বিয়ন্ড বিজনেস এ ড. মশিউর রহমান এর সাক্ষাৎকার

তারিখ নেই · 39 মিনিটের আনুমানিক পাঠ

ইউটিউব লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=V30UIhoqFOA

‘বিয়ন্ড বিজনেস’ সমন্ধে: ডিজিটাল যুগে তরুণদের মধ্যে অনলাইন আয়, উদ্যোক্তা হওয়া এবং দক্ষতা উন্নয়নের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে উদ্যোক্তা সামসুজ্জামান রিটন শুরু করেছেন তাঁর ইউটিউব চ্যানেল ‘বিয়ন্ড বিজনেস’, যেখানে তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সহজ ও প্রয়োগযোগ্য উপায়ে শেখাচ্ছেন কিভাবে চাকরির পাশাপাশি বা চাকরি ছেড়ে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করা যায়। চ্যানেলটিতে দর্শকরা শিখতে পারেন — ব্যবসা ও আয়ের নতুন পথ তৈরি করার কৌশল, স্টুডেন্ট ও হাউসওয়াইফদের জন্য অনলাইন আয়ের সুযোগ, বিজনেস গ্রোথ ও ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি, ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্ত টেকনোলজি গাইড। রিটনের লক্ষ্য স্পষ্ট — তরুণ ও আগ্রহী উদ্যোক্তাদের ধাপে ধাপে গাইডলাইন দিয়ে ক্যারিয়ার ও ফিনান্সিয়াল ফ্রিডম অর্জনে সহায়তা করা। ‘বিয়ন্ড ব্রাকেট’ ইতোমধ্যেই তরুণদের কাছে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এক অনুপ্রেরণার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, যেখানে জ্ঞানের পাশাপাশি আছে বাস্তব জীবনের সফলতার গল্পও।

ড. মশিউর এর সাথে ‘বিয়ন্ড ব্রাকেট’ এর সাক্ষাৎকারের মূল অংশগুলি:

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জীবনের গল্প


বিয়ন্ড বিজনেস: ভিউয়ার্স, আজকের বিয়ন্ড বিজনেস পডকাস্ট–এর নতুন পর্বে আমাদের সঙ্গে রয়েছেন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব—ড. মশিউর রহমান। তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, সফটওয়্যার ও টেক পেশাজীবী, আবার লেখকও। প্রযুক্তি নিয়ে কাজের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত ভ্রমণ করেন এবং ভ্রমণ নিয়ে লেখালেখিও করেন। এতগুলো পরিচয়ের মধ্যে তিনি নিজেকে আসলে কোন পরিচয়ে দেখতে চান—চলুন, আমরা সেটা তাঁর মুখ থেকেই শুনি।


ড. মশিউর রহমান: ধন্যবাদ। বিয়ন্ড বিজনেস–এর সকল দর্শককে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আপনারা যে শুধু ব্যবসা নয়, ব্যবসার বাইরেও মানুষের চিন্তাধারাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন—এটি সত্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে মনে করি।

নিজের পরিচয় দিতে গেলে আমি নিজেকে প্রথমেই বিজ্ঞানী হিসেবে দেখি। আমার মূল কাজ স্বাস্থ্য খাতে—কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করা যায়, সেটি নিয়েই আমার গবেষণা ও পেশাগত কার্যক্রম।

তবে বিজ্ঞানের কাজের পাশাপাশি আমি দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করছি। আমার লক্ষ্য হলো জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলোকে সহজ ভাষায় তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ পাঠকের কাছে তুলে ধরা। আমি চাই, বাংলাভাষায় এমন এক বিজ্ঞানচর্চা হোক যেখানে কেউ ভয় পাবে না বিজ্ঞানের কঠিন শব্দে, বরং আগ্রহী হবে তা জানার। তাই আমি ছোটদের জন্য সহজ ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা লিখি। সেই লক্ষ্যে ২০০৬ এ বেশ কিছু বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের নিয়ে শুরু করি biggani.org নামে একটি প্লাটফর্ম যেখানে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে ছিটে থাকা বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে আসছি। বর্তমানে আমি বিজ্ঞানী অর্গ এর সম্পাদক হিসাবে কাজ করছি।

এছাড়াও, আমি দেশের নীতিনির্ধারক বা decision-maker–দের উদ্দেশে বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখি। সেখানে আমি আলোচনা করি—বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তিনির্ভর নীতিনির্ধারণের জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

এর বাইরে আমি ভ্রমণ কাহিনি, গল্প এবং কবিতাও লিখি—যেখানে জীবনের নানা অনুভূতি ও উপলব্ধি প্রকাশ করার চেষ্টা করি।


বিয়ন্ড বিজনেস: লেখালেখির এই আগ্রহটা কোথা থেকে এলো বলে আপনি মনে করেন?

ড. মশিউর রহমান: আমার লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য একটাই—জীবনকে বোঝা, এবং সেই বোঝার অভিজ্ঞতাগুলো অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। আমি মনে করি, জীবনের ভুলগুলোও একেকটি শিক্ষা। তাই আমি চেষ্টা করি আমার নিজের ভুল ও সেগুলো সংশোধনের গল্পগুলো এমনভাবে লিখতে, যাতে পাঠক নিজের জীবনের সাথেও মিল খুঁজে পায়।

আমার লেখা কয়েকটি বইয়ে এই দর্শনটাই ফুটে উঠেছে—বিজ্ঞানকে মানুষের জীবনের গল্পের সঙ্গে মেলানো, এবং জ্ঞানকে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমি বিশ্বাস করি, বিজ্ঞান কেবল গবেষণাগারে নয়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও বেঁচে থাকে—যতদিন আমরা কৌতূহলী থাকতে পারি এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ হারাই না।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য: ড. মশিউর রহমান কেবল প্রযুক্তি ও গবেষণার মানুষ নন—তিনি এমন এক চিন্তাশীল লেখক, যিনি বিজ্ঞানের ভাষাকে মানবিক অনুভূতির সঙ্গে মিশিয়ে মানুষের জীবন ও সমাজ নিয়ে ভাবেন। তাঁর কথায় যেমন আছে যুক্তি, তেমনি আছে এক গভীর মানবিক বোধ—যা তাঁকে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের এক অনন্য সংযোগস্থলে দাঁড় করিয়েছে।

হেলথটেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যতের চিকিৎসা বিপ্লব


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, আপনি বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন, এবং বর্তমানে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বা হেলথটেক খাতে যুক্ত আছেন—যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন আসছে। আমরা জানতে চাই, আপনি আসলে কোন ক্ষেত্রে কাজ করছেন, কী ধরনের প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন?

ড. মশিউর রহমান: হেলথটেক এখন এক বিশাল ক্ষেত্র। স্বাস্থ্য মানুষের জীবনের মূলভিত্তি—আমরা সবাই দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে চাই। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই অসুস্থতা আসে, এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাই তখন আমাদের ভরসা। তবে বর্তমানে প্রযুক্তি সেই চিকিৎসাকে আরও কার্যকর, দ্রুত ও তথ্যনির্ভর করে তুলছে।

উদাহরণস্বরূপ, আমরা আগে শুধুমাত্র এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে দেহের সমস্যাগুলো শনাক্ত করতাম। কিন্তু এখন একটি নতুন ধারণা এসেছে—তথ্যভিত্তিক চিকিৎসা (data-driven healthcare)। অর্থাৎ রোগীর অসুস্থতা, চিকিৎসা ও ওষুধ ব্যবহারের তথ্য যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা যায়, তবে তা শুধু একজন নয়, লক্ষ লক্ষ রোগীর উপকারে আসতে পারে।

ধরা যাক, একই ধরনের অসুখ হাজার মানুষের হয়েছে। সেই রোগীরা কোন ওষুধে ভালো হয়েছে, কোন চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকর ছিল—এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে আমরা ভবিষ্যতের চিকিৎসার মান উন্নত করতে পারি। এখানে পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর এই বিশ্লেষণকে আরও বুদ্ধিমান ও দ্রুত করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এখন অপরিহার্য।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকদের সহায়তা করছে—ওষুধের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ বা রোগীর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের পূর্বাভাস দেওয়ায়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য প্রযুক্তির প্রতিটি স্তরে এআই-এর ব্যবহার বাড়ছে এবং আমরা সেই পরিবর্তনের অংশীদার।


বিয়ন্ড বিজনেস: আপনি যেহেতু হেলথটেক খাতে কাজ করছেন, তাই জানতে চাই—এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি আপনার প্রতিষ্ঠানেও কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে?

