রূপকথার চুপকথা

তারিখ নেই · 3 মিনিটের আনুমানিক পাঠ

যে কোন বই হাতে নিয়ে আমি খুব মনযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখি - প্রচ্ছদটি কি প্রকাশ করতে চেয়েছে? বইয়ের থেকে প্রচ্ছদই আমাকে বরাবর বেশিই আকর্ষণ করে। তেমন একটি চমৎকার প্রচ্ছদের বই, “রূপকথার চুপকথা”, হাতে নিয়ে আমি নাড়াচাড়া করছিলাম। ধ্রুব এষের আঁকা ছবিতে একটি সাদা শাড়ি পড়া একটি মেয়ে মেঘের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে। শাড়টি কমলা রংয়ের পাড়। মেয়েটিতো অন্য কোথাওতো হাটতে পারতো, কিন্তু মেঘে কেন?- সেই প্রশ্নটাই আমার মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল। সেই উত্তরটা খোঁজার জন্যই শুরু করলাম বইটি পড়া।

প্রযুক্তিবিদ হয়েও সাহিত্যের জগতে বিচরণ করার যে দু:সাহস দেখিয়েছে “নাদিয়া আফরিন” তার “রূপকথার চুপকথা” বইয়ে তাকে সত্যিই প্রশংসা করতে হয়। বহমান নদীর মতন গল্প বলে গেছেন এক ছোট্ট মেয়ের জীবনের অভিজ্ঞতা। বর্ণনাগুলি এমনই সাবলিল, যেন আমি চোখের সামনেই গল্পের নায়িকা রুপুকে দেখতে পাচ্ছিলাম। তবে নায়িকার নাম জানার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ অনেকক্ষণই। চৌদ্দ পাতায় এসে পরিচয় মিলল এই বইয়ের নায়িকার - আর তখনই বুঝতে পারলাম কেন বইয়ের নাম হয়েছে রূপকথা।

তবে চুপকথা কেন? - তা জানতে গল্পের পট পড়তে পড়তে চলে যাচ্ছিলাম রুপুর শৈশব থেকে কৈশরের পথে। তার অব্যক্ত কথাগুলি যেহেতু প্রকাশিত করেনি তার আশেপাশের মানুষগুলিকে তাই নাম বোধহয় চুপকথা। এমন অদ্ভূত নাম দেবার জন্য লেখিকার চিন্তাশীল মনের প্রকাশ পায়। বাবা’কে হারানোর কষ্ট এবং সেই সাথে মেঘ ও তারাদের সাথে কথোপকথনের জন্যই মনে হয় প্রচ্ছদে মেঘের মধ্যে মেয়েটির হাটাহাটি। সাদা শাড়ি কি তবে নায়িকার বিষন্ন মনের প্রকাশ?

মা ও মেয়ের জীবনের অপ্রাপ্তিগুলির পাওয়ার তাগিতে এগিয়ে চলে গল্পটি। কালো হয়ে জন্মের কারনে সামাজিক যে সমস্যাগুলির মধ্য দিয়ে রুপুকে যেতে হয় - তা যেন আমাদের সমাজের অন্ধকার দিকগুলিকেই লেখিকা হাজির করেছেন। লেখিকার মুন্সিয়ানায় গল্প বয়ে চলেছে। হবে শেষ চার পাতাতে যেভাবে দ্রুত ঘটনাগুলির যবানিকা টানছিলেন তা বড্ড হুড়োহুড়ি লেগেছে। তবে লেখিকার সতন্ত্র লেখনীকৌশলের কারণেই এই পাঠককে চুম্বকের মতন ধরে ছিল শেষ পাতা পর্যন্ত।

গল্পটা শেষ হয়ে কেন যেন এক বিষন্ন আবেশে মনটা আচ্ছন্ন করেছিল। মনে হচ্ছিল রুপুর কষ্টগুলি আমার হৃদয়ের ভিতরে ঢুকে গেছে। তার মতনই চুপকথাগুলি বয়ে যাচ্ছে আমার মস্তিষ্কে।

ড. মশিউর রহমান

সিঙ্গাপুর ২ অক্টোবর ২০২২