অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে
বিশেষজ্ঞ কলাম
ড. মশিউর রহমানসহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
যারা অনলাইনে বিদেশ থেকে কোনো কিছু কেনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তারা কমবেশি অনলাইন পেমেন্টের সাথে পরিচিত। এর মধ্যে সব থেকে জনপ্রিয় পেমেন্ট সিস্টেম হলো পেপাল, ক্রেডিট কার্ড। এছাড়াও মাইক্রোসফট, গুগল সবাই নিজ নিজ পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করছে। কিন্তু বাংলাদেশে কোনো অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম না থাকায় কাজ করবার জন্য আমাদের অনেক অসুবিধা হচ্ছে। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনেই নয় বাংলাদেশে অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এবার দেখা যাক অনলাইন সিস্টেমের কারণে আমরা কি কি অসুবিধায় পড়ছি, যার কারণে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
আপনারা অনেকেই জানেন তথ্যপ্রযুক্তির এই জগতে আউটসোর্সিং বেশ সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র যেখানে আমাদের দেশের বিশাল জনশক্তিকে আমরা কাজে লাগিয়ে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি। আউটসোর্সিং বলতে আমরা বুঝি কোনো কাজ বাহিরের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমেরিকার কোনো একটি কোম্পানি তার ওয়েবসাইট তৈরি করবে, প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকার কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করালে বেশ খরচ হবে (মনে করা যাক কয়েক হাজার ডলার) কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কাজটি আমেরিকায় না করিয়ে বাংলাদেশে করালে মাত্র কয়েকশ ডলারেই করাতে পারবে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করেই এই কাজটি করা সম্ভব। বাংলাদেশের অনেক তরুণ প্রোগ্রামার আউটসোর্সের কাজে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। এবং ঘরে বসেই তারা জীবিকা নির্বাহ করছে।
প্রথম দিকে আউটসোর্স শুধুমাত্র কম্পিউটার প্রোগ্রাম জাতীয় কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। যেমন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেট, গ্রাফিক্স ডিজাইন। কিন্তু আমাদের যুবসমাজ যে সমস্যার মধ্যে পড়ে তা হলো কাজটি সমাপ্ত করার পর তার পারিশ্রমিকটি বাংলাদেশে নিয়ে আসা। বাধ্য হয়েই ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মতো ব্যয়বহুল সিস্টেম ব্যবহার করতে হচ্ছে। পেপাল বা ক্রেডিট কার্ড বাংলাদেশে ব্যবহারের উপায় নেই। আমি এখানে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড এর কথা বলছি। আমি অনেক প্রোগ্রামারকে জানি যারা এই সমস্যার কারণে কাজ করেও বাংলাদেশে টাকা নিয়ে আসতে পারছেন না। অনেক সময় তারা প্রবাসে বসবাসরত আত্মীয়স্বজনদের মাধ্যমে টাকাটি নিয়ে আসেন যা অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট করে।

*যেসব কারণে কোনো কাজ আউটসোর্স হয় (তথ্যসূত্র : 2001 Outsourcing World Summit) *ত্রিমাত্রিক পাই-চার্ট — আউটসোর্স করার কারণসমূহ ও তাদের শতকরা হার (Foster Innovation 4%, Conserve Capital 1%, Reduce Costs 36%, Increase Speed to Market 10%, Improve Quality 13%, Focus on Core 36%)]
আউটসোর্সের কাজে একটি দেশের ব্র্যান্ডিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখনই একজন ক্লাইন্ট তার কোনো কাজ বাংলাদেশের কাউকে দিয়ে করিয়ে নেবার কথা ভাবেন, যখন তিনি যদি দেখেন বাংলাদেশে সহজে টাকা পাঠানোর উপায় নেই তখন তিনি মনে করতে পারেন যে, বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপারগুলোতে পিছিয়ে রয়েছে। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে যতই চিৎকার করি না কেন এটা হলো বাস্তবতা।

অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম যেখানে কাজ করে (তথ্যসূত্র : NetBuilder)
এছাড়া যারা বিদেশ থেকে কোনো জিনিস কিনে আনতে চান কিংবা ebay এর মতো সাইটগুলোতে জিনিসপত্রের কেনা বেচা করতে চান তাদের জন্যও এই অনলাইন পেমেন্টগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বে অসংখ্য মানুষ যেখানে ebay-এর মতো সাইটগুলো ব্যবহার করে কেনাবেচা করে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করছে, আমরা বাংলাদেশীরা সেখানে হাত গুটিয়ে বসে রয়েছি। ebay-এর মতো সাইটগুলোতে আমরা যদি অন্যান্য দেশের মতো আমাদের বাংলাদেশের স্থানীয় পণ্যগুলো তুলে ধরতে পারতাম তবে আমাদের দেশের বেকার যুবসমাজ শুধুমাত্র তাদের ভাগ্য উন্নয়ন করত তাই না সেই সাথে সারা বিশ্বের কাছেও আমাদের দেশীয় পণ্যগুলো সমাদৃত হতো শুধুমাত্র বিদেশ নয় আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কাজেও অনলাইন পেমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আমাদের এখন দ্রুত টাকা পাঠানো জরুরী হয়ে পড়েছে। অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমগুলো আমাদের এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে।

