কুড়ি বছর পর জাপানের নারা শহরে, প্রথম পর্ব (৩১ জুলাই ২০২৫)

তারিখ নেই · 9 মিনিটের আনুমানিক পাঠ

লিংক: https://bangla.bdnews24.com/kidz/ff3e31546aa8

তারিখ: ৩১ জুলাই ২০২৫

কোফুকুজি মন্দিরের সূচনা হয়েছিল ৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাজ্ঞী কোমিও তার স্বামীর সুস্থতা কামনায় এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি এক দেশ থেকে অন্য দেশে। তবে বঙ্গদেশ ছাড়া অন্যকোনো দেশের সাথে যদি নাড়ির টান থাকে, তবে সম্ভবত তা জাপানই হবে। কেননা এই দেশেই আমার সম্পূর্ণ উচ্চশিক্ষার সময়টি কাটিয়েছে। ডক্টরেট ডিগ্রির পর জাপান ছেড়েছি বহু বছর হলো, কিন্তু কর্মজীবনে আবারও কিছুটা সময় আমাকে জাপানে কাটাতে হলো।

দ্বিতীয় এই ভ্রমণে জাপানকে আবারও আবিষ্কার করলাম অন্য চোখে। চেনা জিনিসকে দেখলাম নতুন চোখে। সেই ভ্রমণ গল্পে আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি জাপানের প্রথম রাজধানী নারা শহরে। দুটি পর্বের এই গল্পে আজকে থাকছে প্রথম পর্বটি।

এই নারা শহরে আবারও পা রাখলাম গুণে গুণে কুড়ি বছর পর। একসময় এই শহরেই পড়াশোনা করেছি, বসবাস করেছি, সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি, স্কেচ খাতা নিয়ে কোন রাস্তার পাশে ছবি এঁকেছি, কত জায়গায় তার কোন ইয়ত্তা নেই। আজ আমি আবার এসেছি, আমার সেই চেনা শহরটিকে নতুন করে আবিষ্কার করার জন্য। নারা শহরে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে যাযাবরের মতো চাকরি করে বেড়িয়েছি যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরে।

এই নারা আজ আমার চোখে নতুন, আবার একদিকে পুরনো। চলুন আজ আপনাদের ঘুরে বেড়িয়ে নিয়ে আসি আমার কৈশোরের নারা শহরে, জাপানের অন্যতম বিখ্যাত পর্যটক কেন্দ্র। টোকিও থেকে ৩৭০ কিলোমিটার দূরের এই শহরটিতে যদি জাপানের বুলেট ট্রেনে আসতে চান, তবে সময় লাগবে প্রায় তিন ঘণ্টা।

নারা স্টেশনের ট্রেন থেকে নামার পর প্রথমেই চোখে পড়ল পুরনো স্টেশন ভবনটি। ১৯৩৪ সালে নির্মিত এই কাঠের ভবনটির স্থাপত্যশৈলী দূর থেকে দেখতে বৌদ্ধ মন্দির প্যাগোডার মতো লাগে, অথচ তাতে পাশ্চাত্য নকশার প্রভাবও স্পষ্ট। শত বছরের ঐতিহ্য বহন করা এই ভবনটিকে সংরক্ষণ করে আজ পর্যটক তথ্যকেন্দ্র ও একটি ক্যাফে হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার বারান্দায় এখনও পুরনো দিনের নকশার কাঠের সৌন্দর্য মেলে ধরে আছে।

স্টেশনের চৌকাঠে পা দিয়েই আমার মনে হলো যেন সময়ের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, এক পাশে অতীতের স্পর্শ, অন্য পাশে বর্তমানের গতি। নতুন আধুনিক ট্রেন স্টেশনটির ঠিক পাশে চোখে পড়লো ‘ভিয়েরা নারা’ নামে একটি অত্যাধুনিক শপিংমল। কৈশোরে যে শহরটি ছিল পুরনো ঐতিহাসিক জায়গা, আজ তা পরিণত হয়েছে আধুনিক শহরে। শপিংমলের বিশাল কাচঘেরা হলঘর, চলন্ত সিঁড়ি আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ভিড়ে থাকলেও, কোথাও যেন নারার চিরাচরিত শান্ত আবহও টিকে আছে।

