারে চেষ্টা করা যায় - তাহলে অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা আমাদের সেটিই দেন। এ সাধারণ কথাটি শিখেছিলাম ক্যাডেট কলেজে ছয়টি বছরে।
আজকের দিন একটা ছোট ঘটনা শেয়ার করবো। ক্যাডেট কলেজে বিভিন্ন সংস্কৃতিক কর্মকান্ডে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ি।। এবং এর মধ্যেই আমি নতুন করে আমার "আমিত্ব"কে খুঁজে পাই। মঞ্চে আমার প্রথম দিনে একটি আন্ত:কলেজ ডিবেট প্রতিযোগিতায় আমি অংশ নিয়েছিলাম। সেদিন একটা মারাত্মক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম আমি। আমাদেরকে কিছু কাগজের মধ্যে থেকে একটি কাগজ তুলে নিতে বলা হয়, নিজের টপিক টি নিবার জন্য। আমার ভাগ্যে পড়েছিল, "জ্ঞান"। পার্বতী ৫ মিনিটেআমি প্রস্তুতি নিলাম। এরপর ডায়াসে দাঁড়িয়ে আমার বক্তব্য রাখা শুরু করলাম। এর আগেও অনেকবার ডায়েসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেদিন হঠাৎ করে প্রিন্সিপাল স্যারের চোখে চোখ পড়ার পর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। পুরো পাঁচ মিনিট আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। সেই ৫ মিনিট আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন- পাঁচ বছর। কি বলবো?- কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাংলায় "সর্ষে ফুল" দেখার মতন অবস্থা আমার। অনেক কিছু বলার ছিল, গোছানোও ছিল, কিন্তু সেদিন কোন কথা বের হয়নি। আমি নির্বাক হয়ে পাঁচ মিনিট সময় কাটালাম। এরপর ধীরে ধীরে নিজের চেয়ারের দিকে ফিরে যাচ্ছি, মঞ্চের এক কোনায় দেখি আবেদীন স্যার কটমট করে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।
এই ঘটনাটি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। নতুন করে আবার নিজেকে গোছানো শুরু করলাম। পাবলিক স্পিকিং এর উপর ভালো মতন দক্ষতা অর্জন করলাম। এর পরে আর কখনও ভয় পাইনি। অনেক কাজ করেছি মঞ্চে। মঞ্চ হয়ে যায় আমার ধ্যান জ্ঞান। এরপর মঞ্চে আমি সাবলিল ভাবে কথা বলতে পারি, নির্দ্বিধায় আমি যে কোন বিষয়ে কিছু অন্তত বলতে পারি। বুক একটুকো কাঁপে না, একটুকু এলোমেলো হয় না। সেই কনফিডেন্স টা পেয়েছিলাম ক্যাডেট কলেজে এই ধাক্কাটি খেয়ে। আর সে জীবনে মনে হয় এই ধরনের কিছু কিছু ধাক্কা এর প্রয়োজন এবং সৃষ্টিকর্তা দিয়ে দেন তাকে নেক্সট স্টেপে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ক্যাডেট কলেজে পরবর্তীতে কালচার প্রিফেক্ট (সাংস্কৃতিক সম্পাদক) হবার সুযোগ হয়েছিল। ঘরও করছি একজন সংস্কৃতিক শিল্পী মিতু এর সাথে।
আমার একটা youtube চ্যানেল রয়েছে যেখানে আমি বিভিন্ন টপিক নিয়ে আলোচনা করি। এবং ক্যাডেট কলেজের সেই শিক্ষাটা এখনো বয়ে বেড়ায়। সবাইকে আমার চ্যানেল দেখার শুভেচ্ছা রইল।