কিছু বিখ্যাত অনলাইন সিস্টেম
আমাদের বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকে কিংবা কোনো অনলাইন প্রতিষ্ঠানে এই অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে উঠেনি বলে এই সুযোগে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত টাকা পাঠানোর সুযোগ দিচ্ছে। আপনি যদি ঢাকার কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিসে একবার যান তবে দেখবেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে টাকা পাঠানোর জন্য কি বিশাল লাইন। আপনার একবার মনে হতে পারে আপনি ভুলে হয়তো ব্যাংকে চলে এসেছেন।
এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও ebay-এর মতো অনেক সাইট তৈরি হয়েছে যেখানে আমরা অনলাইনে জিনিসপত্র কেনাবেচা করতে পারি। আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে যেহেতু ইন্টারনেটের ব্যবহারকারী বাড়ছে তাই এই জাতীয় সিস্টেমগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। এই ধরনের সিস্টেম ব্যবহার করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক তার পণ্যগুলো সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারবে। অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের অনুপস্থিতির কারণে এই অনলাইন কেনাবেচা সিস্টেমগুলো আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। বর্তমানে এই সিস্টেমগুলো প্রবাসীদের সার্ভিস দেয়ার মাধ্যমে টিকে রয়েছে কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও বিশাল চাহিদা রয়েছে। অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম থাকলে আমরা আমাদের কৃষিপণ্যগুলোকে আরও দ্রুততার সাথে কেনাবেচা করতে পারতাম এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ছাড়াই কাজ করতে পারতাম।
কারণসমূহ
বাংলাদেশে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম না থাকার পিছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুযোগ সুবিধা দিতে পারছে না। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো প্রযুক্তিগত। যেহেতু এই ধরনের সিস্টেমের সাথে অর্থ জড়িয়ে রয়েছে তাই ভালো নির্ভুল ও সিকিউরিটি সম্পন্ন সিস্টেম প্রয়োজন এবং আমাদের খুব কম প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের সিস্টেম তৈরি করার প্রযুক্তিগত সামর্থ রয়েছে।
উত্তোরণের উপায়
অনলাইন সিস্টেম অনুপস্থিতির কারণে আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছি। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা যদি একটি সুন্দর পলিসি তৈরি করতে পারি তবেই দেখব অনেক প্রতিষ্ঠানই এই ধরনের সিস্টেম তৈরি করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মূলত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এবং অনলাইন সিস্টেম নিয়ে যারা কাজ করেছে তারাই এইগুলো তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। আমরা দ্বিতীয় যে প্রযুক্তিগত সমস্যা উল্লেখ করেছি তখন দেখব হয়তোবা আমাদের দেশেই লোকবল রয়েছে যারা এই ধরনের সিস্টেম তৈরি করেছে।
অনলাইন পেমেন্ট সংক্রান্ত পলিসি তৈরি করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককেই এইখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম সংক্রান্ত কিছু গবেষণা আমি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চালিয়েছি। আমরা অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলেছি, সবাই আঙুল উঁচু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে। কেননা এই সংক্রান্ত কোনো পলিসি বাংলাদেশ ব্যাংক করেনি।
পলিসি তৈরি হচ্ছে না কেন
যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলাম আমার ধারণা তা বাংলাদেশ ব্যাংকও জানে, কিন্তু যে কারণে পলিসি তৈরি হচ্ছে না আমার ধারণা তা হলো আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনা যারা করছে তাদের জুজু বুড়ির ভয়। অনেকের একটি ভ্রান্ত ধারণা হলো এর ফলে আমাদের দেশের টাকা বাইরে চলে যাবে। তাদের আশ্বস্ত করার জন্য বলছি, পুরো সিস্টেমটি যেহেতু তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক তাই এই সিস্টেম দিয়েই বরং খুব সহজে বের করা সম্ভব কে কত টাকা দেশের বাইরে পাঠাল কিংবা উপার্জন করল। একটি সময় সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে আমাদের নেতাদের যেমন ভয় ছিল এখন এই অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম নিয়েও তাদের তেমন ভয় আছে আর মাঝখানে জনগণ সমস্যায় পড়ছি এবং রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গতানুগতিকভাবে বা এনালগভাবেই যেখানে আমাদের দেশটা যেখানে চলছে, সেখানে আমরা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' বলে সাধারণ জনগণকে শুধু ধোকাই দিচ্ছি। সত্যিকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' বলতে যা বোঝায় তার কোনটিই আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। যদি আমরা অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম তৈরি করে জনগণকে উপহার দিতে পারি, তবেই আমরা জনগণের সত্যিকার কাম্য 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' উপহার দিতে পারব।
উৎস: টেকনোলজি টুডে, অক্টোবর ২০০৯, পৃষ্ঠা ১৯-২০