মশিউরের খেরোখাতা

ফুতাগায়া সরাইখানা (১৮০৭-১৮৭০)


আমরা যখন তোয়োহাসি শহরের হোনজিন নামে ছোট একটা জনপদে পৌছলাম তখন যেন শত বছর আগের ইতিহাসের দ্বি-তিমাত্রা আমাদের ঘিরে ধরল। আমরা কেউ সেই দিন দেখিনি অথচ যাদুঘরের দরজা আর আসবাবপত্র ছোবার সাথে সাথে যেন সেই দিনের দ্বি-তিমালি আমাদের ঘিরে ধরল।

ফুতাগায়া হোনজিন সম্পর্কে তথ্য হোনজিন (本陣) হল জাপানের এডো যুগে বিশেষ ধরনের সরাইখানা বা বাসস্থান যেখানে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী এবং রাজ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা থাকতেন। ফুতাগায়া হোনজিনের ইতিহাস হল ১৬০১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এডো সমাজে এবং ১৮০৭ থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। এটি তোয়োহাসি শহরে অবস্থিত ছিল, যা কিওটো থেকে এডো (বর্তমান টোকিও) যাওয়ার রাস্তায় ৩৩ নং সরাইখানা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিওটো থেকে টোকিওর এডো শহরে যাওয়ার প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ যাত্রায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ থামার জায়গা ছিল এবং এই পুরো রাস্তায় মোট ৫৩টি হোনজিন বা সরাইখানা ছিল। এখানে উচ্চবর্গীয় রাজ্য পরিচালক এবং সরকারি কর্মচারীরা থাকতেন এবং বিশ্রাম নিতেন এবং রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, হিসাব এবং উপহার সংরক্ষণ করা হতো। প্রতিটি সরাইখানায় ১০০টি ঘোড়া এবং ১০০ জন কুলি থাকত যারা পরিবহন সেবা প্রদান করত। উচ্চ বর্গীয় সরকারি কর্মচারীদের নিরাপত্তার জন্য সামুরাই যোদ্ধারা তাদের পাশে থাকতেন এবং বিশেষ নিরাপদ কক্ষ ছিল যেখানে গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণ করা হত। ফুতাগায়া হোনজিন পরিচালনা করত "ববা পরিবার" যার সাংস্কৃতিক চিহ্ন সরাইখানার প্রতিটি আসবাবপত্রে ফুটে উঠেছে। সরাইখানার অর্ধেক অতিথিদের জন্য ব্যবহৃত হতো এবং অর্ধেক পরিবারের সদস্য এবং কর্মচারিদের জন্য ব্যবহার করা হতো এবং সরাইখানার মধ্যে একটি কুয়া ছিল। ১৮৭০ সালের পর এটি আর হোনজিন হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি এবং তৎকালীন সময় জাপানে ১১১টি এমন সরাইখানা ছিল, কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৩টি সংরক্ষিত আছে কারণ বাকিগুলি সময়ের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আজকে ফুতাগায়া হোনজিনটি একটি যাদুঘরে পরিণত হয়েছে এবং সরাইখানার পাশে একটি যাদুঘর আছে যেখানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। ফুতাগায়া হোনজিন জাপানের এডো যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান যা আধুনিক জাপানের গঠনপ্রক্রিয়ায় একটি সেতু হিসেবে কাজ করেছে এবং এটি শুধুমাত্র একটি সরাইখানা নয়, বরং সেই সময়ের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি জীবন্ত প্রমাণ।

ভাবতেও অবাক লাগে একদিন এই ছোট সরাইখানাটি লোকজনের প্রতি পেট আর বড় বড় পদবী লোকদের দ্বিম্ভত পদভার কি কাম কারখানাই না হয়ে যেত। তখন তো এখনকার মত দিনছিল না।

তোয়োহাসি শহরের মেট্রোপলিটন অফিস বিদেশী ছাত্রদের এই সরাইখানা বসবাসের আয়োজন করছিল, একটি সুষ্ঠু শরতের দিনে। আমরা তোয়োহাসি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় আর আইচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী ছাত্রদের সেই বসবাসে আয়োজন করছিলাম।