ড. মশিউর রহমান: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন খুব আলোচিত একটি বিষয়, বিশেষ করে চ্যাটজিপিটি আসার পর থেকে। তবে অনেকে মনে করেন এটি নতুন কিছু—আসলে তা নয়। এর শুরু ১৯৫০–৬০-এর দশকেই, এবং ১৯৮০-এর দশকে এ নিয়ে প্রথম বড় গবেষণার ঢেউ আসে।

তখনই মেশিন লার্নিং ধারণার জন্ম হয়—যেখানে যন্ত্রকে শেখানো হয় কীভাবে তথ্য চিনতে ও বিশ্লেষণ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন ডাক ব্যবস্থায় হাতে লেখা ঠিকানা পড়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিঠি বাছাই করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতো বহু বছর আগে।

বর্তমানে এই ধারাটিই আরও উন্নত হয়ে এসেছে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (Large Language Model)–এর মাধ্যমে, যার মধ্যে চ্যাটজিপিটি অন্যতম। এটি বিপুল পরিমাণ ভাষা-ভিত্তিক তথ্য শিখে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, এমনকি সারমর্ম তৈরি করতেও সক্ষম।

উদাহরণস্বরূপ, ধরুন আমার কাছে ২,০০০ পাতার একটি বই রয়েছে—আমি পুরোটা পড়তে পারছি না। কিন্তু চ্যাটজিপিটির সাহায্যে আমি তার সারসংক্ষেপ ও মূল ধারণা দ্রুত জানতে পারছি। এমনকি গণিত, পরিসংখ্যান বা ডেটা বিশ্লেষণের কাজেও এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


বিয়ন্ড বিজনেস: অনেকেই এখন শুনছেন “AGI” বা Artificial General Intelligence সম্পর্কে—এটি আসলে কী, একটু ব্যাখ্যা করবেন?

ড. মশিউর রহমান: আমরা এখন যেই এআই ব্যবহার করছি, সেটি আসলে ন্যারো এআই (Narrow AI)—অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি বুদ্ধিমত্তা। যেমন, একটি এআই ছবি আঁকতে পারে, কিন্তু লেখা লিখতে পারে না।

কিন্তু ভবিষ্যতের লক্ষ্য হলো জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (AGI)—যেখানে যন্ত্র মানুষের মতো নিজে থেকেই চিন্তা করতে ও নতুন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, কোনো তথ্য আগে থেকে না দিয়েও। অর্থাৎ, এটি হবে সম্পূর্ণ অটোনোমাস বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেখা ও কাজ করা বুদ্ধিমত্তা।

আমরা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাইনি, কিন্তু গবেষণা চলছে দ্রুতগতিতে। যখন এটি বাস্তবায়িত হবে, তখন এআই শুধু চিকিৎসা বা প্রযুক্তিতেই নয়, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। অবশ্যই এর সঙ্গে কিছু ভয়ও আছে—চাকরি হারানোর আশঙ্কা বা মানবসৃষ্ট নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রশ্ন। তবে ভালো ও মন্দ মিলিয়ে, নিঃসন্দেহে আমরা এক চমৎকার প্রযুক্তিগত যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য: ড. মশিউর রহমানের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট—হেলথটেক এখন শুধু চিকিৎসা নয়, এটি তথ্য, পরিসংখ্যান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক সমন্বিত জগৎ। আর সেই জগৎই আগামী দিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও বুদ্ধিমান, সাশ্রয়ী ও মানবকেন্দ্রিক করে তুলবে।

ঘরে বসে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার

বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, আপনি বর্তমানে ওমরন হেল্থকেয়ারে কর্মরত। জানতে চাই, আপনারা কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করছেন আপনাদের পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে?

ড. মশিউর রহমান: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানেই নয়, সারা বিশ্বের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতেই এক বিপ্লব এনেছে। ওমরন হেল্থকেয়ারও সেই ধারারই অংশ। আমি এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি। আমাদের সিঙ্গাপুর অফিসটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান কার্যালয়—যেখান থেকে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের জন্য ওমরনের পণ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার ও বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান করি।


বিয়ন্ড বিজনেস: ওমরনের প্রধান পণ্যগুলো কী কী?

ড. মশিউর রহমান: ওমরন মূলত ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করে। আমাদের সবচেয়ে পরিচিত পণ্য হলো রক্তচাপ পরিমাপক যন্ত্র (Blood Pressure Monitor)—যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও রয়েছে ওজন মাপার যন্ত্র, নেবুলাইজার, এবং আরও কিছু গৃহস্থালি স্বাস্থ্য-পর্যবেক্ষণ ডিভাইস, যা মানুষ সহজেই ঘরে বসে ব্যবহার করতে পারেন।


বিয়ন্ড বিজনেস: অর্থাৎ, ওমরনের পণ্যগুলো মূলত ঘরে ব্যবহারের জন্য—যাতে মানুষ নিজের স্বাস্থ্য নিজেরাই পর্যবেক্ষণ করতে পারে?

ড. মশিউর রহমান: একদম ঠিক বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ, যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের জন্য নিয়মিত রক্তচাপ মাপা অত্যন্ত জরুরি। হাসপাতালে মাপার সময় মানসিক চাপের কারণে রিডিং অনেক সময় বেড়ে যায়। কিন্তু ঘরে স্বাভাবিক পরিবেশে রক্তচাপ মাপলে তা বেশি নির্ভুল হয়। তাই বাসায় একটি রক্তচাপ মেশিন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওমরনের যন্ত্রগুলো এখন শুধু পরিমাপেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো ব্যবহারকারীর তথ্য সংরক্ষণ করে, বিশ্লেষণ করে, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের ধরণ শনাক্ত করে পরামর্শ দিতে সক্ষম। ফলে রোগী ও চিকিৎসক—উভয়েই ধারাবাহিকভাবে বুঝতে পারেন রক্তচাপ বা অন্যান্য পরিমাপের পরিবর্তন কীভাবে ঘটছে।


বিয়ন্ড বিজনেস: তাহলে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ওমরনের পণ্যের অংশ হয়ে গেছে?

