সিঙ্গাপুরে বাংলা স্কুলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা

তারিখ নেই · 4 মিনিটের আনুমানিক পাঠ

সিঙ্গাপুরে বাংলা স্কুলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা

২৫ শে ফেব্রুয়ারীতে বাংলা ভাষার দুটি স্কুলে এই বাংলা স্কুলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হলো। সৌভাগ্যবসত দুটি স্কুলের অনুষ্ঠানে যাবার সুযোগ হয়েছিল আমার।

সকালে গিয়েছিলাম বি.এল.সি.এফ. বা Bangladesh Language and Cultural Foundation এর বাংলা স্কুলে।  স্কুলের ভিতরেই ক্যান্টিনে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল তারা। ঘরোয়া হলে হবে কি খুব গোছানো অনুষ্ঠান ছিল। স্কুলের একটি ছেলে (নামটি কারো জানা থাকলে কমেন্টে জানিয়েন) এত সুন্দর করে একটি প্রবন্ধ পড়লো যে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। বাংলা স্কুলের দ্বিতীয় প্রজন্মরা যখন সবাই মিলে গাইলো “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” তখন সত্যিই শিহরিত হলাম। স্কুলের প্রধান অধ্যাক্ষা মিলিয়া সাবেদ আমার দ্বিতীয় বই, “ডিজিটাল জামানায় পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং” বইটি মোড়ক উন্মোচন করেন। তার হাত দিয়েই সিঙ্গাপুরে যাত্রা শুরু করলো এই বইটি। অনুষ্ঠানের শেষে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের সার্টিফিকেট প্রদান করলো। অনুষ্ঠানের পরে অনেকেই বই কিনলো। তবে মাধ্যমিক শ্রেণীর দুটি ছাত্রী বই কিনতে আসলে এই ক্ষুদে ক্রেতাদের পেয়ে সত্যিই আপ্লুত হলাম। সামনের বিশ্বে তারা সফলভাবে নিজেদের ব্র্যান্ডিং করে সফল হোক সেই দোয়া করলাম।

বিকেলে ছিল বি.এল.এল.এস. বা Bangla Language and Literary Society এর আয়োজনে অনুষ্ঠানটি। তাদের অনুষ্ঠানটি বেশ বড় ছিল এবং সিঙ্গাপুরের প্রবাসী বাংলাদেশীদের ঢল নেমেছিল অনুষ্ঠানটিতে। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়লো বইমেলা। প্রতিবছরই তারা বই মেলার আয়োজন করে। তবে এইবার বইয়ের সংখ্যা বেশ ছিল। বই পড়ুয়া আমি কোনটি বাদ দিয়ে কোনটি নেব, তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বইমেলাতে আমার বইটিও রাখার সুযোগ হয়েছিল আমার। যারা কিনছিল তাদের অটোগ্রাফ দিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটালাম। তবে ভালো লাগলো আয়োজকদের আন্তরিকতা দেখে। পাশের ঘরেই আয়োজন করেছিল কাপড়, শাড়ি, খাবার এর স্টল। আমার বন্ধুবৌ তার জামদানি শাড়ির স্টল দিয়েছিল এবার। একটু পরেই ছোটদের ছবি আঁকার প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হল। বাচ্চাদের প্রতিযোগীতায় বসানোর জন্য বাবা-মা এর আগ্রহটা বেশ চোখে পড়লো। এমন আগ্রহ থাকলে সন্তানরা বাংলা শিখবেই বৈ কি। ভাষাটা শেখার চর্চা হয় পরিবার থেকেই। সন্ধ্যা নামলেই অনুষ্ঠান শুরু হল। কিছুদিন আগে থেকে Being in the moment নামে বর্তমানে ডুবে থাকা এবং সেই সময়টাকে উপভোগ করার কৌশল শিখছিলাম। সেই ফিলসফি মেনেই চুপচাপ গভীর মনোযোগ দিয়ে অনুষ্ঠান শুনছিলাম। প্রতি বছরই অনুষ্ঠানের নিত্য নতুন উপস্থাপনার কৌশল নিয়ে আনেন আয়োজকর। এইবার একটি নতুনত্ব ছিল শতজনকে নিয়ে গাওয়া গান  “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” আবেগে সত্যিই চোখে পানি চলে এসেছিল। আর এই দূর্লভ সময়টিকে ফ্রেমে তুলে নিলাম। অনুষ্ঠান শেষে যখন সবাই ফিরছিলাম তখন স্কুলের শিক্ষিকা এবং আয়োজকরা অনুরোধ করলো ছবি তুলে দিতে। ফটোগ্রাফি এর কাজ করতে ভালোবাসি তাই তাদের অনুরোধে ক্যামেরা হাতে নিলাম। কিন্তু বিশাল স্টেজে সবাই দাড়িয়ে আর আমার ওয়াইড লেন্সের ক্যামেরাটা আনা হয়নি। তাই কি করবো? আমার ছোট ছেলে ফটোগ্রাফি করে। তার সাথে পরামর্শ করলে সে বুদ্ধি দিল প্যানারোমা মুডে তুলতে। মাঝে মধ্যে ছোটরাও ভালো বুদ্ধি রাখে। শেষে বেশ ভালোই ছবিটি তুলতে পারলাম। ফেসবুকে আপলোড করার পরে দেখি ছবিটি ত্রিমাতৃক করে দেখাচ্ছে। ফেসবুক হরের রকমের ভেলকি দেখাচ্ছে বৈ কি।

বাংলাদেশের  সংস্কৃতির মৌলিক  কিছু উপাদন রয়েছে, আর একুশ নিয়ে রয়েছে আমাদের একটি আলাদা স্থান। তবে অনুভুতির সেই জায়গাটি পরবর্তি প্রজন্মদেরকাছে পৌছে দেবার জন্য বি.এল.সি.এফ. এবং  বি.এল.এল.এস. বাংলা স্কুলের অবদান সত্যিই অতুলনীয়। এই দুটি স্কুল হাজার বছর টিকে থাকুক এই বিশ্বায়নের যুগে সেই শুভকামনা করি।

বই উন্মোচনের অনুষ্ঠানে  গিয়েছিলাম। সেখানে পরিচয় আরজু ভাবির সাথে। কথা প্রসঙ্গে দ্বিতীয় প্রজন্মের বিয়ে নিয়ে কথা হল। তিনি জানালেন যে তার মেয়ে (কিংবা ছেলে, আমি মনে করতে পারছিনা ঠিক কি বলেছিলেন) একজন চাইনিজ প্রজন্মকে বিয়ে করেছে। কিন্তু তিনি মনে করেন অন্য সমাজ ও সংস্কৃতির হলেও তারা একে অপরের সংস্কৃতিকে খুব সম্মান করে। চাইনিজরা যেমন ভাবে ঈদের দিনে তাদের বাসায় এসে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, ঠিক তেমনিভাবে তিনিও চাইনিজ নতুন বর্ষে কমলা নিয়ে তার বিয়াইন এর বাসায় যান। সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন সংস্কৃতির লোকজন বসবাস করে বলে এইখানে সবাই অন্যের সংস্কৃতি এবং কৃষ্টিকে সম্মান করে।

ড. মশিউর রহমান

সিঙ্গাপুর ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৩