আধুনিকতার মাঝেও শহরটি তার সংস্কৃতির শেকড়কে সম্মান জানিয়ে চলছে। বিশ বছর পর ফিরে এসে স্টেশনের এই রূপান্তর আমাকে বিস্মিত করল, তবে আশ্চর্যের বিষয়, সবকিছু অচেনা লাগছে না। নারায় সময় যেন থমকে থাকে না, বরং ধীর পায়ে মসৃণভাবে এগিয়ে যায়। মনে হলো, এই শহরে পরিবর্তন এসেছে বটে, কিন্তু তার আত্মা আগের মতোই রয়ে গেছে।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে পথে বিক্রি হচ্ছিল ‘কাকিনোহা’ নামে এক ধরনের সুশি বা জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাবার। ‘সুশি’ খাবারটি হলো ভাতের চাপা টুকরোর উপর কাঁচা মাছের একটি বিশেষ খাবার, যা শুধু জাপানি নয়, সারা বিশ্বের লোকজনেরও খুবই প্রিয়। সুশি জাপানি সংস্কৃতির একটি অন্যতম উপদান হয়ে গেছে।

কাকিনোহা সুশি পার্সিমন (খেজুর গাছজাতীয় ফল) গাছের পাতা দিয়ে মোড়ানো থাকে এক ধরনের সুশি। এই পাতায় প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক উপাদান আছে, যা খাবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণে সাহায্য করত, প্রাকৃতিক ফুড-প্রিজার্ভেশন! প্রাচীন সময়ে এটি বানানো হতো পাহাড়ি অঞ্চলে মাছ সংরক্ষণের জন্য। এই খাবারটি আপনি নারা শহরে পাবেন, যা স্থানীয়ভাবে খুব বিখ্যাত। অনেকদিন পর সেই পুরনো স্বাদ পেয়ে খুব ভালো লাগলো।

স্টেশন থেকে বেশি দূর নয়, হাঁটতে হাঁটতে অল্পক্ষণেই পৌঁছে গেলাম নগরকেন্দ্রের প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির, কোফুকুজির প্রাঙ্গণে। প্রথমেই দৃষ্টিতে এলো কোফুকুজির বিখ্যাত পাঁচতলা বৌদ্ধ মন্দির, প্রায় ৫০ মিটার উচ্চতার এই কাঠের প্যাগোডাটি জাপানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মন্দির। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যা নারার প্রতীক হয়ে আকাশের দিকে হাতছানি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কোফুকুজি মন্দিরের সূচনা হয়েছিল ৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাজ্ঞী কোমিও তার স্বামীর সুস্থতা কামনায় এটি প্রতিষ্ঠা করেন। কোফুকুজি ছিল একসময় নারার প্রধান সাতটি মন্দিরের একটি মন্দির, যা জাপানিতে ‘নান্তো শিচিদাইজি’ নামে পরিচিত। অষ্টম শতকে জাপানের প্রথম স্থায়ী রাজধানী প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এই মন্দির নগরীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

যুগে যুগে রাজপরিবার থেকে সাধারণ জনগণ, সবার প্রার্থনার পদচিহ্ন এই প্রাচীন প্রাঙ্গণের ধূলিতে মিশে আছে। সেই রাজপরিবার এখন নেই, এখন এখানে পর্যটকদের আনাগোনা। কেউ বা ছবি তুলছে আবার কেউবা প্রার্থনা করছে। একটি কোণায় দেখলাম একজন পেন্সিল স্কেচ করে মন্দিরটির ছবি আঁকছে। ছেলেটিকে দেখে কুড়ি বছর আগে আমাকেই মনে পড়লো। এই ছেলেটির মতো আমিও সাইকেল আর পিঠে স্কেচের খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম নারা শহরের আনাচে কানাচে মন্দির ও বাড়িগুলির ছবি আঁকতে। এই ফাঁকে বলে নিই, ছেলেবেলায় আমি আর্টিস্ট হতে চেয়েছিলাম। তবে তাকে পেশা হিসাবে না নিলেও এখনও আর্কিটেক্ট আমার প্রিয় বিষয় এবং আঁকতে এখনও ভালোবাসি।