ড. মশিউর রহমান: হ্যাঁ, একেবারে তাই। আজকের দিনে তথ্য-নির্ভর স্বাস্থ্যসেবা সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। আমরা যে ডেটা সংগ্রহ করি—যেমন রক্তচাপ, হার্ট রেট, ওজন বা শ্বাসপ্রশ্বাসের তথ্য—সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীর জন্য অর্থবহ উপস্থাপন তৈরি করে। এতে ব্যবহারকারী সহজেই জানতে পারেন তাঁর শরীরের অবস্থার পরিবর্তন কেমন হচ্ছে।

আমাদের লক্ষ্য হলো এই প্রযুক্তিকে শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে চিকিৎসক ও হাসপাতালের সাথেও সংযুক্ত করা। ভবিষ্যতে রোগীর স্বাস্থ্য তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসক আরও দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন—এটাই ওমরন হেল্থকেয়ারের মূল উদ্দেশ্য।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য: ওমরন হেল্থকেয়ারের উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এখন কেবল যন্ত্র তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের ঘরে বসেই সঠিক ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা পাওয়ার এক নতুন যুগের সূচনা করছে—যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার এক নীরব কিন্তু অপরিহার্য সহযোগী।

নিউরালিংক: মস্তিষ্ক ও প্রযুক্তির সংযোগে নতুন চিকিৎসা বিপ্লবের সম্ভাবনা


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে অনেক বড় বড় অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে ইলন মাস্কের নিউরালিংক নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনার ঝড় বইছে। আমরা জানতে চাই—নিউরালিংক আসলে কী করতে চাইছে? এটা কি সত্যিই আমাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনবে বা মানুষের আয়ু বাড়াতে পারবে?

ড. মশিউর রহমান: নিউরালিংকের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটু প্রেক্ষাপট দিই। প্রকৃতির জগতে যেমন মানুষ, প্রাণী, গাছপালা রয়েছে—তেমনি মানুষের তৈরি একটি আলাদা জগৎ আছে, সেটি হলো প্রযুক্তির জগৎ—ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, সার্কিট ইত্যাদি। বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন এই দুই জগতকে একত্র করার উপায় খুঁজে বের করতে।

আমার পিএইচডি গবেষণার বিষয়ও ছিল সেই ধারাতেই—কীভাবে মানব মস্তিষ্কের নিউরনের সিগন্যাল সেমিকন্ডাক্টরের মাধ্যমে গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করা যায়। ২০০৫ সালে আমরা প্রথম সফলভাবে জীবন্ত কোষের স্নায়বিক সংকেত সংগ্রহ করতে সক্ষম হই। সেটি আমার গবেষণাজীবনের এক বড় সাফল্য ছিল।

এরপর থেকে বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে। এখন আমরা সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে স্নায়বিক সিগন্যাল পরিমাপ করতে পারি। শুধু নিউরালিংকই নয়, বিশ্বের আরও অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই দিকেই কাজ করছে। লক্ষ্য একটাই—মানুষের মস্তিষ্ক ও প্রযুক্তির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা।

বর্তমানে নিউরালিংকের গবেষণা মূলত মস্তিষ্কের নিউরনঘটিত রোগ যেমন পক্ষাঘাত (paralysis), দৃষ্টিহীনতা বা মেরুদণ্ডজনিত স্নায়ু ক্ষতির চিকিৎসা নিয়ে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তির চোখ ও মস্তিষ্ক দুটোই স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে, কিন্তু তাদের মধ্যে থাকা স্নায়বিক সংযোগটি নষ্ট হয়ে গেছে—ফলে দৃষ্টি সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায় না। যদি সেই সংযোগটি কৃত্রিম সার্কিট বা মাইক্রোচিপের মাধ্যমে পুনঃস্থাপন করা যায়, তাহলে সেই ব্যক্তি আবার দেখতে সক্ষম হবেন।

একইভাবে, অনেক সময় মেরুদণ্ডে আঘাতের কারণে স্নায়ুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ফলে মানুষ চলাফেরা করতে পারে না। অথচ মস্তিষ্ক তখনও সংকেত পাঠাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্ন অংশে প্রযুক্তিগত সংযোগ স্থাপন করা গেলে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিও পুনরায় নড়াচড়া করতে পারবেন।


বিয়ন্ড বিজনেস: অর্থাৎ, নিউরালিংক মূলত নিউরাল ইনজুরিগুলোকে রিপেয়ার বা বাইপাস করার উপায় খুঁজছে?

ড. মশিউর রহমান: ঠিক তাই। তারা মূলত নিউরাল রিজেনারেশন বা স্নায়ু পুনঃসংযোগ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। কিছু পরীক্ষায় ইতিমধ্যেই আংশিক সফলতাও এসেছে।


বিয়ন্ড বিজনেস: এটা তো সত্যিই চমকপ্রদ! মানে, যাদের চোখ ঠিক আছে কিন্তু সংকেত পাচ্ছে না, বা প্যারালাইসড রোগীরা—তাদের জন্য এটি নতুন আশার আলো হতে পারে।

ড. মশিউর রহমান: একদম তাই। যদি প্রযুক্তি দিয়ে মাঝখানের ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুগুলোকে বাইপাস করা যায়, তাহলে অন্ধ মানুষ রং দেখতে পারবে, পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ হাঁটতে পারবে। এখন পর্যন্ত এটি মূলত ক্লিনিক্যাল অ্যাপ্লিকেশন–এর পর্যায়ে আছে।

তবে ভবিষ্যতে, এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সরাসরি মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। তখন হয়তো মানুষ চিন্তা করেই যন্ত্রকে নির্দেশ দিতে পারবে, বা সরাসরি মস্তিষ্কে তথ্য গ্রহণ করতে পারবে—যা একসময় সায়েন্স ফিকশন মনে হলেও, বিজ্ঞান এখন সেটিকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য: ড. মশিউর রহমানের ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট—নিউরালিংক শুধু ইলন মাস্কের আরেকটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন নয়; এটি মানুষের মস্তিষ্ক ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনের মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। ভবিষ্যতে হয়তো এই প্রযুক্তিই পক্ষাঘাত, অন্ধত্ব বা স্নায়ুবিক রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবনে নতুন আলো এনে দেবে।

রাজশাহী থেকে টোকিও, তারপর সিঙ্গাপুর:


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, আপনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে কাজ করছেন, বলা যায় পেশাগতভাবে আপনি বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। আমরা জানতে চাই—কীভাবে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী থেকে আপনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে গড়ে তুললেন?

ড. মশিউর রহমান: আমি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করি ১৯৯৩ সালে। তখন থেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা ছিল। আমাদের সময়ে কিছু দেশ নিয়মিতভাবে বৃত্তি দিত, যেমন জাপানের মোনবুশো স্কলারশিপ। আমি সেই বৃত্তির জন্য আবেদন করি এবং পরীক্ষায় সফল হই।

সেই বছর আমরা মোট চারজন বাংলাদেশি এই বৃত্তি পেয়েছিলাম। এটা একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্কলারশিপ—শিক্ষার সমস্ত খরচ, থাকা-খাওয়া, এমনকি গবেষণার সরঞ্জাম পর্যন্ত জাপান সরকার বহন করে। সেই সুযোগে আমি জাপানে গিয়ে প্রথমে ডিপ্লোমা, পরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি সম্পন্ন করি।

আমি জাপানের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। ওখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা এবং গবেষণার পরিবেশ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।


বিয়ন্ড বিজনেস: পিএইচডি শেষ করার পর আপনার পেশাগত যাত্রা কীভাবে শুরু হয়?

ড. মশিউর রহমান: ২০০৫ সালের শেষের দিকে আমি যুক্তরাষ্ট্রে যাই এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার Marshall University–তে গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করি। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি এবং North South University–এ শিক্ষকতা করি।

এরপর আবার কিছু সময় জাপানে থেকে আমি সিঙ্গাপুরে চলে আসি। প্রথমে আমি কাজ করি A*STAR (Agency for Science, Technology and Research)–এ, যা সিঙ্গাপুরের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান। পরে National University of Singapore (NUS)–এ বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হই।


বিয়ন্ড বিজনেস: এখন আপনি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন, গবেষণা থেকে এই পরিবর্তনটা কীভাবে এলো?

