মশিউরের খেরোখাতা

আমার নারা কোসেন

যখন ঘড়ির ঘন্টার কাঁটা রাত তিনটা হল। চোখটা ঘুমে কাতর, তখন আমার রিসার্চের কাগজ লেখা শেষ হল। পাশের রুমে উঁকি মেরে দেখি আমার সহপাঠি ওমাকি তখনও তার রিসার্চের শেষ পাতা লিখে যাচ্ছে। একদম কোণায় রয়েছে আমাদের কম্পিউটারের রুমটি। আমাদের পুরো ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে নোংরা রুম হিসাবে পরিচালিত। অথচ এই রুমটিতে অনেক রাত একা একা কম্পিউটারের সামনে বসে থেকেছি। মেঘলা দিনে প্রবল বৃষ্টির জন্য যখন ক্লাস ছুটি হয়ে গেছে, তখন নিজের রুমে বসে কবিতার বই পড়ার পরিবর্তে এই রুমে আমার হিরোশিমার বন্ধু কপোতের সাথে নেটওয়ার্কে চ্যাট করতাম। এই ভাবে অনেক আড্ডা মেরেছি। ওকে সবসময়েই অনলাইনে পেতাম। আগামীকালই আমাদের রিসার্চ কাগজ জমা দেওয়ার শেষ দিন। আর এভাবে এই রুমে আসা হবে না। কত স্মৃতি, কত মধুর কথা।

সেই রুমের ঠিক পাশেই রয়েছে আমার রিসার্চ রুমটি। আমার সাথে আমার আরও চারজন সহপাঠি সেখানে রিসার্চ করত। তবে আমার রিসার্চের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ আলাদা বলে কখনও কখনও সেখানে সবার সাথে দেখা হত।

ঠিক কোণায় রয়েছে আমার টেবিলটি। তার পাশেই আমার ইউনিক্স ওয়ার্কস্টেশনটি। এক বছর আগে, প্রথম এই রুমে আসার পরই, টেবিলের এক কোণায় বড় অক্ষরে বাংলায় আমার নামটি লিখেছিলাম। আমার জাপানি বন্ধুরা ওমন অক্ষর দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখত আর আমাকে অনুরোধ করত তাদের নামটি বাংলায় লিখে দেওয়ার জন্য। টেবিলটার উপর রিসার্চ সম্পর্কিত অনেক বই রেখেছিলাম। একটা গীতবিতানও রেখেছিলাম। গত পরশু থেকে এই টেবিলটি খালি হতে শুরু করেছে। আমাদের রিসার্চ প্রেজেন্টেশনের পর আর এখানে আসা হবে না।

আজ এত রাতেও পুরো ডিপার্টমেন্ট গমগম করছে। মনেই হয়নি এই গভীর নিশীথ রাতে সারা পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে আর আমি একা করিডোরে হাঁটছি। আজই শেষ দিন। চারিদিকে বিদায়ের সেনাহাজ বাজছে।

দোতালায় উঁকি মেরে দেখলাম বেশ হৈ চৈ। টিভি গেমে খেলা চলছে। আর তাদেরকে ঘিরে রেখেছে অন্যান্য বন্ধুরা।

ছাদে উঁকি মেরে দেখি, পরিষ্কার আকাশে ভরাট মেঘের মেলা। ছাদের এক কোণেই রয়েছে আমার সোলার প্যানেলটি। গত এক বছর আগে এটি বানিয়েছিলাম। আমার নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি করা। গত এক বছর ধরে সপ্তাহে তিন দিন করে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এই সোলার প্যানেলের কার্যকারিতা পরিমাপ করতাম। অনেক বৃষ্টির দিনে ভিজে ভিজে পরিমাপ করতে হয়েছে।

আজ রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফেলা আসা অনেক কথাই মনে পড়ছে। এই নারায় আমি আমার জীবনের সাড়ে তিন বছর কাটিয়েছি। আমার পরিবার পরিজন ছেড়ে আমার এই প্রবাস জীবনে। এই ছাদে বসেই আমি আমার প্রথম কবিতা সংকলন "বসন্ত" বের করি।


নারা, মার্চ ১৯৯৮