গল্প: বাক্সবন্দী মেয়ে
আজকাল দিনগুলিকে বড় বেশি দীর্ঘ বলে মনে হয়। অফিস থেকে ফিরে কিছু করার থাকে না। অথচ ব্যাপারটা কয়েকদিন আগে কিরকম ভাবে উল্টো ছিল। তখন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবার জন্য মনটা খুব উদগ্রীব হয়ে থাকতো। বিয়ের প্রথম প্রথম ছন্দা অফিস থেকে ফিরলেই এটা ওটা করে বসে থাকতো। ওর রান্নার হাতটা বেশ। আর মাঝে মাঝে নাটক দেখা। দিনগুলি কি সুন্দর ভাবেই না কেটে যাচ্ছিল। অথচ এক বছরের মাথায় কি পরিবর্তন। পরিবর্তনের সূচনাটা হল ছন্দা একটা স্কুলে চাকরি নেবার পর। আমি অফিসে গেলে ওর আর কিছু করার থাকে না বলে চাকরিটা নেয়। কিন্তু ছন্দা চাকরিতে ঢুকার পর খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অনেক সময় ফিরতে ফিরতে রাত করে ফেলে। আমি প্রথম প্রথম মহাউৎসাহে বিকাল করে বাড়ি ফিরে আসতাম অথচ এসে দেখি ছন্দা ফিরে নি। ব্যাপারটা প্রথম প্রথম মারাত্মক আঘাত করত। অথচ আধুনিক চিন্তার মুখোমুখি নিজেকে দাঁড় করাতে ভয় পেতাম। ওর স্বাধীনতার উপর আমি হস্তক্ষেপ করতে পারিনি।
বন্ধুদের সাথে ব্যাপারটি নিয়ে কথা বললেই ওরা বলতো। একটা ছেলে-মেয়ে নে দেখবি, ছন্দা তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই ব্যাপারটি আজো হয়ে উঠেনি। না অন্য কোন মেয়ের প্রতি দুর্বলতা নয়। প্রথম প্রথম আমার অফিসের সহকর্মীকে নিয়ে ও খুব খ্যাপাত কিন্তু দিনে দিনে সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলল। আমার ব্যাপারে কি ও উৎসাহ হারিয়ে ফেলল নাকি? আজকাল তাই দেরিতে করে ফিরি। রাতে ফিরে দেখি টেবিলের উপর খাবার রাখা আছে। আজকাল ছন্দার সাথে আমার কথোপকথন খুব কমতে শুরু করেছে। কাজের কিংবা সংসারের টুকটাক ব্যবহারিক কথাবার্তা ছাড়া আর কোন কথা হয় না। অথচ আজো আমি ছন্দাকে ভালোবাসি। আজকের এই ছন্দার সাথে সেই দিনকার ছন্দাকে মিলাতে পারি না। যে ছন্দা আমার জন্য একদিন আমার হাত ধরে তার বাড়ি ছেড়েছিল। অবশ্য বাড়ি পালানোর কোন কারণ ছিল না। কেননা আমাদের বিয়েতে ওর বাড়ির কিংবা আমার বাড়ির কারোর আপত্তি ছিল না। কিন্তু একদিন হঠাৎ করে সে এসে হাজির। সেদিনেই নাকি তাকে বিয়ে করতে হবে। আমার তো আক্কেল গুড়ুম। কোন ঝামেলা যেখানে নেই, সেখানে সে কেনই বা বাড়ি পালানোর কথা বলছে। সেদিনেই কাজী অফিসে বিয়ে। বন্ধুর বাসায় বাসর রাত। এবং সেই রাতেই সে কারণটা বলল। সেদিন ছিল আমার জন্মদিন। জন্মদিনে কি উপহার দেওয়া যায় সেটা সে বুঝতে না পেরে এই অ্যাডভেঞ্চারের আয়োজন। আমি অবশ্য মনে মনে তার সেই পাগলামিতে মজাই পেয়েছি। এইরকম হাজার রকমের তার অ্যাডভেঞ্চারের জন্য আমাকে বল হতে হয়েছে। কিন্তু আজকালকার সেই ছন্দাকে মিলাতে বিষণ কষ্ট হয়।
