মশিউরের খেরোখাতা

আমরা আর কত বছর প্রযুক্তি ব্যবহারকারী থাকব? নিজেরা কি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করব না?

বিশেষজ্ঞ কলাম

ড. মশিউর রহমান


এই বছরের শুরুতে প্রবাসজীবনের অধ্যায় শেষ করে বাক্স পোটলা নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এলাম। বাংলাদেশে আসার আগ থেকেই শুনছিলাম যে, বাংলাদেশের নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারে মোবাইল টেলিফোন কোম্পানিগুলো ভালো করছে। শুনে আশান্বিত হয়েছি এই ভেবে যে, যাক অবশেষে প্রযুক্তির একটি সেক্টরে হলেও বাংলাদেশ ভালো করল। কিন্তু বাংলাদেশে কিছুদিন থাকার পরেই সামগ্রিক চিত্র দেখে হতাশ হয়ে গেলাম। যেহেতু এই সেক্টরটিতে প্রচুর অর্থ ঘুরছে এবং ক্রেতাও বেশি তাই আশা করেছিলাম যে, আমরা নিজেরাই মোবাইল ফোন তৈরি করতে পারব। অন্তত তৈরি করতে না পারলেও এর বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখতে পারব। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা ব্যবসায়ীরা সেই জিনিসটি করতে পারিনি। আমাদের দেশটিতে বিভিন্ন নামকরা ব্র্যান্ডের বাজারে রূপান্তরিত করেছি। কিন্তু আমরা ভারতীয়দের মতো যদি সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে পরতাম তবে এই ভুলটি করতাম না। বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছিল আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধুর সাথে। উনি বলছিলেন, আরে ভাই আমরা কত দামেই বা তৈরি করতে পারব? কিন্তু চীনের তৈরি করা পণ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজারে টিকতে পারব না। আসলে সবই সম্ভব যদি সেই ধরনের Vision আমাদের সবারই থাকে। নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করে যারা তারা চান যেন আমরা আজীবন বিশ্বের বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকি। বাংলাদেশ দারিদ্র, ক্ষুদ্র ঋণ, এনজিও, অর্থনৈতিক সাহায্য ইত্যাদির দেশ হতে পারে কিন্তু এইখানে কোনোভাবেই যেন প্রযুক্তি তৈরি না হয়, কোনোভাবেই যেন বড় শিল্প গড়ে না উঠে সেই দিকেই চেষ্টা থাকে আমাদেরকে সহজশর্তে (!) ঋণ প্রদানকারী দেশগুলোর। তাই আমাদের দেশে প্রগতি এর মতো গাড়ি তৈরির প্রচেষ্টা ও উদ্যোগকে নষ্ট করে দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পড়ানোর কারণে বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়। তাদের সাথে কথা বলার পর আরও ভয়ানক চিত্র জানলাম। প্রযুক্তি সংক্রান্ত আমাদের দেশের সব বড় কোম্পানিগুলো ইঞ্জিনিয়াররা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারই করেন, কাউকেই research and development (R&D) করানো হয় না। কোম্পানিগুলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় পড়লে দুবাই, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া থেকে বিদেশী ইঞ্জিনিয়াররা আসেন সেই সমস্যা সমাধান করার জন্য। মূল সিস্টেমে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের হাত দেবার সুযোগ দেয়া হয় না। নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়াররা বিভিন্ন নেটওয়ার্ক শুধু মনিটরিং এর কাজ করেন মাত্র, ভেতরের কিছুই তারা জানেন না।

ইঞ্জিনিয়ার নয়, তারা সেলসম্যান

যে সমস্ত ইঞ্জিনিয়াররা বাংলাদেশের প্রযুক্তি সংক্রান্ত সেক্টরটিতে কাজ করেন ইঞ্জিনিয়ার না বলে বরং আমরা খুব বেশি হলে প্রযুক্তি জানা সেলসম্যান বলতে পারি। কিছুদিন আগে একটি মোবাইল কোম্পানি থেকে কিছু প্রযুক্তিবিদ আমাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন তাদের কিছু প্রযুক্তি আমাকে দেখাতে। বিজনেস কার্ডে দেখি লেখা রয়েছে ইঞ্জিনিয়ার। কথা বলে বুঝতে পারলাম ইঞ্জিনিয়ারিং নয় তাদেরকে খুব দক্ষ সেলসম্যান হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে। মূল সিস্টেম কিভাবে কাজ করছে তার সবই তার অজানা। কিন্তু সিস্টেমটি কিভাবে ব্যবহারকারীর জন্য সুবিধা এনে দিবে তার বর্ণনা দিতে পুরোদস্তুর এক্সপার্ট। আমার এক সহকর্মী আমার এই কথায় প্রথমে একটু আঘাত পেয়েছিলেন কিন্তু কিছুদিন পরে ই-মেইলে জানালেন যে সত্যিই যে ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ শিখার আশায় তিনি কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন তার কিছুই তিনি শিখতে পারেননি। অনেক বছর কোম্পানিতে কাজ করে একজন ভালো সেলসম্যানে রূপান্তরিত হয়েছেন। আমাদের আশে পাশের সব ইঞ্জিনিয়ারদেরই একই দশা। আমি মনে করি আমাদের দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এইরকম সেলসম্যান নয় বরং দেশের সমস্যাগুলো প্রযুক্তি দিয়ে সমাধান করতে পারবেন তেমন উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার এর খুবই প্রয়োজন।

এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি?

উপায় হলো আমাদের নিজেদের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দিকে নজর দিতে হবে। আমি মনে করি অন্য দেশের প্রযুক্তি হুবহু নিয়ে আসলেই চলবে না। আমাদের দেশের উপযোগী করে তোলার জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন ধরনের কাস্টোমাইজ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেয়া যায় মোবাইল রিচার্জ করার মতো ফ্লেক্সিলোড জাতীয় প্রযুক্তিগুলো। উন্নত বিশ্বে কেউ কখনও এই ধরনের ব্যবস্থার কথা ভাবতেই পারেন না। কিন্তু এই ধরনের মডেলগুলো আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য। আমি মনে করি আমাদের নিজেদের সমস্যা আমাদের নিজেদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দিয়েই সমাধান করতে হবে। আর আমাদের প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য হওয়া উচিত Serving the society through technology। এই ক্ষেত্রে Technology Incubator জাতীয় প্লাটফর্ম আমাদেরকে ভীষণভাবে সাহায্য করতে পারে। Technology Incubator হলো বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা একটি প্লাটফর্ম যা সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। এখানে কাজ করবে নবীন থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীরা। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনের জন্য অনেক প্রযুক্তি ভীষণভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। আর এই ধরনের Technology Incubator বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রযুক্তি সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে পারে। শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ করা যে কোনো জাতির জন্যই মঙ্গলজনক তা বুঝতে হবে। এমন কিছু উদ্যোগ নিম্নে দেখতে পারেন-


এই সমস্ত ক্ষেত্রে আমরা অনেক ক্ষেত্রে সরকার ও নীতি নির্ধারকদের উপর দোষ দিয়ে তা হতে মুক্ত হবার চেষ্টা করি। আসলে এটি root level থেকেই উঠে আসতে হবে। আমি অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে জানি যাদের বছরের শেষে ভালো লাভ হয় ও বেশ অর্থ উদ্বৃত্ত থেকে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই অর্থ ব্যবহৃত হয় ভোগের জন্য; পরিচালকদের পাজেরো, অকারণে বিদেশ ভ্রমণ, কিংবা খুব উদার হলে কর্মচারীদের ছোট ছোট বোনাসের ব্যবস্থা করে। কিন্তু কখনই সেই অর্থে research & development-এ ব্যবহৃত হয় না। কর প্রদানের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারগুলোকে উৎসাহিত করা হলে আমাদের দেশের জন্য ভালো হবে বৈ কি। আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছি যে, মোবাইল অপারেটরদেরকে তাদের লাভের একটি অংশ দেশে খরচ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখছি তা তাদের বিজ্ঞাপন, খেলাধুলায় স্পন্সর (যদিও এটি এক ধরনের বিজ্ঞাপন) করে তা ব্যয় করে, কিন্তু কখনই দেখি না তা তারা খরচ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে। তারা ভালো মতোই মনে করেন যত ইচ্ছে আমাদের সার্ভিস ব্যয় করে লাইলি-মজনুকে হার মানাও, আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু গবেষণা! সেটি করার কি দরকার? আমরা তো তোমাদের হাতে আমাদের সর্বোত্তম পণ্যটি দিচ্ছি।

আমরা জাতি হিসেবে যতদিন না বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দিকে মনোনিবেশ দিব, তত দিনই এইভাবে ব্যবহারকারী বা বিদেশী পণ্যের বাজার হিসেবেই পৃথিবীর কাছে সমাদৃত থাকব। নিজেদের স্বার্থেই সেটি থেকে আমাদের রক্ষা পেতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দিকে আমাদের সচেতনতা। এই হিনমন্যতার একটি দিক তুলে ধরছি পাঠকদের কাছে। আমাদের দেশে যখন কোনো খেলার আয়োজন করা হয় তখন স্পন্সর পেতে কোনো বেগ পেতে হয় না, কেননা সেখানে তার পণ্যের বিজ্ঞাপন হয় ও ব্র্যান্ডিং প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলা আয়োজন করার ক্ষেত্রে আয়োজকরা স্পন্সর পান না। এছাড়া আমাদের সমাজের অর্থবিত্ত মানুষেরা সমাজ সেবার জন্য মাদ্রাসা ও হাসপাতাল তৈরি করতে আগ্রহী, আমি কখনই শুনিনি যে, আমাদের কেউ প্রযুক্তির উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ সাহায্য করেছে।