ড. মশিউর রহমান: একসময় আমি উপলব্ধি করি যে, শুধু গবেষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে যদি শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে সরাসরি কাজ করি, তবে আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সমাজে আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে। সেই চিন্তা থেকেই আমি ২০১৫ সালে ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দিই।

প্রথমে কয়েকটি স্টার্টআপে কাজ করার পর বর্তমানে আমি Omron Healthcare Singapore–এ ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। এখানে আমরা স্বাস্থ্য প্রযুক্তিকে আরও মানবকেন্দ্রিক ও তথ্যভিত্তিক করার জন্য কাজ করছি—যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


বিয়ন্ড বিজনেস: একজন বাংলাদেশি হিসেবে বিদেশে পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ বা অভিজ্ঞতা হয়েছে?

ড. মশিউর রহমান: বিদেশে নিজের জায়গা তৈরি করা কখনোই সহজ নয়। ভাষা, সংস্কৃতি, কাজের ধরণ—সবকিছুই শুরুতে নতুন ছিল। কিন্তু আমি সবসময় চেষ্টা করেছি শেখার মানসিকতা বজায় রাখতে। জাপানে থাকাকালীন শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও পরিশ্রম—এই তিনটি জিনিস আমি গভীরভাবে শিখেছি। আর সেটাই আজও আমার পেশাগত জীবনের ভিত্তি।


বিয়ন্ড বিজনেস: আপনি কী মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এই যাত্রা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে?

ড. মশিউর রহমান: আমি মনে করি, সুযোগ সব জায়গাতেই আছে, শুধু সেটিকে সঠিকভাবে ধরতে জানতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে শেখার আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস এবং পরিশ্রম—এই তিনটি গুণ থাকা জরুরি। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—দেশকে ভুলে না যাওয়া। আমি আজও মনে করি, আমি বাংলাদেশেরই একজন প্রতিনিধি, যিনি বিদেশের মাটিতে দেশের নাম তুলে ধরার চেষ্টা করছি।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য: ড. মশিউর রহমানের এই যাত্রা প্রমাণ করে—বাংলাদেশের তরুণরাও বিশ্বমানের শিক্ষা ও প্রযুক্তি অঙ্গনে নিজেদের প্রতিভা দিয়ে সাফল্যের গল্প লিখতে পারে, যদি তাদের মধ্যে থাকে অদম্য অধ্যবসায় ও ইতিবাচক মনোভাব।

স্টার্টআপ, ব্যর্থতা ও শেখা


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, আপনি তো গবেষণা ও শিল্প—দুই ক্ষেত্রেই কাজ করেছেন। কিন্তু কখনও কি নিজে থেকে কোনো ব্যবসা বা স্টার্টআপ শুরু করার চেষ্টা করেছেন?

ড. মশিউর রহমান: ছোটখাটো কয়েকটি উদ্যোগের অভিজ্ঞতা আমার আছে। বাংলাদেশে থাকার সময়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি আমি একটি স্টার্টআপ শুরু করেছিলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল গাড়ি ট্র্যাকিং সলিউশন তৈরি করা—অর্থাৎ এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করা যা গাড়ির অবস্থান রিয়েল টাইমে ট্র্যাক করতে পারে।

দুঃখজনকভাবে প্রকল্পটি সফল হয়নি। সেই সময়ে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, বাজারের প্রস্তুতির অভাব, এবং ব্যবহারকারীর সচেতনতার ঘাটতির কারণে এটি প্রত্যাশিতভাবে এগোয়নি। ব্যর্থতার গল্পটা হয়তো আরেকদিন বিশদে বলব।


বিয়ন্ড বিজনেস: স্টার্টআপ ব্যর্থ হলেও অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই কিছু শিখিয়েছে?

ড. মশিউর রহমান: অবশ্যই। আমি বরাবরই বিশ্বাস করি—ব্যর্থতার গল্প থেকেই শেখা যায় সবচেয়ে বেশি। উদ্ভাবন বা innovation সবসময়ই একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। কখনো উদ্ভাবন বাস্তবতার থেকে একটু এগিয়ে যায়, আবার কখনো বাস্তবতা উদ্ভাবনের থেকে এগিয়ে থাকে।

যেমন, আমরা আজ যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)–এর চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছি, সেটিকে আজকের পর্যায়ে পৌঁছাতে বহু বছরের সময় লেগেছে। যদি কেউ এটি দশ বছর আগে তৈরি করতে যেত, তাহলে হয়তো প্রযুক্তি, হার্ডওয়্যার ও বাজার—সবকিছুই তার পক্ষে থাকত না। আবার যদি কেউ দশ বছর পরে শুরু করত, তখন প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতো।

তাই সফলতা নির্ভর করে সঠিক সময়ে সঠিক উদ্ভাবন এবং মানুষের মানসিক প্রস্তুতির ওপরও। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা এখনো সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য: ড. মশিউর রহমানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—উদ্ভাবনের পথে ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়। বরং প্রতিটি ব্যর্থতাই শেখার এক নতুন অধ্যায়, যা ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে। তাঁর কথায় যেমন বাস্তবতা, তেমনি আছে অনুপ্রেরণা—যে কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলে এই মনোভাবই তার সবচেয়ে বড় পুঁজি।

সিঙ্গাপুরে জীবন, দক্ষতা উন্নয়ন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, আপনি তো সিঙ্গাপুরে দীর্ঘদিন ধরে আছেন। আমাদের দর্শকরা জানতে চান—সিঙ্গাপুরে জীবন কেমন? আপনি কেন এখানেই থাকতে চেয়েছেন, এবং এই দেশকে আপনার কাছে কেমন মনে হয়েছে?

ড. মশিউর রহমান: আসলে আমি এখনো পুরোপুরি ‘সেটল’ বলব না—বরং এক অর্থে এখনো যাযাবরের মতোই চলাফেরা করছি। তবে সিঙ্গাপুরের একটা বড় সুবিধা হলো—এটি বাংলাদেশের কাছাকাছি, আবার এখানে এশিয়ান সংস্কৃতি বজায় রেখেও পশ্চিমা ধাঁচের জীবনযাপন করা যায়।

এখানে অনেক বড় একটি বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে, যার ফলে কখনোই মনে হয় না আমি সম্পূর্ণভাবে বিদেশে আছি। এখানকার সমাজে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিরও ভালো চর্চা রয়েছে। যেমন—চীনারা তাদের সন্তানদের চীনা ভাষায় শিক্ষা দেয়, মালয়রা মালয় ভাষায়, তেমনি বাংলাদেশি পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের বাংলা শেখায়। আমার স্ত্রী মুশফেকা মিতু এখানকার একটি বাংলা স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেন। ফলে বলা যায়, সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ভাষাকে ঘিরে একটি সুন্দর ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে।

এছাড়া এখানে Singapore Bangladesh Society, Bangladeshi Engineers Society, Mainers Society–সহ আরও অনেক সংগঠন আছে, যারা নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইমেলা ও উৎসবের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একত্র করে রাখছে।


বিয়ন্ড বিজনেস: যারা বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে কাজ করতে আসতে চান—বিশেষ করে দুই শ্রেণীর মানুষ, একদিকে শ্রমিক, অন্যদিকে পেশাজীবী বা উচ্চ আয়ের প্রফেশনাল—তাদের জন্য আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

ড. মশিউর রহমান: খুব ভালো প্রশ্ন। একসময় বিভিন্ন দেশে সাধারণভাবে অভিবাসী হওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। অনেক দেশেই অভিবাসন সীমিত করা হয়েছে, তারা শুধু নির্দিষ্ট দক্ষতার (specific skills) মানুষকেই নিচ্ছে—যেখানে তাদের জনবল ঘাটতি রয়েছে।

এখন আমি একটা হাইব্রিড ট্রেন্ড দেখছি—অনেক বাংলাদেশি তরুণ উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে জাপান, কোরিয়া, হংকং, মালয়েশিয়া বা চীনে যাচ্ছে। তারা সেখানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি সম্পন্ন করে পরবর্তীতে অন্য দেশে ভালো চাকরির সুযোগ পাচ্ছে। অর্থাৎ, তারা প্রথমে শিক্ষা নিয়ে দক্ষতা অর্জন করছে, তারপর কর্মক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। এই পদ্ধতিটা আমার কাছে খুবই কার্যকর মনে হয়।


বিয়ন্ড বিজনেস: কিন্তু বাংলাদেশের বিপুল প্রবাসী জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও আমাদের রেমিটেন্সের পরিমাণ ভারত বা ফিলিপাইনের তুলনায় অনেক কম। কেন এমনটা হচ্ছে বলে মনে করেন?