কিন্তু একদিনের ঘটনা দিয়ে আমাদের দাম্পত্য জীবনে এক বিরাট মোড় নিল। আমি তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
একদিন সাত সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে রেডি হচ্ছি। এমনি সময় কলিংবেল বেজে উঠলো।
: ছন্দা দেখতো কে এল।
: কে আবার হবে এই সাত সকালে। দেখ পেপার দিয়ে গেল। : আহা একটু দেখনা। কলিংবেলটা তো বেজে চলছে।
: আমি শাড়ি পড়ছি, তুমিই দেখ। : আমি শেভ করছি।
দরজা খুলে দেখি একটা বাক্স পড়ে রয়েছে। অথচ কাউকে সেখানে দেখলাম না। বাক্সটার গায়ে আমাদের ঠিকানা লেখা। অফিসে যাওয়ার ব্যস্ততায় আর খুলে দেখা হল না। অফিস থেকে ফিরে এসে বাক্সটা খুলে দেখি একটা টিভি ও সাথে একটি ভিডিও গেম। হয়তো কোন বন্ধু অবাক করে উপহার দিয়েছে। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারলাম না। এত দামি উপহার কেই বা দেবে। আমার চেনাশোনা তেমন কোন বড়লোক বন্ধু নেই যে কিনা আমাকে এত বড় একটা উপহার নির্দ্বিধায় দেবে।
টিভিটি সেট করে দেখলাম সেটি সাধারণ কোন টিভি নয়। শুধুমাত্র ভিডিও গেমই তাতে চালানো যাবে। ভিডিও গেমটা শুরু করার সাথে সাথেই দেখলাম সেখানে লেখা উঠলো "বাক্সবন্দী মেয়ে"। কখন ছন্দা এসে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। বাচ্চাটিকে দেখে ও বলে উঠলো
: কি সুন্দর বাচ্চাটি দেখেছ? : এটা একটা সাধারণ ভিডিও খেলা।
: আচ্ছা বাচ্চাটি ছেলে না মেয়ে। : বুঝতে তো পারছি না।
পাশে অনেকগুলি সুইচ, যেখানে লেখা আছে দোলানো, দুধ খাওয়ানো ইত্যাদি। ছেলেবেলা থাকতেই আমি ভিডিও গেম খুব একটা পছন্দ করতে পারতাম না। আর এই বয়সে এসে এগুলি খেলার কোন মানেই হয় না। আমি খেলাতে কোন উৎসাহ পেলাম না। কিন্তু কে এই উপহার দিল? কেনই বা দিল? এর উত্তরগুলি আমার মাথায় খেলতে লাগল।
আমি টিভির পাশ থেকে চলে আসতেই দেখি ছন্দা ওটি নিয়ে বসল। : কি যে মজা ওতে পাচ্ছ তা বুঝতে পারছি না।
: দেখ দেখ আমি দোলনায় দোল দিলেই বাচ্চাটি কি আরাম করে চুপচাপ মেরে থাকছে। : এটা একটা সাধারণ খেলা।
: কিন্তু দেখ বাচ্চাটা যেন আমাদের দেখতে পাচ্ছে। কি সুন্দর করে বাচ্চাটি আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।
আমি ব্যাপারটিতে খুব একটা পাত্তা দিলাম না। কিন্তু কয়েকদিনেই টের পেলাম যে ছন্দা ভিডিও গেমটি নিয়ে বিষণ মেতে আছে। একদিন রাতে উঠে দেখি বাচ্চাটি কাঁদছে। আর ছন্দা তার কান্না থামানোর জন্য কি ভীষণ ব্যস্ত। মনে হচ্ছে সত্যিকারের এক মা কি সহানুভূতি নিয়ে তার বাচ্চাকে আদর করছে। এই রকম মাঝ রাতেই ইদানিং ছন্দা বাচ্চাটিকে নিয়ে ব্যস্ত আছে। কয়েকদিন পরে একটা ঘটনা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। অফিস থেকে ফিরে দেখি ছন্দা এক পালা বই নিয়ে টিভির সামনে বসে আছে। : কি ব্যাপার কি করছো?