আপনাদের কাছে আমেরিকার চিত্রটি তুলে ধরি। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতাম সেই মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ আসত মূলত দু'টি ক্ষেত্র থেকে। একটি হলো ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া স্টেট ও অপরটি হলো স্থানীয় জনগণের ডোনেশন দিয়ে। ডোনেশন দিয়ে চলত শুনলে ভাবতে পারেন যে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়টি কি গরীব ছিল? মোটেও তা নয়। স্থানীয় জনগণ মৃত্যুর পূর্বে উইল করে যেতেন যে, তার মৃত্যুর পরে সমস্ত অর্থ ব্যয় হবে কোনো একটি রোগের গবেষণার জন্য। ক্যান্সারের গবেষণার জন্য আমাদের গবেষণাগার ভালো অর্থ পেত। স্থানীয় লোকজনও ধর্মের জন্য অর্থ ব্যয় করত। মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মোড়ে মোড়ে আপনি খ্রীষ্টানদের চার্চ দেখতে পাবেন। কিন্তু তার পাশাপাশি তারা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্যও বেশ অর্থ ব্যয় করত। যা পরিশেষে তাদের সমাজেই ভূমিকা রাখত।

একইভাবে আমরা যদি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমরা নিজেরাও এগিয়ে আসি তবে সামগ্রীকভাবে আমরা বেশি লাভবান হবো। অনেকেই এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কি করল তার দিকে চেয়ে থাকেন। এটি রাষ্ট্রের কাজ, আমার মাথা না ঘামালেও চলবে। কিন্তু আমি দ্বিমত পোষণ করি। আমি মনে করি আমাদের অনেক সুন্দর উদ্যোগ ব্যক্তিপর্যায় থেকেই উঠে এসেছে। প্রথমে শুরু করেছিলাম মোবাইল কোম্পানির কথা বলে, সেই মোবাইল কিন্তু রাষ্ট্র থেকে উঠে আসেনি, সেই আশায় থাকলে আমরা আরও কয়েক যুগ পরে মোবাইল হাতে পেতাম। এই যে গার্মেন্টস শিল্প এতো শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠেছে তাও কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই। তাই আমি মনে করি আমাদেরকেই ভূমিকা পালন করতে হবে, কেননা সেটি করা সহজ। রাষ্ট্রকে দিয়ে কোনো উদ্যোগ নেবার কথা ভাবলে তা বাস্তব হবার আগেই আমি আপনি মরে ভূত হয়ে যাব। কিন্তু আমি কিংবা আপনি খুব সহজেই ছোট ছোট উদ্যোগ নিতে পারি।

তাই আমার পরামর্শ হলো-

  • যে সমস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে তারা নিজেরাই R&D সেকশন খুলতে পারে যেটি কোম্পানিটির ভবিষ্যত উন্নয়নে ভীষণ ভূমিকা পালন করবে। গার্মেন্টস শিল্পের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজনীয় গবেষণার কাজ করার জন্য এমন গবেষণা সেকশন খুলতে পারেন।

  • কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণাগার তৈরির ক্ষেত্রে জোর দেয়া উচিত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উৎসাহিত করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত।

  • টিভি চ্যানেলগুলোতে যেভাবে সেরা কণ্ঠ খুঁজে বেড়াচ্ছে, সেভাবে সেরা ক্ষুদে বিজ্ঞানী-ইঞ্জিনিয়ার খোঁজার প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারে।

  • পাড়ায় পাড়ায় বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করতে পারি।

  • দেশী প্রযুক্তির উদ্ভাবন করবার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারি।

  • আমাদের দেশের আনাচে-কানাচেতে কাপালি- এর মতো অনেক বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ রয়েছে যাদের আমরা খুঁজে বের করে উৎসাহিত করতে পারি। সামাজিকভাবে তাদের উৎসাহিত করা হলে সবাই উৎসাহিত বোধ করবে। আমরা আরও বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ পাব।

শুধুই পণ্যের ব্যবহারকারীই নয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও আমাদের জোর দিতে হবে এবং সেটিই আমরা পারব। যতদিন না আমরা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উন্নয়নে ভূমিকা রাখব ততদিন আমরা পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবেই রয়ে যাব।

mashiur.rahman@gmail.com


উৎস: টেকনোলজি টুডে, নভেম্বর ২০০৮, পৃষ্ঠা ১৬-১৭