ড. মশিউর রহমান: এর মূল কারণ হলো—আমাদের অধিকাংশ কর্মী non-skilled বা অদক্ষ ক্যাটাগরিতে বিদেশে যায়। ফলে তাদের ঘণ্টাপ্রতি উপার্জন কম থাকে। কিন্তু যারা দক্ষতা অর্জন করে যায়—যেমন সফটওয়্যার, ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্বাস্থ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে—তাদের আয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

তাই আমি মনে করি, দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ (Skill Development Investment) এখনই বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন। সরকারকে এখানে বড় ভূমিকা নিতে হবে, কারণ সবসময় ব্যক্তিগতভাবে এই বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় না।

উদাহরণ হিসেবে বলি—যদি একজন শ্রমিক ঘণ্টায় ১০ ডলার আয় করে, একজন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মী সেখানে ঘণ্টায় ৩০–৪০ ডলার আয় করতে পারে। আবার কেউ যদি ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ে পৌঁছায়, তার আয় আরও বহুগুণ বাড়ে। তাই এই স্কিল গ্যাপ পূরণ করাই আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল চাবিকাঠি।


বিয়ন্ড বিজনেস: তাহলে স্কিল ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব কার—সরকারের, নাকি বেসরকারি খাতের?

ড. মশিউর রহমান: আমি বলব, দুই দিক থেকেই উদ্যোগ আসা দরকার। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের শেখার আগ্রহ থাকতে হবে—নিজের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। আবার সরকারকেও অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও নীতিগত সহায়তার দায়িত্ব নিতে হবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানবসম্পদ (Human Capital)। আমাদের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই জনশক্তি যদি সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত হয়, তাহলে আমরা শুধু শ্রমনির্ভর অর্থনীতি নয়, দক্ষতা-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারব।


বিয়ন্ড বিজনেস: এই ক্ষেত্রে কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আপনি লক্ষ্য করছেন?

ড. মশিউর রহমান: হ্যাঁ, কিছু ভালো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে এখন বেশ কিছু এডুটেক (EdTech) কোম্পানি গড়ে উঠছে—যারা অনলাইন প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের কাজ করছে। এটি একটি দারুণ সূচনা। তবে আমি মনে করি, জাতীয় পর্যায়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি স্কিল ডেভেলপমেন্ট স্ট্র্যাটেজি প্রয়োজন—যাতে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও শিল্প একত্রে কাজ করতে পারে।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য: ড. মশিউর রহমানের বিশ্লেষণে স্পষ্ট—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের চাবিকাঠি শুধু প্রবাসে শ্রম পাঠানো নয়, বরং দক্ষতা রপ্তানি করা। সিঙ্গাপুরের মতো দেশে বসে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবসম্পদই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ, এবং সঠিক বিনিয়োগই সেই সম্পদকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে।

বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পে এগিয়ে যেতে দরকার পেশাদারিত্ব, সার্টিফিকেশন ও সফট স্কিল উন্নয়ন


বিয়ন্ড বিজনেস: বাংলাদেশের আরএমজি খাতের পর সফটওয়্যার শিল্পকে এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রপ্তানি অর্জন করা, কিন্তু আমরা এখনো সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি। আপনি যেহেতু আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার শিল্পের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, আপনার পর্যবেক্ষণ কী—আমরা কেন পিছিয়ে আছি?

ড. মশিউর রহমান: সফটওয়্যার একটি অসাধারণ ক্ষেত্র, কারণ এখানে ভৌগোলিক অবস্থান বাধা নয়। বাংলাদেশে বসেই একজন ডেভেলপার আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করতে পারেন। একসময় আউটসোর্সিং খুব জনপ্রিয় ছিল, এবং এখনো আছে। তবে আমি মনে করি, ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রটি অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে—বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)–এর আগমনের কারণে।

রিমোট সার্ভিস এখন আর সহজ নয়; কারণ এআই ছোট ছোট কাজগুলো—যেমন সাধারণ ওয়েবসাইট তৈরি, লোগো ডিজাইন, এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ের কোডিং—সহজেই করে ফেলতে পারছে। তাই এই এন্ট্রি-লেভেল কাজগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।

আমাদের এখন টার্গেট করতে হবে সেই কাজগুলো যেখানে উচ্চ দক্ষতা, জটিল বিশ্লেষণ ও মানবিক বিচারবোধ দরকার—যেমন অপটিমাইজেশন, সিকিউরিটি, বা হাই-লেভেল ডিজাইন। এ ধরনের ক্ষেত্রগুলোতে এখনো মানুষের ভূমিকা অপরিহার্য।


বিয়ন্ড বিজনেস: অর্থাৎ, হিউম্যান ইন্টারফারেন্স বা মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যেখানে জরুরি, সেখানেই টিকে থাকার সুযোগ থাকবে?

ড. মশিউর রহমান: ঠিক তাই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক কাজ করতে পারে, কিন্তু মানুষের সৃজনশীলতা, বিচারবোধ এবং আন্তরিকতা এখনো তার নাগালের বাইরে। এই জায়গাটাই আমাদের শক্তি হতে হবে।


বিয়ন্ড বিজনেস: কিন্তু আমাদের সফটওয়্যার ডেভেলপাররা কি আন্তর্জাতিক মানের কাজের জন্য প্রস্তুত?

ড. মশিউর রহমান: আমরা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নই, তবে সম্ভাবনা অনেক। বাংলাদেশের সফটওয়্যার ডেভেলপাররা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং সমস্যা সমাধানে নিবেদিত। এটি আমাদের অন্যতম শক্তি। তবে, আমাদের টপ-লেভেল স্কিলড ট্যালেন্ট এখনো সীমিত।

আজকের দিনে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, কোর্স ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের মাধ্যমে স্কিল ডেভেলপ করা অনেক সহজ হয়েছে। তাই ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই সুযোগগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে।


বিয়ন্ড বিজনেস: অনেক আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট মনে করেন, আমাদের কমিউনিকেশন ও কমিটমেন্টে ঘাটতি আছে। আপনি কি একমত?

ড. মশিউর রহমান: হ্যাঁ, এটা কিছুটা সত্যি। আমাদের অনেক ডেভেলপারই টেকনিক্যালি ভালো, কিন্তু প্রফেশনালিজম–এর দিক থেকে পিছিয়ে আছি। সময়ানুবর্তিতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ—এই দিকগুলোয় আরও উন্নতি প্রয়োজন।

একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ভালো কোড লিখতে পারেন, কিন্তু তিনি কতটা ভালো টিম প্লেয়ার, সেটা আলাদা প্রশ্ন। বড় প্রকল্পে টিমওয়ার্কই সাফল্যের মূল। এই কারণেই সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট এখন অত্যন্ত জরুরি।


বিয়ন্ড বিজনেস: সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা (trust) অর্জনের জন্য কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

ড. মশিউর রহমান: বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হলে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন দরকার—যেমন ISO for Quality Assurance, Information Security Management (ISO 27001) ইত্যাদি।

যে প্রতিষ্ঠান এই সার্টিফিকেটগুলো অর্জন করে, তারা ক্লায়েন্টের কাছে একধরনের আস্থা তৈরি করতে পারে। অনেক সময় আমরা আমাদের টিমে কতজন প্রোগ্রামার আছে সেটাই বেশি প্রচার করি, কিন্তু তাদের ক্রেডিবিলিটি বা track record প্রমাণ করি না। এটি আমাদের বড় ঘাটতি।


বিয়ন্ড বিজনেস: সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে আপনি নিজেও বই লিখেছেন শুনেছি। একটু বিস্তারিত বলবেন?

