আজকের পত্রিকা - দক্ষতা আপনাকে এগিয়ে রাখবে - আবুল নুরুজ্জামান (৭ মার্চ ২০২৭)
লেখা: মশিউর রহমান
লিংক: https://www.ajkerpatrika.com/career/ajp4w3lvy0zq1
গাজীপুর - জয়দেবপুরের শহরতলি থেকে শুরু হওয়া আবুল নুরুজ্জামানের যাত্রা তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে । মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনার পর বৃত্তি নিয়ে তিনি জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন । পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া , লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন । এরপর আমেরিকান বহুজাতিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস ( এএমডি ) এবং সাইপ্রেস সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন । বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাডেইয়া’র সহ - সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ড . মশিউর রহমান ।
আপনার ক্যারিয়ার শুরুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি কী ছিল ?
আমি শুধু ভালো বিশ্ববিদ্যালয় নয় , ভালো সুযোগ খুঁজতে শিখেছিলাম । ইন্টারমিডিয়েটের পরই বুঝেছিলাম , বিদেশে পড়াশোনা করতে হলে তথ্য নিজে খুঁজে বের করতে হবে । তখন ইন্টারনেট ছিল না । আমি ঢাকায় ৩০ থেকে ৩৫ টি দূতাবাসে গিয়ে স্কলারশিপের খোঁজ নিয়েছি । অনেক বাধা ছিল , হরতাল ছিল , সময় ছিল না , তবুও থামিনি । শেষে জাপানের মনবুশো স্কলারশিপ পেলাম ; কারণ , ইলেকট্রনিকসে জাপান তখন খুব এগিয়ে । এ সিদ্ধান্ত আমাকে শেখায় , সুযোগ ‘ ডাকে ’ না , সুযোগ ‘ খুঁজতে ’ হয় । আর ক্যারিয়ারের শুরুতে এই অভ্যাসটাই পরের সব ধাপ সহজ করে দেয় ।
প্রথম চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে আপনি কী শিখেছিলেন ?
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ২০০৪ সালে এএমডিতে যখন যোগ দিই , তখন বুঝি করপোরেট দুনিয়ায় শুধু ভালো কাজই যথেষ্ট নয় , কাজের প্রভাব বোঝানোও জরুরি । নতুন হিসেবে আমি শিখেছি , কোম্পানি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় । কোন কাজগুলো ব্যবসার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন কাজগুলো শুধু ব্যস্ত রাখে । আমি তখন থেকে চেষ্টা করেছি , প্রোডাক্ট আর রেভিনিউর কাছাকাছি কাজ করতে — যেখানে ফল দেখা যায় । আপনার কাজ যদি কোম্পানির লক্ষ্যকে এগোয় , সেটা চোখে পড়বেই । তাই প্রথম চাকরিতে আমার বড় শিক্ষা হলো কাজ বাছাই করতে হবে , আর কাজের ফল মাপতে হবে । আপনি কীভাবে স্কিল ডেভেলপ করতেন ? আমি স্কিলকে দুই ভাগে দেখি । একটা হলো হার্ড স্কিল আর সফট স্কিল । হার্ড স্কিল হলো টেকনিক্যাল বোঝাপড়া । প্রোডাক্ট , মার্কেট এসব । সফট স্কিল হলো কমিউনিকেশন , টিমওয়ার্ক , প্রেজেন্টেশন , নেগোশিয়েশন । আমি ইচ্ছা করে বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করেছি । কারণ , নতুন ডোমেইন মানে নতুন শেখা । টি - ই কানেকটিভিটিতে টাচ সেন্সর , ল্যাটিসে প্রোডাক্ট ডেফিনেশন , সাইপ্রেসে প্রসেস ও চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স — প্রতিটি জায়গায় আলাদা আলাদা শেখা । আপনি যদি ছাত্র হন , তাহলে এখন থেকেই প্রজেক্ট , ইন্টার্নশিপ , ক্লাব , ভলান্টিয়ারিং — এসবের মাধ্যমে ‘ কাজ দেখানো ’ অভ্যাস করুন । ডিগ্রি আপনাকে ইন্টারভিউ পর্যন্ত নেবে , দক্ষতা আপনাকে এগিয়ে রাখবে ।
করপোরেট দুনিয়ায় প্রফেশনালিজম বলতে কী বোঝেন ?
আমার কাছে প্রফেশনালিজম মানে তিনটি জিনিস : দায়িত্ব নেওয়া , সময়ের মূল্য বোঝা এবং বিশ্বাসযোগ্য থাকা । দায়িত্ব নেওয়া মানে শুধু নিজের কাজ নয় , সমস্যা দেখলে সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া । সময়ের মূল্য মানে মিটিং , ডেডলাইন , কমিটমেন্ট — এসব ঠিক রাখা । আর বিশ্বাসযোগ্যতা আসে যখন মানুষ দেখে আপনি কথা ও কাজ মিলিয়ে করেন । করপোরেটে অনেকে অভিযোগ করে ‘ ওরা ঠিক করছে না ’ । আমি বলি , অভিযোগ কম করুন । সমাধানের প্রস্তাব দিন । যে সমস্যাকে আপনি সুযোগ হিসেবে দেখবেন , সে সমস্যাই একসময় আপনার ক্যারিয়ার গ্রোথের কারণ হবে ।
আপনি কীভাবে নেতৃত্বে উঠলেন , লিডারশিপের মূল পাঠ কী ?
