স্মৃতিচারণ: আমার জীবনে নদী ও সমুদ্র
আমরা বিভিন্ন কারণে নিজেদের অনেক সময়ই সৌভাগ্যবান মনে করি। আমার তো মনে হয় এই যে আমরা পৃথিবীতে এসেছি, এর জন্যই আমাদের সৃষ্টিকর্তা এর কাছে কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে পড়া উচিত। এই যে বাহিরে বাতাস বইছে, আমার হাতে তা আদর করে যাচ্ছে, মজার খাবার খাচ্ছি - সেই স্বাদ গ্রহণ করার ক্ষমতা পেয়েছি। এই যে চোখ দিয়ে নীল আকাশ দেখছি - এই তো এক মিরাক্কেল আমাদের প্রত্যেকের জীবনের জন্য। আমার মনে হয় আর কিছু না হলেও এই যে জীবন আমরা পেয়েছি। এই যে চোখ দিয়ে আপনি আমার এই লেখাটি পড়ছেন, এই চোখ দিয়ে দেখার জন্য হলেও আমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। যদি আমরা পৃথিবীতে না আসতাম, কিংবা কখন টুপ করে বিদায় নিতাম, তখন যতই আমরা হাজার ধন কাউকে দিই না কেন জীবনের এই স্বাদ আমরা গ্রহণ করতে পারবো না। আমার মনে হয় জীবনের এই স্বাদ গ্রহণ করবার মতন সৌভাগ্য আমাদের হচ্ছে বলেই আমাদের কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। অন্য যা কিছু কষ্ট আমাদের জীবনে আছে, তা বেমালুম ভুলে যাওয়া উচিত। এই আমার জীবনবোধ।
যে প্রসঙ্গে এই কথা বলছিলাম। এছাড়া আমি নিজেকে আরো কিছু কারণে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। তার অনেকগুলির মধ্যে একটি শেয়ার করবো। আমি যাযাবরের মতন এই দেশ এই শহর করে জীবনটা কাটিয়েছে। আদিম কালের যাযাবরের মতন তাবুতে হয়তো বাস করি না, তবে কিছুদিন পরবর আমার বাসস্থান পরিবর্তন না করলে আমার চুলকানি শুরু হয়ে যায়। আর এই কারনেই আজ পর্যন্ত আমি নিজের কোন বাড়ি করি নি। কিন্তু এই যাযাবর জীবনে একটি জিনিস খুব অদ্ভুত লাগে। আমি যখনই যেখানে গিয়েছি, আর কিছু না হোক আমি নদী কিংবা সমুদ্র পেয়েছি।
আমার পূর্ব পুরুষেরা ছিল রাজশাহির চর অঞ্চলে (পদ্মা নদীর চরে নরেন্দপুর নামে একটি গ্রাম আমাদের আদিবাস)। তাই পদ্মা নদীর সাথে কোথায় যেন এক নাড়ির টান। আমার জন্ম হয়েছে পদ্মা পাড়ে। হ্যা আমি রাজশাহীর - গোদাগাড়ির ছেলে। তারপরে ঢাকাতে আসলাম, সেখানে পেলাম বুড়িগঙ্গা নদী। বাসার পাশ দিয়ে সেই নদীতে বসে বাতাস খেতাম। ঢাকার মোহাম্মদপুরের তাজমহল এর পাশে শিয়া মসজিদের পাশে বসে নদী দেখতাম- তার পাশেই স্পিডবোডগুলি লাগান থাকতো। পড়াশুনা করলাম চারঘাটের মুক্তারপুর গ্রাম (রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ) - তার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে পদ্মা নদী।
এরপরে জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে চলে গেলাম টকিও শহরে। আমার সাথের কবির ভাইকে নিয়ে হাটতে বের হয়েছি, পাশ দিয়ে দেখলাম একটি নদী বয়ে গেছে। নদী আমাকে সম্ভাষণ জানাল। সেই নদীর পাশে বসেই হোমসিক (homesick, স্বদেশে ফেরার জন্য কাতরকতা) কে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি। আমার প্রিয় মানুষদের মুখচ্ছবি সেই নদীর মেঘের ছায়ায় দেখে কাটিয়েছি।
টকিও তে জাপানি ভাষা শিখে আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হল নারাতে। প্রথম দিন রাতে হাটতে বেরিয়েছি। ও—মা এইখানেও নদী। তোমিও নামের সেই নদীটি আমাকে টেনে নিল। সেই নদীর পাশে বসেই ছবি আঁকা ও কবিতা লিখতে লিখতে সময় কাটালাম।
এরপর ভার্সিটিতে ভর্তি হবার জন্য তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নিলাম। সাক্ষাতকারে আমার শিক্ষক জিজ্ঞাস করলেন কেন এই বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছ? আমি বললাম, আমার সারাটি জীবন কাটিয়েছে নদীর পাশে - এইবার আমি সমুদ্রের পাশে কাটাতে চাই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখলাম অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলির মধ্যেই এইটার খুব পাশেই সমুদ্র রয়েছে। তাই সমুদ্র কে প্রাধান্য দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে পছন্দ করেছি। সে শিক্ষক মনে হল আহত হলেন। আর কোন গুণই কি আমার চোখে পড়লোনা?