ড. মশিউর রহমান: হ্যাঁ, আমি দুটি বই লিখেছি। প্রথমটি ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে, যেখানে আমি আলোচনা করেছি সফটওয়্যার পেশায় কীভাবে নিজের সফট স্কিল উন্নত করা যায়—যেমন দলগত কাজ, নেতৃত্ব, যোগাযোগ এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা। [রকমারি লিংক]

দ্বিতীয় বইটির নাম পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং। আজকের যুগে নিজের পেশাগত পরিচিতি তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—আপনি কে, কী পারেন, এবং কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন, সেটাই নির্ধারণ করে আপনি কতদূর এগোবেন। [রকমারি লিংক]

তৃতীয় বইটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সহজ ভাষায় এই প্রযুক্তিটি সমন্ধে বোঝাতে চেষ্টা করেছি। [রকমারি]

এই বইগুলোতে আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছি—কীভাবে আমি আন্তর্জাতিক কর্মজীবনে নানা সাংস্কৃতিক ও পেশাগত পার্থক্য অতিক্রম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য: ড. মশিউর রহমানের বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে দেখায়—বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্পের আসল চ্যালেঞ্জ কেবল প্রযুক্তিগত নয়, বরং মানবিক ও সাংগঠনিক দক্ষতার ঘাটতি। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন, পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সফট স্কিল উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা সফটওয়্যার রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারি।

বাংলাদেশের টেক ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবাসী পেশাজীবীদের সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে নতুন সম্ভাবনা


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, আমরা আউটসোর্সিং ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমাদের প্রশ্ন হলো—যারা দেশের বাইরে আছেন, বিশেষ করে যারা টেকনোলজি প্রফেশনে যুক্ত আছেন, তারা কি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান টেক আউটসোর্সিং ইন্ডাস্ট্রিতে কোনোভাবে অবদান রাখতে পারেন? যেমন ধরুন, আপনার মতো কেউ যিনি বিদেশে কোনো কোম্পানিতে কাজ করছেন, তিনি কি বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে উভয় পক্ষের জন্য একটা উইন-উইন সিচুয়েশন তৈরি করতে পারেন?

ড. মশিউর রহমান: অবশ্যই পারেন, এবং এ জায়গায় সুযোগও বিশাল। আমরা যেটাকে বলি ‘ব্রিজিং’ বা সেতুবন্ধন, সেটিই এখানে মূল চাবিকাঠি।

ধরুন, একজন বাংলাদেশি কানাডার কোনো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তিনি ওই খাতের কাজের প্রকৃতি ও চাহিদা সম্পর্কে ভালো জানেন। একইসাথে, বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের মানসিকতা ও দক্ষতা সম্পর্কেও তিনি অবগত। তাই তিনি বিদেশি ক্লায়েন্ট ও বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে এক ধরনের “সেতুবন্ধন” তৈরি করতে পারেন—যা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে।

প্রবাসে থাকা অনেক বাংলাদেশি আসলে ইতিমধ্যেই ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই কাজটি করছেন—নিজের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রজেক্ট রেফার করা, টেকনিক্যাল গাইডলাইন দেওয়া, কিংবা নতুন সুযোগের দরজা খুলে দেওয়া। কিন্তু এই কাজগুলো এখনো সংগঠিত বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রূপ পায়নি।


বিয়ন্ড বিজনেস: অর্থাৎ আমরা এখনো এই সম্ভাবনাটাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি না?

ড. মশিউর রহমান: ঠিক তাই। আমাদের অনেক যোগ্য ও দক্ষ প্রবাসী পেশাজীবী আছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে সংগঠিত সচেতনতা বা কোঅর্ডিনেশন এখনো তৈরি হয়নি। ফলে আমরা আমাদের পূর্ণ সম্ভাবনা ব্যবহার করতে পারছি না।

যদি সরকার বা বেসরকারি খাত এই সংযোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে—যেমন প্রবাসী পেশাজীবীদের নিয়ে Tech Bridge Program বা Global Mentor Network তৈরি করা যায়—তাহলে এটি বাংলাদেশের টেক ইন্ডাস্ট্রির জন্য যুগান্তকারী হতে পারে।


বিয়ন্ড বিজনেস: ভারত এই মডেলটি অনেক আগেই তৈরি করেছে, তাই না?

ড. মশিউর রহমান: একদম ঠিক বলেছেন। ভারত এই প্রক্রিয়াটি শুরু করেছে ১৯৮০-এর দশকে। তখন থেকেই তারা তাদের প্রবাসী প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। আজ তাদের টেক ইন্ডাস্ট্রির বড় একটি অংশ এই global collaboration-এর ফল।

আমরা গবেষণায় দেখেছি, যেসব প্রযুক্তি—যেমন থ্রিজি, ফোরজি, ভিওআইপি বা এখনকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—বিদেশে আগে শুরু হয়েছিল, সেগুলো বাংলাদেশে পৌঁছাতে প্রথম দিকে ১৫–১৮ বছর সময় লাগত। এখন সেই ব্যবধান অনেক কমে এসেছে। অর্থাৎ, আমরা এখন আগের তুলনায় দ্রুত নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারি।

এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বড় শিক্ষা নিতে পারি—অন্য দেশের সফল মডেলগুলো গ্রহণ করা এবং ব্যর্থ মডেলগুলো পরিহার করা। এতে আমরা সময় বাঁচাতে পারব, খরচ কমাতে পারব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—আমরা দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করতে পারব।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য:

ড. মশিউর রহমানের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট—বাংলাদেশের টেক ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিতে প্রবাসী প্রযুক্তিবিদ ও পেশাজীবীদের সঙ্গে একটি সংগঠিত সম্পর্ক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। তিনি মনে করেন, প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও শিল্পজ্ঞান যদি দেশের সফটওয়্যার ও আউটসোর্সিং খাতের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশও ভারতের মতো একটি ‘গ্লোবাল টেক নেটওয়ার্ক নেশন’ হয়ে উঠতে পারে।

ভ্রমণ মানে শুধু দেখা নয়, অনুভব করা


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, আপনার অন্যতম প্রিয় বিষয় হলো ভ্রমণ এবং ভ্রমণ নিয়ে লেখালেখি। আপনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং নিয়মিত লিখছেনও এই বিষয়ে। জানতে চাই—ভ্রমণের প্রতি আপনার আগ্রহ কোথা থেকে এলো? কেন আপনি ভ্রমণ করেন এবং কোন কোন দেশ আপনি ভ্রমণ করেছেন?