: মেয়েটির নাম ঠিক করছি। : মেয়ে কিভাবে বুঝলে
: সে তুমি বুঝবে না।
কিন্তু সাধারণ একটা ভিডিও খেলার মেয়ের জন্য বাজার থেকে নামের বই কিনে নিয়ে আসার কোন মানেই আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। ব্যাপারটি নিয়ে ছন্দা খুব বেশি বাড়াবাড়ি করছে। পরের দিন জানতে পারলাম যে ছন্দা মেয়েটির নাম ঠিক করেছে পলি। এই অদ্ভুত নাম সে কোন বই থেকে পেল তা বুঝতে পারলাম না। আরো বেশি অবাক হলাম যেদিন দেখলাম ছন্দা চাকরিটি ছাড়লো। ও বললো বাচ্চা মানুষ করতে হলে তো আর চাকরি করা চলে না। ও যে ব্যাপারটিকে কত গুরুত্বের সাথে নিতে শুরু করেছে তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলাম।
এই ভাবে অনেকদিন কেটে গেল। এর মধ্যে পলি অনেক বড় হয়েছে। ও এখন হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। যদিও আমার কাছে তা সাধারণ একটা খেলা ছাড়া আর কিছুই নয় অথচ তা ছন্দা মানতে রাজি নয়। দেখা গেল ছন্দা ওর জন্য মহা ব্যস্ত। কোন পোশাকটি পড়ালে ভালো হয় কি খাওয়ানো যায় তা নিয়ে সে মহা চিন্তায় চিন্তিত। তবে ব্যাপারটি খুব বাড়াবাড়ি রকমের হল এর পরের এক ঘটনায়। একদিন ও কেক নিয়ে হাজির। না আমার জন্মদিন নয়। পলির জন্মদিন উপলক্ষে। আমরা দুজনে মিলে পলির জন্মদিন পালন করলাম। ছন্দাকে খেলাটি থেকে অনেক বার নিষেধ করেও থামাতে পারলাম না। পলিকে নিয়ে সে খুব ব্যস্ত সময় কাটাতে লাগলো। এতদিনে ছন্দাকে আবার নতুন ভাবে পেলাম। পলির কারণে আমাদের দুজনের দূরত্ব অনেক কেটে গেল।
এর পর একদিন পলি হাটতে শিখলো। সেই দিন ছন্দার কি মহা উৎসাহ। ছন্দা ওকে সাবাস দিতে দিতে চিৎকার করতে লাগলো। মজার ব্যাপার হল অজানে আমিও পলিকে মহাউৎসাহ দিতে থাকলাম। আমার খেয়ালই ছিল না যে এটি একটা সাধারণ খেলা। যখন পলি প্রথম হাটতে শিখলো সেদিন ছন্দা খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আবেগে আমরা পরস্পর পরস্পরের কাছে এলাম। হোক না তা সাধারণ খেলা কিন্তু তার বদৌলতে এতদিনের ছন্দাকে কাছে পেলাম।
এরপর একদিন অবাক করার মত ঘটনা দেখে আমি নিজেই হতবাক হয়ে গেলাম। ছন্দা পলির সাথে কথা বলছে। আর আমি অন্য একটা সোফায় বসে পেপার পড়ছি। হঠাৎ করে শুনি "মা"। ছন্দা চিৎকার করে বলছে দেখলে দেখলে আমার মেয়ে আমাকে মা বলছে। ব্যাপারটাতে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। এই অবাক ঘটনা কিভাবে সম্ভব হয়? কিন্তু আরো অবাক হয়ে যেতে হলো যেদিন আমি শুনলাম "বাবা"। শব্দটা কতবার শুনেছি কিন্তু পলির কণ্ঠে যখন শুনলাম তখন এই অদ্ভুত অনুভূতি আমার শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেল। ঠিক কি ধরনের তা বোঝাতে পারব না। এই দুটি অক্ষর কত গভীর ভাবে আমাকে হানা দিচ্ছে তা বোঝাতে পারব না। ব্যাপারটি যে সেই ভিডিও গেমের একটি অংশ তা আমি নিজেই ভুলে গেলাম।