পরের ৬টি বছর এই সমুদ্রকে নিয়ে ডুবে গেলাম। তয়োহাসিতে ইকোবে (Ikobe) নামে একটি সমুদ্রতট ছিল। বন্ধুরা মিলে জোসনা উৎসব করা, BBQ করা, কবিতা আসর করা ইত্যাদি কত্ত কি? পরে ভার্সিটি যখন পাশ করে নাগোয়াতে চলে গেলাম- তখন সত্যিই এই সমুদ্রটার জন্য কেঁদেছি। স্মৃতিসরূপ, সেই সমুদ্রর পাশ থেকে একটি পাথর নিয়ে এনেছিলাম। মানুষ প্রেমিকার কাছ থেকে রুমাল উপহার নেয়, আর আমি একটি পাথর নিয়ে চলে গেলাম পিএইডি করতে।
ওকাজাকি শহরে যাবার পরে সেখানে পেয়ে গেলাম “ওতো (Oto)” নামে একটি নদীকে। তারপরে বিজ্ঞান নিয়ে ডুব দিয়ে সেই নদীর পাশে এসেই অবসাদের সময় গুলি কাটিয়ে দিতাম।
এরপরে পাড়ি দিলাম আমেরিকায়। ওয়েস্টভার্জিনিয়াতে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে সংসার শুরু করলাম। রাতে বের হয়েছি হাটতে। ও —মা ! এইখানেও নদী! হ্যা, সেখানে পেয়ে গেলাম ওহাইয়ো (Ohio) নদীকে। সেই নদীর পাশেই আমার নারীকে নিয়ে হাটাহাটি শুরু হল। নারীতো অবাক! মানুষের মদ-গাজা এর নেশা হয়। আর এর দেখি নদীর নেশা!
বাংলাদেশে বৌ এর সাথে পরিচয়, তাকে নিয়ে প্রথম দিন বের হয়েছি ডেটিং য়ে। কোথায়? পদ্মা নদীর ধারে।
আমাদের সংসারে আলো করে একটি ছেলে এল। তার দেখি ঘুমের সমস্যা। রাতে ঘুমাতে দেরী করতো। এক বন্ধুর পরামর্শে স্ট্রলার নিয়ে রাতে হাটতে বের হতাম। কোথায় আবার- ওই যে আমার ওহাইয়ো নদীর পাশে।
এরপরে আবার বাংলাদেশে। এই কিছুটা সময় নদী থেকে দূরে ছিলাম। কিন্তু বেরিয়ে পরতাম দিকবিদিক। খুলনা, কুমিল্লা, চট্রগাম, বগুড়া সব অন্যান্য অনেক জেলাতেই গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরতাম। ক্লান্ত হলেই বিশ্রামের জন্য গাড়ি থামাতাম। কোথায়? - নদীর পাশে।
তারপরে সিঙ্গাপুরে চলে এলাম। বাসা নিলাম। বৌ কে নিয়ে হাটতে বেরিয়েছি আশে পাশের জায়গাগুলি দেখার জন্য। ও -মা ! এইখানেও দেখি ছিপছিপে একটি নদী - নাম পান্ডান। দুই ছেলেকে নিয়ে সাইকেল নিয়ে কিংবা হাইকিং এ বেরিয়ে পড়ছি এই নদীর পাশে। বৌ কে সময় দিতে পারছিনা - চলে যাচ্ছি দুজনে মিলে সেই নদীর পাশে। খুনসুটি (পড়ুন আলোচনা) গুলি সেখানেই সেরে নিচ্ছি।
এইভাবে আমার জন্ম থেকে আজ অবধি আমি সব সময় নদী কিংবা সমুদ্রকে কাছে পেয়েছি। আর সেজন্যই মাঝে মধ্যে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান বলে মনে হয়। বার বার সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নিজেকে নুয়ে ফেলি। এই জীবনের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট ও না পাবার কষ্টগুলি ফিকে হয়ে নাই হয়ে যায় এইসব পাবার লিস্টের পাশে।
আপনারও কি এমন নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করার কোন বিশেষ কারণ আছে? শেয়ার করুন কমেন্টে - কি কারণে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন।
৫ জুন ২০২১, সিঙ্গাপুর