লিডারশিপের মূল পাঠ হলো ’ প্রো - অ্যাকটিভ ’ হওয়া এবং ‘ মানুষকে সঙ্গে নেওয়া ’ । প্রো - অ্যাকটিভ মানে কেউ বলার আগেই বুঝে নেওয়া । ভবিষ্যতে কী লাগবে , সেটা আন্দাজ করা এবং উদ্যোগ নেওয়া । দ্বিতীয়টি হলো করপোরেট কোনো একক খেলা নয় ; এটি টিমের খেলা । বিভিন্ন ফাংশনাল টিমকে একসঙ্গে কাজ করাতে না পারলে বড় ফল আসে না । যখন ঊর্ধ্বতনরা দেখেন আপনি সমস্যা ধরতে পারেন , সমাধান এগিয়ে নিতে পারেন , আর মানুষকে একসঙ্গে রাখতে পারেন — তখন দায়িত্ব বাড়ে । পদবি পরে আসে , আগে আসে দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা । আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল ? প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জাপানে ভাষা ও নতুন পরিবেশ । শুরুতে কঠিন লেগেছে । পরিচিত পরিবেশ নেই , বন্ধুবান্ধব নেই , ভাষা বাধা । কিন্তু সে চ্যালেঞ্জটাই আমাকে মানসিকভাবে শক্তশালী করেছে । এরপর আমেরিকায় এসে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি । বাংলাদেশ , জাপান , আমেরিকা — প্রতিটি জায়গায় মানুষের ভাবনার ধরন আলাদা । আন্তর্জাতিক পরিবেশে টিকে থাকতে হলে আপনাকে ভিন্নমতকে বোঝা শিখতে হবে । আপনি যদি শুধু নিজের কমফোর্ট জোনে থাকেন , এতে দৃষ্টি প্রসারিত হবে না । শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ পরামর্শ হলো , বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করুন । অনলাইন প্রজেক্ট , ওপেন সোর্স , ইন্টারন্যাশনাল টিম — এই অভ্যাস গড়ে তুলুন ।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই একজন শিক্ষার্থীর কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ?
বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু পরীক্ষার জন্য পড়া । পরীক্ষার ফল দরকার , কিন্তু ক্যারিয়ারের জন্য দরকার কাজের প্রমাণ । আমি বলব , তিনটি জিনিস করুন । এক : একটি স্কিল স্ট্যাক বানান । যেমন ডেটা , সফটওয়্যার , ডিজাইন , সেলস , মার্কেটিং । যেটাই হোক , একটা শক্ত ভিত্তি করুন । দুই : কমিউনিকেশন । লিখতে শিখুন , প্রেজেন্ট করতে শিখুন , পরিষ্কারভাবে কথা বলতে শিখুন । তিন : ইন্টার্নশিপ বা প্রজেক্ট । যেখানে আপনি বাস্তবে কিছু ডেলিভার করবেন এবং সুযোগ খোঁজার অভ্যাস গড়ুন । স্কলারশিপ , ইন্টার্নশিপ , ফেলোশিপ । এসব আপনার কাছে নিজে থেকে আসবে না ।
ভবিষ্যতের জব মার্কেটে কোন ট্রেন্ডগুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করেন ?
প্রযুক্তিভিত্তিক কাজ আরও বাড়বে । কিন্তু শুধু টেকনিক্যাল লোক নয় , টেকনোলজি দিয়ে ‘ ভ্যালু তৈরি ’ করতে পারে এমন লোকের চাহিদা বাড়বে । প্রোডাক্ট থিংকিং , ডেটা- ড্রিভেন সিদ্ধান্ত , কাস্টমার নিড বোঝা — এসব দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ । আরেকটি বড় ট্রেন্ড হলো লোকালাইজেশন । বাংলাদেশে অনেক গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম আছে । কিন্তু স্থানীয় প্রয়োজন না বুঝলে তাদের টিকে থাকা কঠিন হবে । যাঁরা স্থানীয় সমস্যাকে বুঝে প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাধান দিতে পারবেন , তাঁরা এগিয়ে থাকবেন ।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আপনার সবচেয়ে বাস্তব পরামর্শ কী ?
আমি তিনটি বাস্তব কথা বলব । এক : রিজেকশন বা প্রত্যাখ্যানকে ভয় পাবেন না । রিজেকশন মানে আপনার পথ শেষ নয় , আপনার পদ্ধতি বদলাতে হবে । আমিও অনেক জায়গায় রিজেক্ট হয়েছি । কিন্তু আমরা সেগুলো নিয়ে গল্প করি না । দুই : নিয়ম আছে মানেই চেষ্টা বন্ধ নয় । রোটারির স্কলারশিপ জাপানিদের জন্য ছিল । তবু আমি আবেদন করেছি , কারণ হারানোর কিছু ছিল না । তিন : নিজের সময়কে মূল্য দিন । সময় সবার জন্য ২৪ ঘণ্টা । কিন্তু সবাই একই ফল পায় না । আপনি প্রতিদিন যদি ছোট ছোট অভ্যাস যেমন পড়াশোনা , স্কিল , কমিউনিকেশন— এগুলো ঠিক রাখেন , পাঁচ বছর পর আপনার ক্যারিয়ার নিজেই আপনার পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে ।
