আমরা কোন উগান্ডার গণতন্ত্র চাই?

তারিখ নেই · 5 মিনিটের আনুমানিক পাঠ

একটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সংবিধানের পাতায় যতটা না বোঝা যায়, তার চেয়ে গভীরভাবে ধরা পড়ে সমাজের অভ্যাসে, শিক্ষার মানসিকতায় এবং ক্ষমতার ব্যবহারে। আমরা প্রতিদিন গণতন্ত্রের কথা বলি, নির্বাচন নিয়ে উত্তেজিত হই, টেলিভিশনে বিতর্ক দেখি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশ বদলের স্লোগান দিই—কিন্তু খুব কম মানুষই প্রশ্ন করে, আমরা জাত হিসেবে ভেতরে ভেতরে কী হয়ে উঠছি। গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে থাকে না; সে বাস করে নাগরিকের চরিত্রে। চরিত্র ভেঙে পড়লে, নির্বাচনও হয়ে ওঠে কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজন।

এই ভাঙনের ছবি আমরা সংখ্যায় দেখছি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৪৯তম। অর্থাৎ, দুর্নীতি এখন আর বিচ্যুতি নয়, এটি আমাদের ব্যবস্থার অংশ। বিশ্বব্যাংকের ‘Worldwide Governance Indicators’–এ একই চিত্র—আইনের শাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—তিন ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ বছরের পর বছর নিম্ন স্তরে আটকে আছে। এটি কোনো রাজনৈতিক শ্লোগানের বক্তব্য নয়, এটি তথ্য।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকালেই আরও একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সংসদের একটি বড় অংশের সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিকের নিচে অথবা অস্পষ্ট। ফলে সংসদ হয়ে ওঠে নীতিনির্ধারকদের সংসদ কম, ক্ষমতাধরদের সভাঘর বেশি। এখানে আইনপ্রণয়নের চেয়ে লেনদেনের হিসাবই বেশি দৃশ্যমান। গণতন্ত্র তখন প্রতিনিধিত্বের বদলে হয়ে ওঠে “প্রভাবের প্রতিযোগিতা”।

আমাদের সমাজের আরেকটি গভীর সংকট শিক্ষাব্যবস্থায়। ইউনিসেফ এবং ইউএনডিপির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১৫–২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে কার্যকর সাক্ষরতার হার কাগজে যতটা উজ্জ্বল, বাস্তবে ততটা নয়। PISA–জাতীয় আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ অংশগ্রহণই করে না—কারণ অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা প্রচুর গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি, কিন্তু খুব কম চিন্তাশীল নাগরিক। সনদের সংখ্যা বাড়ছে, দক্ষতার মান বাড়ছে না। শিক্ষা আমাদের মুক্ত করার বদলে অনেক সময় কেবল সার্টিফিকেটে বন্দি করছে।

এই অপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার ফল পড়ছে সমাজের মানসিকতায়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীকে নিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় ও সামাজিক ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবণতা উচ্চ। বাংলাদেশেও ধর্ষণ ও সহিংসতার ক্ষেত্রে “ভিক্টিম ব্লেমিং” সামাজিকভাবে অত্যন্ত প্রবল। বাংলাদেশ পুলিশ ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর হাজার হাজার নারী যৌন সহিংসতার শিকার হলেও মামলা হয় এর একটি সামান্য অংশে। অধিকাংশ ঘটনা নথিভুক্তই হয় না—কারণ লজ্জা, ভয় আর সামাজিক চাপ।

অর্থনীতির দিকেও আমাদের আত্মপ্রবঞ্চনা কম নয়। ২০২৪ সালের টিআইবি রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ দুর্নীতি ও অপচয়ের মাধ্যমে হারিয়ে যায়। খাদ্যে ভেজাল নিয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব রিপোর্ট বলছে, বাজারে বিক্রি হওয়া খাদ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ, আমরা শুধু গণতন্ত্র হারাচ্ছি না, আমরা স্বাস্থ্যও কিনছি বিষের দামে।

