ভালোবাসার অভাবে ধনী হয়ে উঠছে পৃথিবী

তারিখ নেই · 4 মিনিটের আনুমানিক পাঠ

এক সময় মানুষ বাঁচার জন্য অর্থের পেছনে ছুটত। এখন মনে হয়, মানুষ বাঁচতেই অর্থের জন্য বাঁচছে। আমাদের সময়ের সবচেয়ে গভীর বেদনাটি দারিদ্র্যে নয়, প্রাচুর্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। পৃথিবী যত বেশি ধনী হচ্ছে, মানুষ তত বেশি একা হয়ে পড়ছে। অর্থ, অবস্থান আর সাফল্যের বিজ্ঞাপন চারপাশে ঝলমল করছে, অথচ সম্পর্কের ভাঁজে জমছে শূন্যতা। আমরা “কত আয় করছ?” এই প্রশ্নটিকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানে পরিণত করেছি, কিন্তু “তুমি কেমন আছ?”—এই প্রশ্নটি হারিয়ে গেছে সৌজন্যের কোণায়।

বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট এই পরিবর্তনের নিঃশব্দ প্রমাণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, পৃথিবীতে প্রতি আটজন মানুষের একজন কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। ডিপ্রেশন এখন বৈশ্বিকভাবে অক্ষমতার প্রধান কারণগুলোর একটি। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বলছে, মানুষের সুখের মূল নির্ধারক অর্থ নয়, সম্পর্ক; তবু আমরা জীবনের সময়, শক্তি আর যৌবন ঢালছি এমন এক দৌড়ে যার শেষ নেই—শুধু ক্লান্তি আছে।

আমাদের সমাজে বস্তুবাদ শুধুই ভোগের গল্প নয়, এটি মূল্যবোধের স্থানচ্যুতি। আমরা জিনিসের ভাষায় ভাবতে শিখি, মানুষকে দেখি একটি “রিসোর্স” হিসেবে। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, এমনকি বিবাহও আজ অনেক ক্ষেত্রে “ডিল” হয়ে উঠেছে। প্রফেসর জিগমুন্ড বাউমান যাকে বলেছিলেন “লিকুইড লাভ”—সম্পর্কের সেই তরলতা যেখানে মানুষ আর একে অন্যের আশ্রয় নয়, একে অন্যের বিকল্প মাত্র।

এই মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রযুক্তিরও গভীর সম্পর্ক আছে। আমরা ‘কানেক্টেড’ থাকছি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, অথচ ‘ক্লোজ’ হচ্ছি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। গ্যালাপের জরিপ বলছে, উন্নত দেশগুলোতে গত তিন দশকে একাকীত্ব দ্বিগুণ হয়েছে। আমেরিকায় সার্জন জেনারেল ২০২৩ সালে একাকীত্বকে ‘Public Health Crisis’ ঘোষণা করেছেন। এই একাকীত্ব শুধু হৃদয়কে শুষে নেয় না, এটি শরীরকেও অসুস্থ করে। গবেষণা বলছে, দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতার প্রভাব দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর।

বাংলাদেশেও এর প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। শহর বড় হচ্ছে, কিন্তু পরিবার ছোট হচ্ছে। সামাজিক উৎসব সংকুচিত হচ্ছে, কিন্তু শপিং মল প্রসারিত হচ্ছে। আমরা উৎসবের অর্থ খুঁজে পাই না মানুষের সংযোগে, খুঁজে পাই ছাড়ের পোস্টারে। শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে আমরা তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি স্ক্রিন; বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার বদলে আমরা ব্যস্ত “স্ট্যাটাস আপডেটে”। সম্পর্কের পুরুত্ব কমছে, পাতলা হচ্ছে অনুভূতির দাঁড়িপাল্লা।

এ সময় ভালোবাসা যেন এক বিলাসিতা, যার বিল সবাই দিতে পারে না। নিখাদ ভালোবাসা পাওয়া হয়ে উঠছে ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা যত দ্রুত এগোচ্ছি, তত দ্রুত হারাচ্ছি ধৈর্য; যত উঁচুতে উঠছি, তত নিচে নামছে সহানুভূতি। সফলতার সংজ্ঞা থেকে যেন মানুষই বাদ পড়ে গেছে।

এই অবস্থায় নৈতিকতার জায়গাটাও নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। লাভ-লোকসানের হিসাবে “সঠিক” শব্দটি আর নৈতিক অর্থে ব্যবহৃত হয় না, ব্যবহৃত হয় মোট মুনাফার অংকে। আমরা প্রশ্ন করি না, একটি সিদ্ধান্ত মানুষের কী ক্ষতি করবে; আমরা জিজ্ঞেস করি, এতে লাভ কত? এই প্রশ্ন বদলে যাওয়াই আমাদের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

কিন্তু মানুষ এমন হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। মানুষ গোষ্ঠীতে বেঁচেছে, ভালোবাসায় বেড়ে উঠেছে, সম্পর্কেই আশা খুঁজেছে। নিউরোসায়েন্স দেখাচ্ছে, মানুষের মস্তিষ্ক সহানুভূতির জন্য জেনেটিকভাবে তৈরি। আমরা একে অন্যকে অনুভব করার জন্য প্রোগ্রামড। অথচ আমরা নিজেরাই সেই প্রোগ্রাম মুছে ফেলছি টাকার নামে।

এই পৃথিবীতে সবচেয়ে দামী জিনিস এখন আর হীরা নয়, সময়। সবচেয়ে বিরল বস্তু এখন আর সোনা নয়, ভালোবাসা। আজ কাউকে মন দিয়ে শোনা বিলাসিতা; কাউকে বোঝা যেন অপচয়। অথচ ইতিহাস বলছে, সভ্যতা ভেঙেছে অর্থের অভাবে নয়, নৈতিকতার অভাবে। রোম ভাঙেনি কেবল দুর্বল প্রাচীরের জন্য, ভেঙেছে ভেতরের মূল্যবোধ ক্ষয়ের কারণে।

তাই আজ প্রশ্নটা হওয়া উচিত—আমরা কত আয় করলাম, সেটা নয়; প্রশ্নটা—আমরা কতটা মানুষ থাকলাম? আমরা কি সন্তানকে কেবল প্রতিযোগিতায় নামাচ্ছি, নাকি তাকে মানুষ বানাচ্ছি? আমরা কি সম্পর্ককে ‘ম্যানেজ’ করছি, নাকি লালন করছি?

ভালোবাসা কোনো দুর্বলতা নয়, এটি শক্তি। মানবিকতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজন। নৈতিকতা কোনো আদর্শবাদ নয়, এটি বেঁচে থাকার শর্ত। আমরা যদি আজ এগুলোকে ত্যাগ করি, কাল আমাদের হাতে থাকবে কেবল দালান, কিন্তু থাকবে না ঘর।

পৃথিবী হয়তো আরও ধনী হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে—মানুষ কি ততটা মানবিক থাকবে?

ড. মশিউর রহমান

২১ এপ্রিল ২০২২