চ্যানেল আই - তারকা কথন (১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৫)
[Unsupported Notion block: video]
সম্প্রচার: ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
দেশের প্রথম দৈনিক লাইভ সেলিব্রেটি শো “তারকা কথন”
অনুষ্ঠান: তারকা কথন উপস্থাপনায়: সাফি আহমেদ অতিথি: ড. মশিউর রহমান প্রযোজনা: অনন্যা রুমা

চ্যানেল আই টিভিতে মুখোমুখি ড. মশিউর রহমান
চ্যানেল আইয়ের আলোচনামূলক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি ড. মশিউর রহমান-এর সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হয়েছে। তিনিও একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, বর্তমানে সিঙ্গাপুরের ওমরন হেলথকেয়ারে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির গবেষক। সাক্ষাৎকারে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন; যা আমাদের চাকরিজীবন, স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা ও সার্বিক জীবনযাত্রাকে কীভাবে পরিবর্তন করছে। তাঁর বক্তব্য ছিল সময়োপযোগী এবং উৎসাহবর্ধক—চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নতুন সুযোগও তুলে ধরছে।
কর্মসংস্থান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
প্রথম প্রশ্ন ছিল, “এআই কি আমাদের চাকরি কেড়ে নেবে?” ড. মশিউর বলেন, এরকম আশঙ্কা পুরোটাই নয়। বরং এআই অনেক নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে। তিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের একটি তথ্য তুলে ধরে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হবে। যদি ধরা হয় ২০৩০ সালে ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন চাকরি হারায়, তাহলে বাকি ৯০ জনের মধ্যে ৬০ জন সম্পূর্ণ নতুন পেশায় নিয়োজিত হবেন এবং ৩০ জন তাদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আগের চাকরিতেই থাকবেন।
- চাকরির ভবিষ্যৎ: ১০০ জনে প্রায় ১০ জন চাকরি হারাবে, ৬০ জন নতুন চাকরিতে যোগ দেবে, ৩০ জন আপস্কিল করে পুরনো চাকরি চালিয়ে যাবে।
ড. মশিউর বলেন, এই তথ্য ভয়ের কারণ নয়, বরং আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। কিছু পেশায় পরিবর্তন আসতে পারে—বিশেষ করে কম প্রশিক্ষিত কাজের ক্ষেত্রে (যেমন সরল লোগো ডিজাইনার)—সেখানে চাকরির সংখ্যা কমে যেতে পারে। তবে যারা ডিজাইন বা প্রযুক্তিতে দক্ষ, তারা এআইকে সহযোগী হিসেবে নিয়ে তাদের কাজকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবে। অর্থাৎ নিজেকে নতুন দক্ষতায় গড়ে তোলা হবে মূল চাবিকাঠি।
স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে আজ বিশাল পরিমাণ তথ্য (ডেটা) সংগ্রহ হচ্ছে, এবং এআই এর মাধ্যমে সেই তথ্যের যথাযথ ব্যবহার করা হচ্ছে। ড. মশিউর বলেন, “স্বাস্থ্য সেবা এক বিশাল তথ্যভাণ্ডার যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি পরিমাপের ফলাফল জমা হয়।” উদাহরণস্বরূপ রক্তচাপের পরিমাণ, ওজন, এক্স-রে ইমেজ এবং রোগীর জিনগত তথ্য—এসব ডিজিটাল ডিভাইসে সঞ্চিত হচ্ছে। এই তথ্যগুলোকে বড় ডেটা এবং মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করলে চিকিৎসার পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে।
এআই স্বাস্থ্যখাতে অনেক সুবিধা দিচ্ছে:
-
রোগ নির্ণয় ও মহামারি পূর্বাভাস: রোগীর ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে কোন অসুখ হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া।
-
ওষুধ ও টিকা উদ্ভাবন: প্রোটিনের গঠন বিশ্লেষণ করে দ্রুত নতুন ওষুধ বানানো।
-
ব্যক্তিগত চিকিৎসা: প্রতিটি রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা থেরাপি প্রদান।