এখন শুধু ছন্দাই নয়। আমিও খেলাটিতে বেশ মজা পেতে লাগলাম। আমি তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে আসি। অফিস থেকেই ফিরে এসে ছন্দা মুখে শুনতে হয় আজ আমাদের মেয়ে নতুন কি করলো। মেয়েটা একটু একটু করে কথা বলতেও শিখছে। আমাদের দিনগুলি সুখে কাটতে লাগল। কিন্তু একদিনের ঘটনাটিতে সব কিছু আবার এলোমেলো করে দিল।
কয়েকদিন ধরে পলির শরীর খারাপ ছিল। টিভির পর্দায় ভেসে উঠলো ওর শরীরের তাপমাত্রা। পাশে লেখা ছিল হাসপাতাল। আমি হাসপাতালের সুইচটা চেপে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। আমার পাশে উৎকণ্ঠায় ভরা ছন্দা। ও বসে বসে কাঁদছিল। আমি বললাম দেখ ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু কয়েকদিনেও পলির শরীর ভালো হল না। আমি অফিস থেকে ফোন করে পলির শরীরের খবর নিতে লাগলাম। অফিস থেকে ফিরে দেখি মন খারাপ করে ছন্দা বসে আছে। কয়েকদিন ধরে ছন্দা ঠিকমত ঘুমাচ্ছে না বলে ওর শরীরটা খারাপ হয়ে গেছে। আমি ওকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে আসলাম। ঠিক আছে আমি পলির পাশে আছি। আমি দেখছি তুমি একটু বিশ্রাম নাও। তোমার বিশ্রাম নেওয়ার দরকার আছে।
পলির চিন্তায় আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বসে থাকি। আজকাল আমার কাছে পলি সাধারণ ভিডিও গেমের কোন অংশ নয় ওকে যেন আমার নিজেরই মেয়ে বলে মনে হয়। জানি না আমি পাগল হতে চলেছি কিন্তু আমি আমার অনুভূতিকে অস্বীকার করতে পারলাম না।
পরের দিন পলির অবস্থা উন্নতির দিকে এগুতে থাকলো। ছন্দা কয়েকদিন মরার মত ঘুমাল। ওর বিশ্রামের খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এর পরের ঘটনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। যেদিন পলি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল। ছন্দা তার নিজের ঘরে পৌঁছালো তখনই ঠিক তখনই টিভিতে ভেসে উঠলো "গেম ওভার"।
আমাদের দুজনের মাথায় বাজ পাড়লো। এটা যে সাধারণ একটা গেম তা আমরা ভুলেই বসে ছিলাম। গেম হলেই যে গেম ওভার হবে অন্যান্য সাধারণ গেমের মতই তা ভুলেই গিয়েছিলাম। ব্যাপারটির জন্য আমরা দুজনে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। যে পলিকে ছন্দা কি গভীর ভালোবাসা দিয়ে বড় করে তুলেছে দিনে দিনে তাকে কথা বলা শেখিয়েছে সেই পলি যে একটা সাধারণ খেলার অংশ তা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। অথচ ব্যাপারটা কাউকে বলতে পারছি না। কেননা সবাই হাসতে ভাববে আমরা দুজনাকেই পাগলা কুকুরে কামড়িয়েছে। অথচ বাস্তবকে মেনে নিতে বড় কষ্ট হচ্ছে। আমার থেকে ছন্দা ভীষণ ভেঙে পড়েছে। ওকে কি বলে সান্ত্বনা দিব তার ভাষা আমার জানা নেই। ছন্দা কয়েকদিন ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করছে না। আমি ওকে জোর করে খাওয়াতে গেলে আমার উপর ক্ষেপে যাচ্ছে। বলছে কেন তাকে আমি ওই সর্বনাশা গেম খেলতে নিষেধ করিনি। কিন্তু আমিও কি নিজের অজানে খেলাটাকে সত্যি ভেবে বসে থাকিনি। আজো আমার কানে ভেসে আসে পলির ডাক "বাবা"। কি মধুর কি সুন্দর সেই ডাক। তা ভুলব কেমন করে।
