আমরা কি সুদক্ষ নেতার সংকটে?
ছেলেবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় বাবা বলতেন, "ফাস্টবয়ের পাশে বসবি?" কেন বলতেন তা সেই সময় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। পরে বড় হয়ে বুঝেছিলাম, ফাস্টবয়ের পাশে বসে যদি তার দেখাদেখি আমারও উন্নতি হয়। কতটুকু উন্নতি হয়েছে তা বলতে পারব না, তবে এইটুকু বলতে পারি যে, একজন ভালো বন্ধুর কোন জুড়ি নেই। সেটা সেই ছেলেবেলার ঘটনা ছাড়িয়ে জাতির বেলাতেও একই জিনিস দেখা যায়। আমরা জাতিগতভাবে কাউকে কি পাশাপাশি রেখে, তাকে দেখে কিছু শিখতে পেরেছি?
আমাদের পাশের দেশ ভারতের সাথেও আমাদের সম্পর্ক খুব একটা সুবিধার নয়। ভারতের বড় ভাইসুলভ ব্যবহারে আমরা কিছুটা অতিষ্ট। ভারতের কাছ থেকে, শুধুমাত্র তাদের অনুষ্ঠান দেখে, আমরা কিছু অনুষ্ঠান তৈরি করতে শিখেছি মাত্র। অথচ আই.টি (কম্পিউটার ইন্ডাস্ট্রি) এর ক্ষেত্রে তেমন একটা অনুসরণ করে কিছু শিখতে পারিনি। ঢাকায় ভারতের কয়েকটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণের স্কুল খোলা বাদ দিলে আমরা তেমন একটা ভালো অবস্থানে আসিনি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আমাদের কম্পিউটার ইন্ডাস্ট্রি খুব একটা বড় লক্ষ্য নিয়ে এগুতে পারছে না। আমাদের সিংহভাগ ভালো ভালো প্রোগ্রামাররা দেশে কাজ না করতে পেরে, হতাশ হয়ে পরিশেষে পশ্চিমা দেশে যেয়ে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে ফেলেছেন।
মালয়েশিয়ার উদাহরণ
আমি আজ আপনাদের ভারত নয়, একটু দূরের দেশ - "মালয়েশিয়ার" উদাহরণ আপনাদের দরবারে পেশ করব। ১৯৮১ সনের পর থেকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মাহাতির ইতিহাসের পাতায় জায়গা নিতে যাচ্ছেন পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে। একটি জাতির উত্থানে একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজন। আমাদের মত অন্যের দয়ায় চলে, আর অন্যের কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে যে একটি দেশের উন্নয়ন হতে পারে না তা মালয়েশিয়ার ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়। প্রাচীনকালের উপনিবেশিকের যুগ হয়তোবা শেষ হয়ে গেছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলি আমাদের মত ছোট দেশগুলিকে তাদের অর্থনৈতিক উপনিবেশিক দেশে পরিণত করছে। আমাদের যে কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, দাতা দেশগুলি এতে নাখোশ হয় নাকি?
অথচ এই রাষ্ট্রপ্রধান কিন্তু কোন ইউরোপ কিংবা আমেরিকাকে অনুসরণ করেননি। মাহাতির বেছে নিয়েছিলেন, জাপানকে উদাহরণ হিসাবে নিয়ে। মাহাতির ইতিমধ্যেই জাপানে প্রায় ৫০ বারের মত ঘুরে গেছেন। জাপানের অনেক কিছুই তিনি অনুকরণ করে তিনি মালয়েশিয়ায় প্রচলন করেছিলেন। জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে দেখেছি মালয়েশিয়া থেকে অনেক ছেলেমেয়েরা জাপানে মালয়েশিয়ার সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়তে আসছে। তারা এখানে পড়াশুনা শেষ করে মালয়েশিয়ায় ফিরে যাচ্ছে এবং সেখানকার জাপান-মালয়েশিয়ার যৌথ কম্পানিগুলিতে কাজ করছে। এই জাপানের মত বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির দেশের মত ভালো বন্ধু মালয়েশিয়া পেয়েছিল বলেই আজকে মালয়েশিয়া এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। এই কথা বলছে পৃথিবীর বড় বড় অর্থনীতিবিদরা।
মাহাতির কিন্তু পশ্চিমা দেশের দেওয়া তত্ত্ব অনুযায়ী দেশকে চালাননি। মাহাতির মনে করেন যে, আমাদের এশিয়ার অবস্থা পশ্চিমা দেশগুলির মত নয়। এশিয়ার উন্নয়ন নিয়ে এশিয়াকেই ভাবতে হবে। ৭৫ বছর বয়সি এই রাষ্ট্রনায়ক কিন্তু বৈশ্বিকীকরণের বিরুদ্ধে। বৈশ্বিকীকরণের পূর্বে দেশকে একটা সমতা অবস্থায় এসে তবেই বৈশ্বিকীকরণের কথা ভাবতে হবে। বৈশ্বিকীকরণের মাধ্যমে সবচেয়ে লাভবান হয় বৃহৎ দেশগুলি। বড় বড় কম্পানিগুলির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ছোট কম্পানিগুলি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না। খোলা বাজারের নীতির মাধ্যমে বৃহৎ দেশগুলি ক্ষুদ্র দেশগুলিতে তাদের বাজার স্থাপনের সুযোগ পায়।