সকালবেলার মন্দির প্রাঙ্গণটি শান্ত ও শীতল। দু-একজন প্রবীণ লোককে দেখলাম ধূপকাঠি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করছেন। বাতাসে সুগন্ধী ধূপের ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছে, আর চারপাশে ছড়িয়ে আছে পুরনো কাঠের মৃদু গন্ধ। এই গন্ধটি মনে হয় শুধু নারা শহরেই পাওয়া যায়। সেই চেনা গন্ধে আমি ফিরে গেলাম পুরনো সময়ে। কোফুকুজির প্রাচীন কাঠামোর দিকে চেয়ে আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, জাপানের সংস্কৃতি ও শিল্পকলার শুরু হয়েছিল এই নারা শহর, তার জীবন্ত প্রমাণ যেন ফুটে আছে মন্দিরের প্রতিটি স্তম্ভে ও বিমে।

সত্যিই, জাপানের সবচেয়ে প্রাচীন নির্মাণ এবং অমূল্য ঐতিহাসিক ধন এখনো এই শহরেই সযত্নে রক্ষিত আছে। ইতিহাসের গভীরতা অনুভব করে মন্দিরের পাথরের উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে অতীতের সোনালি যুগের একটি ছবি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।

তারপর চোখে পড়লো জাপানি কালি, তুলি ও ক্যালিওগ্রাফির দোকান। জাপানিরা একে বলে ‘সোদো’। চীন থেকে কোরিয়ার মাধ্যমে তুলি দিয়ে লেখার এই পদ্ধতিটি জাপানে আসে সম্ভবত আসুকা (প্রায় ৫৩৮ থেকে ৭১০) এবং নারা যুগে যা ৭১০ থেকে ৭৯৪ খ্রিস্টবর্ষে বৌদ্ধধর্মের সাথে। নারা শহর থেকেই জাপানে এই ক্যালিওগ্রাফির সূচনা হয়। ইতিহাসের পাতায় উল্লেখ আছে যে কোফুকুজি মন্দিরটি অন্তত সাতবার পুড়ে গেছে, কিন্তু প্রতিবারই তা পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে।

এটি জাপানিদের ঐতিহ্য রক্ষার মানসিকতার এক অনন্য উদাহরণ। এটি নারার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এবং বিভিন্ন স্থানে নারা শহরের প্রতীক হিসেবে এই মন্দিরের চিত্র ব্যবহৃত হয়। কোফুকুজি শুধু একটি ধর্মীয় স্থান ছিল না, এটি ছিল শক্তিশালী ফুজিওয়ারা পরিবারের নিজস্ব মন্দির। ফুজিওয়ারা বংশ ছিল জাপানের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজকীয় উপদেষ্টা পরিবার এবং কোফুকুজির মাধ্যমে তারা ধর্মীয় প্রভাব ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখত।

পাঁচতলা মন্দিরটির নিচে দাঁড়িয়ে আমি স্মৃতির ভারে কিছুক্ষণ মগ্ন রইলাম। বিশ বছর আগে তরুণ বয়সে যখন প্রথম নারা এসেছিলাম, এই কোফুকুজির মন্দিরটির সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম জাপানের প্রাচীন ঐতিহ্যের বিশালত্ব অনুভব করেছিলাম। আজ আবার সেই স্থানে এসে দেখি মন্দিরটির একইভাবে আকাশ ছুঁয়ে আছে, শুধু আমার জীবন থেকেই দু’দশক সময় পেরিয়ে গেছে।