ছন্দাকে বোঝালাম দেখ সেই গেমের কল্যাণে আমরা দুজনাকে কাছে পেলাম। সেই গেমের ফলে আমাদের সময় কিন্তু নেহাত মন্দ কাটেনি। এস সেই সুন্দর স্মৃতিগুলিকে নিয়ে আমরা বাঁচে থাকি। একদিন সত্যিকারের পলিকে আমরা আমাদের মাঝে পাব।
: সত্যি বলছো পলি আমাদের কাছে আসবে। সত্যি বলছো। দেখনা ওই গেমটা কারা বানিয়েছে। ওদের সাথে যোগাযোগ করে দেখনা।
ওকে কিভাবে বোঝাব তা আমি অনেক আগেই চেষ্টা করেছি। কিন্তু গেমের কিম্বা টিভির কোথাও কোন কোম্পানির নাম লেখা নেই। কিন্তু সান্ত্বনা দিয়ে বলা ছন্দাকে কথাটি যে সত্যি হবে তার জন্য আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না।
পরের দিন ছুটির দিন ছিল। আলসেমি করে দেরি করে সকালে উঠা। ছন্দা খুব কাঁদছে। গতকালকে একটুকও ঘুমায়নি। আমি ওকে আর কোন কথা বলে সান্ত্বনা দিতে পারছি না। আমারও মনটা খারাপ। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনার কথা বলতে যেয়ে আমারই কান্না পাচ্ছে। ভোর হলে অবশেষে ছন্দা ঘুমাল। আমি ওর গায়ে চাদর টেনে দিলাম। কি গভীর ভালোবাসা দিলে একজন মানুষ এমন হয়ে যেতে পারে। অথচ তার জন্য ছন্দা কিংবা আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
সকালে কলিংবেল বাজলো। দরজা খুলতেই দেখি এক খুব বৃদ্ধ বুড়ো লোক দাঁড়িয়ে আছে।
: আমি প্রফেসর মনির বলছি। একটু কি আমি আপনার সাথে কথা বলতে পারি।
সাদা লম্বা দাড়ি। হঠাৎ করে দেখলে রবীন্দ্রনাথ বলে ভুল হবে। তার পিছনে আরেকজন দাঁড়ান। সম্ভবত উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট ধরনের কেউ হবে। হাতে ব্রিফকেস। আমি উনাদের ভিতরে বসতে দিলাম। : আমি প্রথমে আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। পলিকে নিয়ে আপনাদের সুন্দর দিনগুলিকে...
: কিন্তু আপনারা কিভাবে পলির কথা জানেন? : আমার কথা পুরোপুরি শুনলে হয়তো আমাকে বুঝতে পারবেন।
আসলে পলি এক অনাথ মেয়ে। আমরা তাকে লালন পালন করার দায়িত্ব পাই কিন্তু তাকে একজন বাবা-মা র হাতে তুলে দিতে চাই। আমাদের ওই ভিডিও গেমটি আমরা নির্মাণ করেছি। কিন্তু এর পিছনে সম্পূর্ণ চরিত্রটি সত্যি। আপনারা যে পলিকে মানুষ করেছেন যে ভালোবাসায় আপনার স্ত্রী পলিকে দিনে দিনে গড়ে তুলেছে এই রকম ভালোবাসা পলির জন্য খুবই জরুরি। আপনাদের সত্যিকারের ভালোবাসা কথা বুঝতে পেরে আমরা পলিকে নিয়ে এসেছি।
আমাদের কথাবার্তার শব্দে ছন্দা ঘুম থেকে উঠে এসেছে।
: কোথায় পলি আমার মেয়ে কোথায়।
পরে দরজা দিয়ে যে ছোট্ট মেয়েটি এল সে আমাদের চেনা পলি। যে পলিকে আমরা নির্ভেজাল ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলেছি। সেই পলি আজ আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছন্দা দৌড়ে পলিকে তার কোলে তুলে নিল। এতদিনের খালি হয়ে থাকা ছন্দার কোলটি পূর্ণ হল। এখন আর আমার কাছে দিনগুলিকে দীর্ঘ বলে মনে হয় না।
তারিখ: ১০ মে ২০০১