এই অবস্থার মধ্যে ধর্মীয় কুসংস্কার বিজ্ঞানকে ক্রমাগত পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শিক্ষিত শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বৈজ্ঞানিক বিষয়ের চেয়ে অলৌকিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাসের হার আশ্চর্যজনকভাবে বেশি। আমরা তখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে চন্দ্রযানের উৎক্ষেপণের চেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হলো অলৌকিক তত্ত্ব। যুক্তিকে আমরা পাঠ্যবইয়ে বন্দি করেছি, আর বাস্তব জীবনে মুক্ত করে দিয়েছি অন্ধ বিশ্বাসকে।

এই অন্ধ বিশ্বাস সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে রাজনীতিতে। হত্যার বিচার না হওয়া, দুর্নীতির তদন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়া, অপরাধীর পুনর্বাসন—এসব আজ আর খবরের শিরোনামও হয় না। কারণ আমাদের অস্বাভাবিক এখন “স্বাভাবিক” হয়ে গেছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ডাটাবেস অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রতিবছর শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, কিন্তু রাজনৈতিক জবাবদিহি নেই।

বুদ্ধিজীবীরা এখানে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে। অথচ তাঁদের একাংশ ক্ষমতার মুখপাত্রে রূপান্তরিত হয়েছেন। মিডিয়ার স্বাধীনতা সূচকে ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ বাংলাদেশকে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬৫তম স্থানে রেখেছে। অর্থাৎ, সত্য বলার জায়গাগুলো সংকুচিত হচ্ছে। যখন সংবাদমাধ্যম দুর্বল হয়, তখন মিথ্যা শক্তিশালী হয়।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের গণতন্ত্র আসলে কোথায়? আমরা ভোট দিই ঠিকই, কিন্তু আমরা নাগরিক হই না। আমরা আইন নিয়ে কথা বলি, কিন্তু মানি না। আমরা উন্নয়নের ছবি দেখি, কিন্তু নাগরিক অধিকার ছাড়া উন্নয়ন যে কেবল কংক্রিট—সে কথা বলি না।

একটি ব্যঙ্গচিত্রে দেয়ালে লেখা ছিল, “ডানে দেখুন, বামে দেখুন”—অবশেষে নিচে লেখা ছিল—“মানুষ চাঁদে গেছে, আর তুমি এখনো এখানেই বসে আছ।” এই বাক্য আজ আমাদের জাতীয় মন্ত্র হওয়া উচিত। আমরা প্রযুক্তি আমদানি করেছি, কিন্তু সভ্যতা আমদানি করতে পারিনি। আমরা সেতু বানিয়েছি, কিন্তু বিবেক বানাইনি।

আহমদ ছফা বহু আগেই আমাদের এই দ্বিচারিতার মানচিত্র এঁকে দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা ইউরোপ-আমেরিকার জীবনযাত্রা চাই, বাংলাদেশের দুর্নীতি রাখতে চাই, আর নারীর ওপর সৌদি আরবের কঠোরতা চাপাতে চাই। এই শ্রেণিবিভক্ত নৈতিকতা আমাদের রাষ্ট্রকে নয়, আমাদের চরিত্রকে ভেঙে দিচ্ছে।

তাই আজ প্রশ্নটা কেবল “আমরা কেমন সরকার চাই” নয়, প্রশ্নটা—“আমরা কেমন মানুষ হতে চাই।” নাগরিক, না অনুসারী? জিজ্ঞাসু, না অন্ধভক্ত? গণতন্ত্র কোনো দান নয়, এটি এক দীর্ঘ শৃঙ্খলা। এটি প্রতিদিনের অনুশীলন।

গণতন্ত্র ব্যালট নয়, গণতন্ত্র চরিত্র। আর যতদিন আমরা চরিত্র বদলাতে না শিখি, ততদিন এই রাষ্ট্র কেবল নতুন মুখে পুরনো ব্যর্থতার গল্পই বলবে।

ড. মশিউর রহমান

২ মে ২০২২