মন্দির চত্বরের একপাশে কয়েকটি হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেমনটা তখনও দেখেছিলাম; সেই স্মৃতিময় সকাল আর এই বর্তমান মুহূর্ত যেন একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছে। কোফুকুজির নীরব প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আমার মন অতীত ও বর্তমানের মাঝখানে ঝুলে রইল, সময় যেন এখানে এক চক্রাকার প্রবাহ, যা আমাকে শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

কোফুকুজি মন্দিরের প্রাঙ্গণ পেরিয়ে আরও ভেতরে, সবুজে ঘেরা নারা পার্কের পথে এগোতেই চারপাশে হরিণের শব্দ শুনতে পেলাম। অল্পক্ষণেই কয়েকটি হরিণ আমার দিকে এগিয়ে এলো। নারার এই হরিণগুলিকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘শিকা’। এই হরিণগুলো মানুষপ্রিয়; পার্কের কাছে বিক্রি হওয়া বিশেষ ‘শিকা-সেনবে’ নামের এক ধরনের বিস্কুট কিনে তাদের দিকে বাড়িয়ে ধরতেই একটি হরিণ ভদ্রভাবে মাথা নুইয়ে এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে খাবার নিল।

জাপানি এই হরিণগুলোও দেখলাম জাপানিদের মতো ভদ্র। নরম ঠোঁট দিয়ে আঙুল ছুঁয়ে যখন হরিণটি মুচমুচে বিস্কুটটা খেতে লাগল, তার উষ্ণ শ্বাস আর হালকা বুনো গন্ধ অনুভব করলাম। মাথা নিচু করে শুকনো ঘাস চিবোতে থাকা এই সরল প্রাণীদের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেকেও যেন অনেক বিনম্র ও শান্ত লাগতে শুরু করল।

স্থানীয় এক পুরাণ মনে পড়ে গেল। কথিত আছে, প্রাচীনকালে ‘তাকেমিকাজুচি’ নামে বজ্রের দেবতা ইবারাকির কাশিমা মন্দির থেকে একটি শুভ্র হরিণের পিঠে চড়ে নারা নগরীতে আগমন করেছিলেন। সেই থেকেই নারা পার্কের হরিণগুলোকে কাসুগা-তাইশা শিন্তো মন্দিরের দেবতার পবিত্র দূত হিসেবে মানা হয় এবং অধিবাসীরা এদের সযত্নে রক্ষা করে আসছেন। এই দীর্ঘ তেরো শতাব্দী ধরেই তারা ‘দেবতার বার্তাবাহী’ রূপে হরিণগুলোকে সম্মান করে এবং এর যত্ন নেয়।

আজ প্রায় বারোশোর বেশি হরিণ এই পার্ক এবং আশপাশে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে। একটা সময় শিকার ও উন্নয়নের চাপে জাপানের অন্য অনেক জায়গা থেকে হরিণ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, নারার জনগণ এই হরিণদের রক্ষায় নিজেদের উৎসর্গ করেছে। ইতিহাস ও আধুনিকতার সেতুবন্ধন রচনা করে এই হরিণেরা এখন নগরীর প্রতীক।

ছোট্ট শিশুরা এগুলোকে হাত বাড়িয়ে খাওয়াচ্ছে, পর্যটকেরা আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আর হরিণেরা নির্বিবাদে মানুষের সঙ্গ উপভোগ করছে। মানুষের সাথে এদের এই মৈত্রীর দৃশ্য দেখে মনে হলো, সত্যিই এই শহরে সহাবস্থান আর শান্তির বাণী চিরন্তন। আজকে প্রথম পর্বটি এইখানে শেষ হলো। দ্বিতীয় পর্বে থাকছে নারা শহরে মূল আকর্ষণ তোদাইজি মন্দির, জাপানি রেস্টুরেন্ট, সরুসাওয়া পুকুরপাড়ের সেই ঐতিহাসিক পুরাণ ও লোকগাথা।

চলবে…