জাপানীজ ভাষা শেখার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
আজকে আমি আলোচনা করব মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য বিদেশী ভাষার শেখার ব্যাপারে।
আমরা সবাই জানি যে, মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্য একটি ভাষা শেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেক্ষেত্রে সাধারণত আমরা ইংরেজী ভাষাটাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কেননা এটা একটি আন্তজার্তিক ভাষা।
ইংরেজী ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ সেটা অবশ্যই আমি অকপটে স্বীকার করছি কিন্তু তার পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শিখাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদিও জানি ইংরেজী বহুল পরিমানে ব্যবহৃত হয় কিন্তু পৃথিবীতে মাত্র শতকরা ২০ ভাগ লোক ইংরেজী ভাষায় কথা বলে। বাকী ৮০ ভাগ লোক ইংরেজীর অন্য কোন ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীতে সাড়ে সাত বিলিয়নের মধ্যে মাত্র দেড় বিলিয়ন লোক ইংরেজী ভাষায় কথা বলে। আর বাকী ৮০ ভাগ লোক ইংরেজীর বাইরে অন্য ভাষায় কথা বলে।
আমরা যদি সেই অন্য ভাষাগুলো শিখি তাহলে আমাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিবে। মনে করা যাক, আমরা যদি রাশিয়ান ভাষা শেখেন তাহলে রাশিয়ান ভাষাতে যে সকল তথ্য বা জ্ঞান ভান্ডার রয়েছে তা আপনি জানতে পারবেন। এই রাশিয়ান ভাষার মাধ্যমে আমরা তাদের বছরের পর বছরের লদ্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নিজের প্রয়োজনের কোন কাজ করতে পারবো। অর্থাৎ নতুন ভাষা আমাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
চাকুরী সহ অন্যন্য ক্ষেত্রেও তৃতীয় ভাষাটা শেখাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন আপনি কোন জায়গায় আবেদন করবেন তখন একই রকম যোগ্যতায় আরো অনেকেরই সেখানে আবেদন করবে। আপনার সিভি বা বায়োডাটার মধ্যে চাকুরী দাতারা অন্য বিশেষ কিছু একটা খোঁজে, বাড়তি কিছু খোঁজে। ইংরেজীর পাশাপশি যদি আপনি ৩য় অন্য কোন ভাষা জানেন। সেটা আপনার জন্য একটা নতুন সুযোগ এনে দেবে।
শুধুমাত্র তাই নয় কর্মক্ষেত্রেও আপনি গুরুত্ব পাবেন। ঠিক একই টিমে আপনার মতো যোগ্য অনেকেই থাকলেও আপনার যদি অন্য কোন ভাষা জানা থাকে তাহলে সেই ক্ষেত্রে আপনি অন্যান্য সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবেন এবং লিডারশিপেও আপনার একটি গুরুত্ব পাবে।
জাপানি ভাষা:
আজকে বিদেশী ভাষার মধ্যে বিশেষভাবে জাপানীজ ভাষা নিয়ে আলোচনা করবো। জাপাানীজ ভাষা আমাদের জন্য অনেক সুযোগ এনে দিতে পারে। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের বাইরে নিজেদের ভাগ্য গড়ে তুলতে চান, যারা দেশের বাইরে অন্য কোন দেশে নিজের জীবন গড়তে চান তাঁদের জন্য জাপান একটি সুন্দর ও আকর্ষনীয় দেশ।
জাপান অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালি একটি দেশ হলেও তাদের কর্মী দিনে দিনে কমছে। তাদের জনগণের একটি বড় অংশই বৃদ্ধ আর এর বিপরিতে ইয়োথ গ্রুপটি যারা কর্মিবাহিনি তাদের সংখ্যাটি দিন দিন কমে আসছে। দ্রুত জাপান তাদের এই সমস্যা সমাধান করার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে ইঞ্জিনিয়ার ও নন-ইঞ্জিনিয়ার পদে প্রচুর লোক নিয়োগ দিচ্ছে। এই সংক্রান্ত অনেক তথ্য আপনি ইন্টারনেটে পাবেন।
এবার দেখা যাক তথ্য প্রযুক্তি বা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য কেন জাপানীজ ভাষা সুযোগ এনে দেবে।