ইতিহাস

আজ হতে পস্টায় ২০০ বছর আগে ১৬০১ সালে এই ফুতাগায়া সরাইখানাটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এডো সমাজে। এই এডো সমাজ শাসিত হয়েছিল ১৬০৩ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত। এই সময় ক্ষমতায় আসে শোগুনরা। আর তৎকালীন সময় রাজারা নামধারী দেশের প্রধান হিসেবে ছিলেন। শোগুনরা রাজ্য পরিচালনা করতে থাকে টোকিওর এডো শহর থেকে যা বর্তমানে নিহোনবাশি নামে পরিচিত। কিওটো থেকে এডো যাওয়ার পথে ৫৩টি রাজ্য সরাইখানা ছিল। আর সরাইখানা গুলি পরিচালনা করত দ্বিতীয়বেনীয় প্রভাবশালী পরিবাররা। তৎকালীন এডো (বর্তমানে টোকিও) থেকে কিওটো যাওয়ার পথে এই ফুতাগায়া সরাইখানাটি ছিল ৩৩ নং সরাইখানা।


সরাইখানার কাজ

আমরা সরাইখানায় প্রবেশ করার পর সেখানকার পরিচালক আমাদের এই সরাইখানার ইতিহাস বলে শোনালেন। মূলত এই সব সরাইখানা ব্যবহৃত হত উচ্চবর্গীয় রাজ্য পরিচালকদের বিশ্রামগার হিসেবে। পুরো ৫০০ মাইলের দীর্ঘ এই যাত্রাপথে তাদের বিশ্রামের জিনিসপত্র, রাজ্যের হিসাব পত্রের জরায়ু কাগজপত্র, উপহার বহন করার জন্য এই সরাইখানা গুলি ব্যবহৃত হত। পরিবহন করার জন্য ব্যবহৃত হত ঘোড়া আর মানুষ। সেজন্য প্রতিটি সরাইখানায় সবসময় ব্যবহারকারীর জন্য ১০০টি ঘোড়া ও ১০০টি কুলির ব্যবস্থা রাখা হত।


সরাইখানার বর্ণনা

আমরা যে সরাইখানাটি দেখলাম তা পরিচালনা করত "ববা পরিবার"। সরাইখানার প্রতিটি আসবাবপত্র তার পরিবারের সাংস্কৃতিক চিহ্ন আজও অনুভূত আছে। সরাইখানার ভিতরে দেখলাম কুয়া আছে। সরাইখানার অর্ধেক ব্যবহার হত অতিথিদের জন্য আর অর্ধেক অংশ ব্যবহার হত ববা পরিবারের লোকদের এবং সরাইখানার কর্মচারিদের জন্য। বিশেষ কিছু কক্ষ ছিল উচ্চ বর্গীয় সরকারি কর্মচারিদের জন্য সংরক্ষিত। তাদের নিরাপত্তার জন্য তৎকালীন সামুরাই রা তার আশেপাশে থাকতেন। সরাইখানা গুলিতে বিদামঘর ছিল যেখানে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, অলংকার সুসংরক্ষিত রাখা হত।


পরবর্তী ইতিহাস

১৮৭০ সাল পর্যন্ত এই সরাইখানাটি ব্যবহৃত হত। তারপর জাপানের সরকার পরিচালনায় আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং সরাইখানা গুলি বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। তৎকালীন সময় সারা জাপানে ১১১টি সরাইখানা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৩টি সরাইখানা সংরক্ষিত আছে। অন্যান্য সরাইখানা গুলি সময়ের গর্ভে তলিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এই সরাইখানাটির পাশেই একটি যাদুঘর আছে, যেখানে বিভিন্ন সামগ্রী সংরক্ষিত করে রাখা আছে।


তথ্যসূত্র:

https://futagawa-honjin.jp/