-
সহজ তথ্য সংগ্রহ: স্মার্টফোন বা ফিটনেস ব্যান্ড থেকে তথ্য নিয়ে রোগীর অবস্থা নজরদারি।
ড. মশিউর আরও উল্লেখ করেন, বহু বছরের তথ্য থাকলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়। ধরুন ২০০ বছরের জলবায়ুর ডেটা থাকলে বন্যা কী সময়ে হবে তা বলা যেত। চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর দীর্ঘমেয়াদী ডেটা থাকলে আগামী বছরগুলোতে তার সম্ভাব্য অসুখ নির্ধারণ করা যায়; এটাকে পূর্বাভাসমূলক বিশ্লেষণ বলা হয়।
তথ্যবিচ্ছুরণের যুগে নিরাপত্তা বজায় রাখা জরুরি। ড. মশিউর বলেন, রোগীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিবরণী বা জিনগত তথ্য যদি অননুমোদিত হাতে চলে যায়, বিপদের কারণ হতে পারে। তাই “মহান শক্তির সাথে মহান দায়িত্ব” অনুসরণ করে তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সৃজনশীলতা ও কপিরাইট
ড. মশিউর আলোচনা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আইন অনুসারে যদি কোনো সৃষ্টি সম্পূর্ণ এআই নিজে তৈরি করে (যেমন কোনো এআইকে বললেই “একটি কাপের ডিজাইন করে দাও”), তাহলে তার কপিরাইট পাওয়া যায় না। কারণ সেখানে মানুষের সৃজনশীল অবদান থাকবে না। তবে যদি সেই সৃষ্টিতে মানুষের কোনো পর্যায়ে সংশোধন বা নির্দেশ থাকে—যেমন কাপের রঙ-ছাঁট পরিবর্তন—তবে কপিরাইট পাওয়া যায়।
নিজের অভিজ্ঞতায় তিনি জানিয়েছেন, তিনি গত ২০ বছরের লেখার নকশা ব্যবহার করে “মশিউর এলএলএম” নামে একটি ভাষা মডেল তৈরি করেছেন এবং সেটির সহায়তায় নিজের বই লিখেছেন। তবে লেখার প্রতিটি অংশের ভাষা ও গঠন তিনি নিজেই নিয়েছেন। অর্থাৎ এই বইটিও মানব-এআই যৌথ প্রয়াসের ফলে তৈরি, তাই এর কপিরাইট তাঁরই অধিকার।
গবেষণা ও উদ্ভাবন
ড. মশিউর মনে করেন, এআই গবেষণাকে ত্বরান্বিত করছে। আগে কোনো প্রোটিনের গঠন জানার জন্য গবেষকদের মাসখানেক লেগে যেত, এখন প্রোটিন ফোল্ডিং মডেলের সাহায্যে কয়েক ঘণ্টায় তা নির্ধারণ করা সম্ভব। এর ফলে ঔষুধ আবিষ্কারও অনেক দ্রুত হয়েছে, যেমন করোনা টিকার উদ্ভব ত্বরান্বিত হয়েছে এআই-ভিত্তিক গবেষণার কারণে।
ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এআইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম: ক্যান্সার কোষ অতিরিক্ত প্রোটিন তৈরি করে যা চোখে ধরা কঠিন, কিন্তু কম্পিউটার হাজার হাজার ডেটা বিশ্লেষণ করে সে ভিন্ন লক্ষণগুলো সহজে ধরতে পারে। এ কারণে ড. মশিউর বলেন, এআই ডাক্তারদের বদলাবে না বরং সহায়ক হবে। দ্রুত রোগনির্ণয় এবং ব্যক্তিমুখী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এটিই গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা।
বই ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
ড. মশিউরের “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” বইটি সাধারণ পাঠক ও শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ বাংলায় লেখা। এতে এআই নিয়ে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণা পরিষ্কার করে দেখানো হয়েছে এবং বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে কীভাবে এআই আমাদের কাজে আসে। তরুণ প্রজন্মের জন্য বইটিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কোন কোন বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানো ভালো (যেমন ডেটা সায়েন্স, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং)। ডাক্তার, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট স্টার্টআপ — সবার জন্য এআই ব্যবহার করে কী কী করা যায়, তার উদাহরণ বইটিতে রয়েছে।