মাহাতির কিন্তু অত্যন্ত স্বাবলম্বনে বিশ্বাস করেন। তার লেখা বইয়ে তিনি লিখেছেন যে একটি জাতিকে এগিয়ে আসতে হয় সেই জাতির সচেষ্টায়। মাহাতির একবার সাক্ষাৎকারে কোরিয়ার হুন্ডাইকে উদাহরণ হিসাবে বলেছিলেন। এই কম্পানিটির ৮০% শেয়ার পশ্চিমা দেশের এবং মাত্র ২০% শেয়ার কোরিয়ার, ফলে এই বৃহৎ কম্পানিটি কিন্তু কোরিয়ার গর্ব হতে পারেনি। আমরা তো এখন খোলা বাজারের অর্থনীতি নিয়ে হৈ চৈ করছি। কিন্তু আমাদের মাহাতিরের কথা ভুলে গেলে চলবে না।
আমাদের নেতাদের অবস্থা
আমাদের দেশের নেতা/নেত্রীগণ জাপানে বেশ অনেকবার ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু সাথে আসা কিছু লোকদের এখানে অবৈধ থাকার সুযোগ দিয়ে, হোটেলে বিল বাকি রেখে তারা পালিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, কিংবা পত্রিকায় বিনিয়োগকারীদের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে আকর্ষণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এভাবে যে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবসায়ীদের আকর্ষণ করা যায় না তা অর্থনীতি বোঝেন না এমন যে কেউই বুঝবে।
অথচ আমরা কিন্তু জাপানকে খুব ভালো বন্ধু হিসাবে মালয়েশিয়ার মত পেতে পারতাম। এখন জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা একটু নাজুক ধরনের কিন্তু আজ থেকে ১৫ বছর আগে জাপান যখন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য দেশে তার কম্পানিগুলির শাখা খুলছিল, তখন কিন্তু আমরা সেই সময় চুপচাপ বসে ছিলাম। আমাদের ভুল নীতির কারণে আজ আমরা ক্যাফকো নিয়ে বিপাকে আছি।
গ্রামীণ অভিজ্ঞতা
সেবার গ্রামে কিছু জাপানিজরা আমাদের গ্রাম দেখতে গিয়েছিল। প্রথম প্রথম গ্রামবাসীরা বিদেশীদের দেখে বেশ অবাক। কিভাবে তাদের আপ্যায়ন করবে, কি খেতে দেবে ইত্যাদি সমস্যায় চিন্তিত। কিন্তু কয়েকদিন পরেই সবাই বুঝতে পারলো যে, এই জাপানের সাথে আমাদের কিন্তু অদ্ভুত কিছু মিল আছে। আমরা দুই জাতিই কিন্তু খুব ভীষণভাবে ভাত পছন্দ করি। জাপানিজরা তিন বেলা ভাত খায়।
জাপানেরও আমাদের মত অভ্যন্তরীণ কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একদম ভেঙে যাওয়া এই দেশটি যেভাবে অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ হিসাবে গড়ে উঠেছে আমরাও কিন্তু সেইভাবে জাপানকে অনুকরণ করে সামনে এগিয়ে যেতে পারি। সেবার এক জাপানিজের বাসায় থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। রাতের খাবারের পর আড্ডা মারতে বসে, আমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, "কিভাবে আপনারা এতদূর এগিয়ে আসতে পারলেন?" উত্তরে সেই জাপানিজ বলেছিলেন, "আমাদের কিছুই ছিল না। আমরা শুধু কাজ আর কাজ করতাম।" সেই কঠোর পরিশ্রমের জাতির কাছ থেকে কিন্তু আমরা অনেক কিছুই শিখতে পারি।
অনেকেই বাংলাদেশীদের অলস জাতি বলে থাকেন। আমি কিন্তু সেই সাথে অমত। কিছু কিছু অলসতা অবশ্যই আমাদের আছে। কিন্তু গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক যে কষ্ট করে ফসল ফলায়, তাকে যদি অলস বলে ধরে তবে তাকে না খেয়ে মরতে হবে।
মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান
আবার মালয়েশিয়ার উদাহরণ নিয়ে কথা বলছিলাম। সেবার কুয়ালালাম্পুরে যেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বিশাল বিশাল অট্টালিকা দেখে মনেই হয়নি যে এটা এশিয়ার কোন দেশ। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মত তারা বেশ অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ হিসাবে বড় হয়ে উঠছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আমরা আর এই মালয়েশিয়া প্রায় একই কাতারে ছিলাম। কিন্তু এখন আমরা সেই কথা বলতে পারব না। একজন নেতার সূক্ষ্ম নেতৃত্বের মাধ্যমে যে একটি দেশ সামনে এগিয়ে যেতে পারে মালয়েশিয়া তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
প্রশ্ন - আমাদের দেশে কি এখন এই রকম নেতার সংকট চলছে?
নাগোয়া, জাপান, ২৬ জুলাই, ২০০১