প্রথমত, আপনি যদি ইঞ্জিনিয়ার হন তাহলে জাপানে যেয়ে চাকুরী খুঁজতে পারেন কিংবা জাপানে যাওয়ার আগেও আপনি চাকুরী নিয়ে সেখানে যেতে পারবেন। আর সেই ক্ষেত্রে সবথেকে বড় শর্ত হল জাপানিজ ভাষাটা জানা। প্রতি বছরই জাপানের অনেক চাকুরিদাতারা বাংলাদেশে আসছে কিন্তু জাপানিজ জানা লোকদের পাচ্ছেনা বলে তারা বিফল হয়ে ফিরে যাচ্ছে। জাপানি ভাষা শিখে আমরা তাদের এই বিশাল শ্রমবাজার এ ঢুকতে পারবো।
দ্বিতীয়ত, আপনি যদি কোন কারনে জাপানে নাও যেতে পারেন। ঘরে বসেই জাপানীজ আউটসোর্সিং এর প্রজেক্টগুলো করতে পারেন। আউটসোর্সিং এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা এখন অনেক কাজ করছে কিন্তু তারপরও আউটসোর্সিং এর ক্ষেত্রগুলোতে মূলতঃ ভারতীয়রা দখল করে রেখেছে।
আউটসোর্সিং এর একটি বড় একটা বাজার হচ্ছে জাপানে, যদিও তা আমরা এখনও ঠিকমতন ধরতে পারছিনা জাপানিজ ভাষা না জানার কারণে। জাপানের প্রজেক্টগুলো খুব ভাল মানের হয়ে থাকে এবং তার পেমেন্টও খুব ভাল থাকে। অন্যান্য আউটসোর্সিং এর কাজের তুলনায় অর্থাৎ আপনি যদি জাপানীজ ভাষা জানেন তাহলে আপনি জাপানের আউটসোর্সিং মার্কেটেও কাজ নিয়ে আসতে পারবেন। বর্তমানে জাপানী কাজগুলো মূলত চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেও তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছে। আপনি যদি জাপানীজ ভাষা জানেন তাহলে জাপানের এই আউটসোর্সিং অথবা জাপানে চাকুরী নিয়ে চলে যাওয়া এদুটোর সুযোগ আপনার জন্য খোলা আছে।
অনেকে ভাবতে পারেন যে, একটা বিদেশী ভাষা শেখা অনেকটা কঠিন ব্যাপার এবং বয়সের একটা ব্যাপার রয়েছে। ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। নতুন ভাষা শেখার ক্ষেত্রে আলাদা কোন বয়স নাই। যে কোন বয়সেই একটা নতুন ভাষা শেখা যায়।
আর বাংলাদেশীদের জন্য জাপানীজ ভাষা শেখা খুবই সহজ তার কারণটা হলো জাপানীজ ভাষায় আলাদা কোন জটিল উচ্চারণ নেই যেটা আমরা বাংলাতে উচ্চারণ করতে পারি না। ফ্রেঞ্চ, আরবি ও চাইনিজ ভাষাতে কিছু কিছু উচ্চারণ রয়েছে যেটা আমাদের জন্য একটি কঠিন। কিন্তু জাপানের ক্ষেত্রে তেমন কঠিন উচ্চারণ নেই বলে উচ্চারণ করাটা সহজ। কেননা, জাপানের বর্ণগুলো আমাদের বাংলা ভাষার বর্ণ গুলোতে উচ্চারণ করা যায়। যেমন-আ. ই, উ, এ, ও
এছাড়া জাপানিজ গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণের মধ্যে অদ্ভুত রকমের একটা মিল রয়েছে। কিছু গবেষকদের ধারণা যে, জাপানি ব্যাকরণ এসেছে ভারতীয়দের কাছ থেকে এবং অক্ষরগুলো এসেছে চীন থেকে।
একটা ছোট উদাহরণ দিই। বাংলাতে আমরা বলি -আমি ভাত খেতে চাই। এটা যদি জাপানিজে বলি তবে হবে,
আমি - ওয়াতাসি
ভাত - গোহান
খেতে - তাবেরু
চাই - তাই।
এটাকে যদি আমি বাংলাতে বলি-আমি ভাত খেতে চাই ঠিক তেমনই একই পর্যায়ক্রমে বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী শব্দগুলোকে যদি সাজিয়ে বলি তবে হবে,
ওয়াতাসি ওয়া গোহান ও তাবেতাই দেস।
অর্থাৎ বাংলা বাক্যগঠনের পর্যায়ক্রমে জাপানিজ শব্দ ব্যবহার করে জাপানিজে বাক্য গঠন করতে পারবেন। সেইজন্য বাংলাদেশীদের জন্য শেখাটা কিছুটা সহজ।
আমি আশা করব যারা ইঞ্জিনিয়ার এবং নন-ইঞ্জিনিয়ার রয়েছেন, তারা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই তৃতীয় কোন ভাষা শিখবেন। আর সেক্ষেত্রে জাপানীজ ভাষা আপনি শিখতে পারেন।
সবাইকে ধন্যবাদ।
ড. মশিউর রহমান
কিওতো, জাপান, ২০ জানুয়ারি ২০২১