মশিউরের খেরোখাতা

রিচার্ড স্মলি :: বিজ্ঞানী থেকে সমাজকর্মী

ড. মশিউর রহমান সহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

রিচার্ড স্মলি যাকে আমরা সহকর্মিরা রিক বলে ডাকি, তিনি ন্যানোপ্রযুক্তির সাথে আজীবন সংযুক্ত থাকবেন। ন্যানোপ্রযুক্তিকে শুধু মাত্র বিজ্ঞানীদের মধ্যে সীমাবন্ধ না রেখে তা সাধারণ মানুষদের থেকে শুরু করে রাজনীতিবীদদের মধ্যেও পরিচিত করেছিলেন তিনি হলেন রিক। রিক ১৯৯৬ সনে নোবেল পুরষ্কার পাবার আগেও তিনি তার ক্ষেত্রেও ছিলেন প্রবাদ পুরুষের মত কিন্তু নোবেল পুরষ্কার পাবার পরে রিক বুঝতে পারলেন যে তিনি তাঁর আবিষ্কারের জন্য শুধু মাত্র একটি সম্মাননা পাচ্ছেন না তাই নয়, সেই সাথে পাচ্ছেন একটি সুযোগ তা হল যা বলবেন তা মানুষ শোনবে। এবং এই সুযোগটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন সম্পূর্ণভাবে। নোবেল পুরষ্কার পাওয়া থেকে তার মৃত্যুর মাঝের ৯ টি বছর রিক-কে আমরা দেখেছি কিভাবে তিনি ন্যানোপ্রযুক্তির গবেষনার জন্য ওয়াসিংটনে রাজনীতিবীদদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। সেই অর্থকে কাজে লাগিয়েছেন ন্যানোপ্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষনাতে। ২০০৭ সনের বাজেটে বুশ ১.২ বিলিয়ন ডলার দিয়েছেন জাতীয় ন্যানোপ্রযুক্তি গবেষনাগারে (National Nanotechnology Initiative, NNI)।

তবে রিক এর একটি অদ্ভূত সম্মোহনী শক্তি ছিল। তিনি জানতেন কার কাছে কিভাবে বক্তব্য পৌছে দিতে হয়। একটি ছোট উদাহরণ দিই, আমেরিকা সহ অন্যান্য সব দেশেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অর্থগুলি কিভাবে বরাদ্দ হবে তার সীদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনের পদের লোকজন। বিজ্ঞানীরা সাধারণত নতুন কোন পদ্ধতি বা গবেষনার জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য এই সমস্ত লোকজনের কাছে ধর্না দেয়। বিজ্ঞানীদের তাদের বক্তব্য দেবার পরে প্রায়সই রাজনীতিবীদরা জানতে চান তার এই পদ্ধতি সত্যিই সম্ভবপর কিনা? ভবিষ্যতের ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা খুবই সাবধানী, তাঁরা সাধারণত উত্তর দেন আমার হাতে আলাউদ্দীনের চেরাগ নেই তবে চেষ্টা করে দেখব.. ইত্যাদি। রিক কিন্তু অন্যভাবে উত্তর দিতেন। যেমন ১৯৯৯ সনের NNI এর অনুষ্ঠানে house of representative দের সামনে দাড়িয়ে বল্লেন, আমি আপনাদের সামনে টাক মাথা নিয়ে দাড়িয়েছি কেননা কিছু সপ্তাহ আগে আমি কেমোথেরাপি নিয়েছি আমার ক্যান্সার নিরাময়ের জন্য। তবে কেমোথেরাপি আমার শরীরে শুধু মাত্র বিষাক্ত ক্যান্সারের কোষগুলিকেই মেরে ফেলেনি সেই সাথে আমার মাথার চুলের কোষগুলিকেও মেরে ফেলছে। কিন্তু আমি একজন আশা করছি আজ হতে ২০ বছর পরে ন্যানোপ্রযুক্তির মাধ্যমে এমন পদ্ধতি বের করা সম্ভব যার ফলে শুধু মাত্র ক্যান্সার কোষকে মারবে অন্য কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই। আমি হয়তো সেই দিনটি দেখে যেতে পারবনা তবে আপনাদের সহযোগীতাতে তা সম্ভব হবে। তারপরে আপনার সবাই দেখেছেন কিভাবে রিক-কে সব রাজনীতিবিদরা ধন্যবাদ জানিয়েছিল তার বক্তব্য এর জন্য। রিক যে মিথ্যা কিছু বলেছিলেন তা নয়। আমরা এখন জানি রিক যে কথা বলেছিলেন তা সত্য হয়েছে। ন্যানোপ্রযুক্তি এখন বিভিন্ন মেডিক্যাল এর ক্ষেত্রগুলিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। রিক জানতে কিভাবে খুব সহজে তা মানুষের কাছে পৌছাতে হয়। পরবর্তিতে ক্লিনটনের বিজ্ঞান প্রযুক্তির ব্যপারে পরামর্শদাতা নিল ফেন বলছিলেন, রিক জানত যে রাজনীতিবীদরা যে বোকা তা নয়। আসলে তারা বিজ্ঞানী নয় এবং বিজ্ঞানের ব্যাপারগুলি বোঝার মত সময় নেই। আসলে বাজেটের অর্থ যখন বিজ্ঞানের কাজে ব্যবহার করা হয় তখন রাজনীতিবীদরা মনে করেন যে সাধারণ মানুষদের কর্ষার্জিত কর-এর টাকা যখন ব্যবহার করা হবে তখন তা আসলেই সমাজের জন্য প্রকৃতপক্ষেই কাজে লাগবে তেমন কোন কাজে এটিকে ব্যবহার করার জন্য। তাই যারা বিজ্ঞান কে সাধারণ জনগণের উপকারে কাজে লাগাতে চান তারা রিক’এর দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।

তথ্যসূত্র:

Adams, W Wade & Baughman, Ray H (2005), "Retrospective: Richard E. Smalley (1943-2005).", Science 310(5756) http://en.wikipedia.org/wiki/Richard_Smalley

ড. মশিউর রহমান: সহকারী অধ্যাপক, কম্পিউটার সাইন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।