ড. মশিউর রহমান: ভ্রমণ মানেই যে বিদেশে যেতে হবে, আমি তা মনে করি না। আমার কাছে ভ্রমণ মানে হলো নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা, পরিবেশকে নতুনভাবে বোঝা। কোনো জায়গায় গেলে শুধু দেখা নয়—সেই জায়গার মানুষ, সংস্কৃতি, প্রকৃতি—সবকিছু মিলিয়ে একটা উপলব্ধি তৈরি হয়, যেটা ঘরে বসে পাওয়া যায় না।

কিছুদিন আগে আমি তুরস্কে গিয়েছিলাম। সেখানে তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ও ঐতিহাসিক সচেতনতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আমি এক জায়গায় একটি সাড়ে সাতশ বছর পুরনো গাছ দেখেছিলাম। সেই গাছের ইতিহাস ও মানুষের শ্রদ্ধা দেখে বুঝেছি—প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা কত গভীর হতে পারে।

ভ্রমণ আমার কাছে শুধু দেখা নয়—একটি আত্ম-অন্বেষণ (self-discovery)। আমি সেই অনুভবগুলোকে লিখিত আকারে প্রকাশ করি, যাতে পাঠকেরাও ভ্রমণের সেই গভীরতা অনুভব করতে পারে। অনেকেই ভিডিও ব্লগ করে, কিন্তু আমি লেখার মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করতে ভালোবাসি।


বিয়ন্ড বিজনেস: তাহলে আপনি মূলত ভ্রমণকে সাংস্কৃতিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন?

ড. মশিউর রহমান: ঠিক তাই। আমার কাছে ভ্রমণ মানে কেবল স্থাপত্য বা প্রকৃতি দেখা নয়—মানুষকে দেখা, তাদের জীবনের গল্প বোঝা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথিবীকে দেখা। আমি সেই দর্শনগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করি, তারপর লেখার মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করি।


বিয়ন্ড বিজনেস: এখন পর্যন্ত কতগুলো দেশ ভ্রমণ করেছেন?

ড. মশিউর রহমান: আসলে আমি গুনে দেখিনি। তবে এশিয়ার প্রায় সব দেশই ভ্রমণ করেছি। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও কানাডা গিয়েছি। ইউরোপে এখনো যাইনি, তবে সেখানে ঘুরে দেখার আগ্রহ অনেক পুরনো। আশা করি, শিগগিরই ইউরোপে যাব।


বিয়ন্ড বিজনেস: আপনি কি একা ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন, নাকি সঙ্গী নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগে?

ড. মশিউর রহমান: এখন মূলত আমার স্ত্রী মুশফেিকা মিতুর সঙ্গেই ভ্রমণ করি। আগে সন্তানদের নিয়ে যেতাম, কিন্তু এখন তারা বড় হয়ে গেছে। আমরা দুজনেই দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা উপভোগ করি। ভ্রমণ আমাদের দুজনেরই প্রিয় একটি অভ্যাস হয়ে গেছে।


বিয়ন্ড বিজনেস: ভ্রমণে কোনো শকিং বা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে কখনো?

ড. মশিউর রহমান: অনেকবার হয়েছে। যেমন জাপানে আমি প্রথমবার গিয়েছিলাম, তখন ওদের Onsen নামের একটি সংস্কৃতি দেখে অবাক হয়েছিলাম। এটি মূলত একটি পাবলিক বাথ বা উষ্ণ প্রস্রবণ, যেখানে মানুষ একসাথে গোসল করে—কোনো পোশাক ছাড়াই। আমাদের সংস্কৃতি থেকে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাই প্রথমে সাংস্কৃতিকভাবে একটু শকিং লেগেছিল বা কালচারাল শক।


বিয়ন্ড বিজনেস: আপনি যখন ভ্রমণ নিয়ে লেখেন, তখন কি যাত্রাপথেই লেখেন, নাকি ফিরে এসে লেখেন?

ড. মশিউর রহমান: ভ্রমণের সময় আমি নোট নিই—ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ, মানুষ, স্থান, অনুভূতি। কিন্তু মূল লেখাটা লিখি ফিরে এসে। তখন আমি সেই অভিজ্ঞতাগুলোর পেছনের ইতিহাস, সংস্কৃতি, বই ও গবেষণাপত্র পড়ে লেখাটি সমৃদ্ধ করি। অনেক সময় স্থানীয় বাংলাদেশিদের সঙ্গেও কথা বলি, তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বুঝতে চেষ্টা করি।

আমার লেখার প্রক্রিয়াটা অনেকটা তিন ধাপে—দেখা, অধ্যয়ন, তারপর লেখা।


বিয়ন্ড বিজনেস: ট্রাভেল বইয়ের পাঠক এখন কমে গেছে। তবুও আপনি যদি কোনো বই সুপারিশ করেন?

ড. মশিউর রহমান: আমি নির্দিষ্ট কোনো বই বলব না। ভ্রমণ বিষয়ক বই বেছে নেওয়া উচিত ব্যক্তিগত আগ্রহ অনুযায়ী। তবে আমি বিশ্বাস করি, বই পড়লে মানুষের মানসিক বিকাশ ও উপলব্ধির পরিধি অনেক বেড়ে যায়—যেটা শুধু ভিডিও দেখে সম্ভব নয়।


বিয়ন্ড বিজনেস: আপনি কি কোনো ট্রাভেল ব্লগার বা ইনফ্লুয়েন্সার ফলো করেন?

ড. মশিউর রহমান: বাংলাদেশে এখন অনেকেই ভালো কাজ করছেন—ভিডিও ব্লগ ও লেখালেখি দু’দিকেই। আমি মাঝে মাঝে নাদির অন দ্য গো দেখি—নাদিমের প্রেজেন্টেশন স্টাইলটা আমার বেশ ভালো লাগে। পাশাপাশি লেখক সারওয়ারসহ কয়েকজন তরুণ লেখকও এখন চমৎকার ভ্রমণধর্মী লেখা লিখছেন।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য:

ড. মশিউর রহমানের কাছে ভ্রমণ মানে কেবল দূর দেশে যাওয়া নয়—বরং নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা, মানুষের সংস্কৃতি থেকে শেখা এবং সেই উপলব্ধিগুলো পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। তাঁর ভ্রমণ দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—“যে মানুষ ভ্রমণ করে না, সে কেবল একটাই বই পড়ে।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব জীবনের পরিপূরক, বিকল্প নয়


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, এখন আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর উপেক্ষা করার মতো কিছু নয়। HubSpot–এর সিটিও ধর্মেশ শাহ বলেছেন—“AI এমন এক ইন্টার্নের মতো, যার সব বিষয়ে পিএইচডি আছে।” আবার তিনি এটাও বলেন—“AI মানুষের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়, তাকে প্রতিস্থাপন করে না।”

আপনার দৃষ্টিতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জীবন ও কর্মক্ষেত্রে কীভাবে প্রভাব ফেলছে? এবং অনেকেই যেমন বলছেন—এআই চাকরির বাজারে হুমকি তৈরি করবে, আপনি কি একমত?


ড. মশিউর রহমান: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়তা এনে দিয়েছে। শিল্প, ব্যবসা কিংবা সেবা খাতে যেখানে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ আছে, সেখানে এআই কার্যকরভাবে মানুষের পরিশ্রম কমিয়ে দিতে পারে।

তবে আমি মনে করি—যত উন্নত প্রযুক্তিই আসুক না কেন, মানবীয় হস্তক্ষেপ বা human interference সবসময়ই অপরিহার্য।

একটি ছোট উদাহরণ দিই। কিছুদিন আগে আমি একটি ছবির মধ্যে লেখা সংখ্যাগুলোর যোগফল বের করার জন্য এআই ব্যবহার করি। এআই স্ক্যান করে সুন্দরভাবে ফলাফল দিলেও পরে দেখি সেখানে কিছু ভুল ছিল—যেমন ‘৩’ কে ‘০’ হিসেবে চিনেছে বা ‘৭’ কে ‘১’ ভেবেছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের যাচাই প্রয়োজন।

তাই আমি বলব, মানুষের ভূমিকা হবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রযুক্তির নয়।


বিয়ন্ড বিজনেস: অনেকেই বলেন, এআই এখন গুটিকয়েক বড় কোম্পানির হাতে সীমাবদ্ধ। আপনি কি মনে করেন, এটি ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকি হতে পারে?