তিনি বাংলা ভাষায় বইটি প্রকাশ করতে পেরে খুশি, কারণ মাতৃভাষায় বিষয়গুলো বোঝা সহজ হয়। ইতিমধ্যে বইটি দেশের প্রধান বইয়ের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে এবং অনলাইনে রকমারির মতো প্ল্যাটফর্মেও পাওয়া যাচ্ছে। ড. মশিউর উদাহরণ দিয়েছেন অতীতের দক্ষতা থেকে বর্তমানের পরিবর্তন বোঝাতে: “১৯৮০-এর দশকে যেখানে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরি পাওয়া যেত, আজ তা মৌলিক দক্ষতায় পরিণত হয়েছে। এখন আর কেউ সিভিতে লেখে না ‘আমি এমএস ওয়ার্ড চালাতে পারি’, বরং বলা হয় ‘আমি সোশ্যাল মিডিয়া পরিচালনা করতে পারি’ বা ‘ডেটা বিশ্লেষণ জানি’।”
তিনি জানিয়েছেন, বইটি প্রকাশের পর তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, কোন কোন বিষয়ে মনোযোগ দিলে ভবিষ্যতে এআই-ভিত্তিক সুযোগগুলো কাজে লাগানো যাবে। এতে স্পষ্ট যে এআই বিষয়ে জ্ঞান বাড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে।
বিজ্ঞানী নেটওয়ার্ক ও উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা
ড. মশিউরের একটি উদ্যোগ হলো বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সংযোগ তৈরি করা। ২০০৬ সালে তিনি বিজ্ঞানী অর্গ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেন এবং “বিজ্ঞানী” নামে ইউটিউব চ্যানেল শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করছেন। আঠার বছর ধরে প্রায় ১৮০ জন বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর গল্প তুলে ধরেছেন—কেউ নিউইয়র্কে গবেষণা করছেন, কেউ টোকিওতে, কেউ ঢাকায়; প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। ড. মশিউর জানান, আনুমানিক ৫০ হাজার বাংলাদেশি বিজ্ঞানী আছেন এবং তাদের কাজ তুলে ধরা তার উদ্দেশ্য। এই উদ্যোগ আমাদের মেধার গৌরব তুলে ধরে এবং তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যোগায়।
ড. মশিউরের ভ্রমণ ও প্রচেষ্টায় জাপান, ইউরোপ, আমেরিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালি গবেষকদের কথাও উঠে এসেছে। এর ফলে তাদের কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং প্রবাসী প্রজন্মের মধ্যে গর্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
প্রেরণার দিশারি
আলোচনার শেষে ড. মশিউর সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয় না করে বন্ধু হিসেবে দেখা উচিত। সতর্কতার সঙ্গে এআই ব্যবহার করলে এর সুফল পাওয়া যায়, তাই তরুণদের এটিকে নিজেদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বলেছেন। তাঁর নিজস্ব উদাহরণ দেখিয়েছে, অধ্যবসায় ও প্রস্তুতি থাকলে একজন বাংলাদেশিও আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পেতে পারে।
ড. মশিউর পরামর্শ দিয়েছেন, আমাদের তরুণদের উচিত এআই শেখার অভ্যাস গড়ে তোলা ও নিজেদের দক্ষতা উন্নয়ন করা। ভবিষ্যতের চাকরিতে টিকে থাকতে এসব দক্ষতা অপরিহার্য। তিনি বলেছেন, একদিনে নয়, নিয়মিত চর্চায় এআই-সংক্রান্ত ধারণা আয়ত্ত করা সম্ভব; সেই প্রস্তুতির ফলে চাকরি-বাজারে নিজের অবস্থান দৃঢ় করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষিত হওয়াও জরুরি। এআই-এর কল্যাণে বিশ্ব এখন তথ্যভিত্তিক, তাই আমাদের নিজেকে তা-অনুযায়ী সাজাতে হবে।
সংক্ষেপে, ড. মশিউরের জীবন ও চিন্তা আমাদের শেখায় যে প্রযুক্তির যুগে যুগোপযোগী হতে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। এআই-যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পড়াশোনা ও দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি; উদ্ভাবনী মনোভাব থাকলেই আমাদের আগামী দিনের সুযোগ গড়ে তোলা সম্ভব। ড. মশিউরের সংগ্রাম ও সাফল্য আমাদের দেশের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং গর্বের উৎস।