মশিউরের খেরোখাতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের ভয় কেন? - ৩য় পর্ব (২০২৪)

তারিখ: ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

গত পর্বে আলোচনা করছিলাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কেন আমরা ভয় পাচ্ছি। আমি পাঁচটি কারণ গত পর্বে বলেছিলাম। আজ আরো দুটি কারণ আমি শেয়ার করবো।

(৬) ব্যক্তিগত তথ্য: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিস্টেমের ভিতরে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যগুলি দুটি ভাবে ঢুকে যাচ্ছে। প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বিভিন্ন ধরনের ইন্সট্রাকশন বা কমান্ড দেবার সময় আমরা অনেক সময়ই ব্যক্তিগত এবং গোপন তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দিয়ে দিচ্ছি। দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার নিজস্ব ডাটাবেসের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং সেই সমস্ত সাইটগুলিতে ব্যাক্তিগত তথ্যও থাকতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিস্টেম যদি হ্যাক হয়ে যায় তবে আমাদের এই ব্যাক্তিগত তথ্যগুলি অন্যের হাতে পড়ে যেতে পারে যা আমাদের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার উদ্রেক এই ভয়কে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই মাইক্রোসফট এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষকের ৩৮ টেরাবাইট এর তথ্য লিক হয়ে যাবার খবর এক মারাত্মক নিরাপত্তাজনিত সমস্যা তৈরি করেছে । এছাড়া গুগল এর বার্ড এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ট্রেনিং করানোর জন্য জিমেইল ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনেকে প্রমাণ পেয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য কোন অনুমতি ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ব্যবহারকে এক মারাত্মক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

(৭) পরিবর্তনের প্রতি ভয়: মানুষ স্বভাবগতভাবে তার চারপাশের পরিবেশ যার সাথে সে অভ্যস্ত, আমরা যাকে কমফোর্ট জোন বলি, সেটির যে কোন ধরনের পরিবর্তনকেই ভয় পায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের ভবিষ্যতের জীবনকে ভীষণ রকমের পরিবর্তন করতে পারে, এবং সেই সম্ভাবনা যখন বাড়তে থাকে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মানুষের ভয় আরো বেড়ে যায়। আমাদের সামাজিক কাঠামো, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উপর আঘাত আনতে পারে, এটি ভেবেও আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভীত হচ্ছি।

প্রযুক্তি নিয়ে ভয় কিভাবে কাটাবো?

প্রযুক্তি নিয়ে যে কারণেই এই ভয় হোক না কেন, আমাদের বুঝতে হবে এই টেকনোফোবিয়া কোনো অপ্রতিরোধ্য বাধা নয়। সঠিক কৌশল সহ এটিকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা যেতে পারে। প্রযুক্তি নিয়ে এই ভয় কাটানোর সব থেকে ভালো পদক্ষেপ হল, এইসব প্রযুক্তিগুলি নিয়ে সচেতনতা এবং শিক্ষা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্বন্ধে আমরা সবাইকে যদি সঠিক শিক্ষা ও সঠিকভাবে সচেতন করতে পারি, তবে আমাদের মধ্যে এই সংক্রান্ত ভয়কে দূর করতে পারবো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ChatGPT-এর মতো সলিউশন সম্পর্কে সঠিক তথ্য এবং এটিকে পজিটিভভাবে কাজে লাগিয়ে আমরা কীভাবে উপকৃত হতে পারি তা আমাদের জানতে হবে। আমাদের জানা প্রয়োজন কীভাবে এটি কাজ করে, এর সম্ভাব্য সুবিধা এবং অপরদিকে এর সীমাবদ্ধতাগুলিও।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটানোর জন্য সবাই এই প্রযুক্তির মধ্যে স্বচ্ছতা আনার কথা বলছেন। যতটুকু সম্ভব অপেনসোর্স বা এর কোডগুলি উন্মুক্ত করা উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফটওয়্যার তৈরির প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাগুলিকে তাদের কাজের সম্পর্কে স্বচ্ছ হতে হবে। বিশেষত তথ্যগুলি কীভাবে ব্যবহৃত হবে, ব্যক্তিগত তথ্যগুলির গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা হবে সে সম্বন্ধে স্বচ্ছতা থাকা উচিত।

OpenAI কে অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখান হলেও, এর প্রযুক্তিগুলি কিন্তু অপেনসোর্স নয়। এলন মাস্ক বেশ কয়েকজায়গায় এটিকে অপেনসোর্স হিসাবে বললেও, তার কথার সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই বলে অনলাইনে তার অনেক সমালোচনা রয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ক্লোজড সোর্স, অর্থাৎ শুধু ডেভেলপাররাই এর কোডটি জানে। আর সেজন্যই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জাতীয় প্রযুক্তিগুলি যেন অপেনসোর্স হয় এবং মানবতার কাজে লাগে সেজন্য বেশ কিছু অপেনসোর্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিস্টেম তৈরি হচ্ছে, যার একটি লিস্ট আপনি এইখানে পাবেন।

টেকনোফোবিয়া কমানোর জন্য নৈতিক বিবেচনাগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবাধিকার এবং মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন এবং নৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই সংক্রান্ত ভয় কমাতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া জবাবদিহিতার সুস্পষ্ট নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা এবং এর অপব্যবহার রোধ করা। টেকনোফোবিয়া কাটিয়ে ওঠার মানে আমি বলছি না যে, এটি সম্পর্কে আমাদের উদ্বেগকে উপেক্ষা করতে হবে। বরং এই উদ্বেগগুলিকে চিহ্নিত করে সেগুলির সমাধান করা গুরুত্বপূর্ণ।

মানবজাতির বিকাশের জন্য এবং সামনে এগিয়ে যাবার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জন্য প্রয়োজন এবং এটি সম্বন্ধে আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অনিবার্য, এবং ChatGPT-এর মতো টুল সহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভয় পেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকের দূরে সরিয়ে রাখা নয়, এবং আমাদের এমন একটি সহাবস্থানের জন্য প্রচেষ্টা করা উচিত যা কার্যকরভাবে এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধাগুলিকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। এই ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান, শিক্ষা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে, এটির সাথে সম্পর্কিত ভয়গুলি প্রশমিত করার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মানব জাতি এগিয়ে যাবে - সেটিই আমার বিশ্বাস।