ড. মশিউর রহমান: একদম ঠিক। এখন আমরা যে বড় ভাষা মডেল (LLM) ব্যবহার করছি, যেমন ChatGPT বা Claude—এগুলো তৈরি হয়েছে গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে। এর ফলে তথ্যের বৈচিত্র্য ও স্বাধীনতা কিছুটা কমে যাচ্ছে।

তবে ভবিষ্যতে আমরা AGI—অর্থাৎ Artificial General Intelligence–এর দিকে এগোচ্ছি। যদি সেটি সফল হয়, তাহলে কম তথ্যের ভিত্তিতেও একটি সিস্টেম নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, নিজে শিখতে পারবে—যেটি মানুষের চিন্তাশক্তির কাছাকাছি পৌঁছাবে।

কিন্তু এর আগে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে—নৈতিকতা, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মানবিক সিদ্ধান্তের জায়গাগুলো রক্ষা করতে হবে।


বিয়ন্ড বিজনেস: আপনি তো এআই নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। আপনার প্রকাশিত বইগুলো সম্পর্কে কিছু বলবেন?

ড. মশিউর রহমান: হ্যাঁ, আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখছি। আমার বই ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ (মানচিত্র প্রকাশনী, বইমেলা ২০২৫)–এ আমি এই প্রযুক্তির ইতিহাস, বর্তমান ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। বইটিতে আমি বিশেষভাবে তুলে ধরেছি—কীভাবে ছাত্রছাত্রী, পেশাজীবী ও নীতিনির্ধারকরা এই পরিবর্তনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন।

এর আগে আমি আরও তিনটি বই লিখেছি—

১️⃣ ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট — পেশাগত উন্নয়ন ও সফট স্কিল নিয়ে।

২️⃣ পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং — কীভাবে নিজেকে পেশাগতভাবে উপস্থাপন করা যায়।

৩️⃣ প্রবন্ধ ও গল্পসংকলন — রাজশাহীর এক সাহিত্যপ্রেমীর রচনাবলি সম্পাদনা করেছি।

এছাড়া আমি বর্তমানে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, এআই এথিকস, এবং ডিজিটাল হেলথ ইনোভেশন নিয়ে নতুন বই লেখার পরিকল্পনা করছি।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য:

ড. মশিউর রহমানের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়, বরং মানব সক্ষমতার সম্প্রসারণ। প্রযুক্তি ভুল করতে পারে, কিন্তু মানুষই ঠিক করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের পৃথিবী হবে মানুষ ও যন্ত্রের যৌথ সহাবস্থান, যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা এবং মানবিক বোধই হবে আসল শক্তি।

“নিজেকে জানুন, লক্ষ্য ঠিক করুন, কৌশলে পরিশ্রম করুন”


বিয়ন্ড বিজনেস: মশিউর ভাই, শেষ পর্বে আমরা একটু আপনার পরিবার নিয়ে জানতে চাই। শুনেছি, আপনারা তিন ভাই—এবং সবাইই নিজেদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আপনার মা নিশ্চয়ই একজন রত্নগর্ভা বলা যায়। একটু আপনার পরিবার ও জীবনের পটভূমি নিয়ে বলবেন?

ড. মশিউর রহমান: হ্যাঁ, আমি বড় হয়েছি মূলত দুই শহরে—রাজশাহী ও ঢাকা। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করেছি, তাই রাজশাহী আমার গড়ে ওঠার কেন্দ্র বলা যায়। ঢাকাতেও কাটিয়েছি অনেক সময়—বিশেষ করে মোহাম্মদপুর ও ঘোড়াশালে।

আমরা তিন ভাই। আমি বড়। আমার ছোট ভাই ড. মাসুদুর রহমান জাপান থেকে পিএইচডি করেছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের Marshall University–তে শিক্ষকতা করছেন। আর আমাদের সবচেয়ে ছোট ভাই ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন, তিনি লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে বর্তমানে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল দপ্তরে কর্মরত।

আমাদের বাবা ২০১৯ সালে মারা গেছেন। মা এখন ঢাকায় বা রাজশাহীতে আমাদের সবার কাছেই থাকেন। মা-ই আমাদের জীবনের মূল প্রেরণা। তিনি আমাদের তিন ভাইকে আলাদা পথে হলেও মানবিক ও কর্মনিষ্ঠ হতে শিখিয়েছেন।

আমি প্রবাসে থাকলেও মা-বাবাকে খুব মিস করি। তবে বিদেশে থাকলে এক ধরনের বাংলাদেশি কমিউনিটি তৈরি হয়—যেখানে আমরা নিজেদের সংস্কৃতি, সম্পর্ক, উৎসব—সবকিছু মিলিয়ে একটা “ছোট বাংলাদেশ” গড়ে তুলি।

আমার স্ত্রী মুশফেকা মিতু রাজশাহীরই মেয়ে। তিনি এখন সিঙ্গাপুরে বাংলা স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে আমাদের দুই ছেলেও পড়ে বাংলা ভাষা শিখছে। তারা এখন O-level এবং A-level পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাতৃভাষার সঙ্গে তাদের সংযোগ রাখার চেষ্টা আমরা দুজনেই করি।


বিয়ন্ড বিজনেস: ধন্যবাদ, মশিউর ভাই। এখন একদম শেষ প্রশ্ন—যুব সমাজ বা তরুণদের জন্য আপনি যদি কিছু উপদেশ দিতে চান, বিশেষ করে যারা বিদেশে পড়তে চায় বা আপনার মতো একটি ক্যারিয়ার গড়তে চায়—তাদের আপনি কী বলবেন?

ড. মশিউর রহমান: আমি বলব—সফল জীবনের জন্য তিনটি ধাপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম ধাপ – “নিজেকে জানুন” (Know Thyself):

নিজের শক্তি, দুর্বলতা, আগ্রহ ও সীমাবদ্ধতা বোঝা জরুরি। অনেকে জীবনের শুরুতেই অন্যদের দেখে দৌড় শুরু করে, কিন্তু নিজেদের ভেতরটা চিনে না। নিজের প্রকৃত আগ্রহ জানলেই সঠিক দিকটি নির্ধারণ করা যায়।

দ্বিতীয় ধাপ – “লক্ষ্য নির্ধারণ করুন” (Know Where You Want to Go):

জীবনে আপনি কোথায় পৌঁছতে চান, তা স্পষ্টভাবে জানা দরকার। লক্ষ্য অস্পষ্ট থাকলে প্রচেষ্টা ছড়িয়ে যায়। লক্ষ্য থাকলে পথ খুঁজে পাওয়া যায়।

তৃতীয় ধাপ – “কৌশলে পরিশ্রম করুন” (Work Strategically):

আগে বলা হতো—পরিশ্রমই সফলতার চাবিকাঠি। এখন বলতে হয়—স্মার্ট পরিশ্রমই সফলতার চাবিকাঠি। পরিশ্রমের পাশাপাশি কৌশল জানতে হবে—কীভাবে কম সময়ে বেশি কার্যকর ফল পাওয়া যায়।

এই তিনটি ধাপ—নিজেকে জানা, লক্ষ্য ঠিক করা, ও কৌশলে এগোনো—যে কেউ অনুসরণ করলে জীবনের যেকোনো পর্যায়ে সফলতা পেতে পারে।


বিয়ন্ড বিজনেস মন্তব্য:

ড. মশিউর রহমানের এই জীবনদর্শন তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বাস্তবিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা। তাঁর কথায়—“সৃষ্টিকর্তা একটি জীবন দিয়েছেন। সেই জীবনটিকে কোথায় নিয়ে যাব, সেটাই আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই জ্ঞান, কৌশল ও পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটাতে হবে।”

সম্পর্কিত নিবন্ধ